যবিপ্রবির টেন্ডার
১৪ সর্বনিম্ন দরদাতাকে টপকে কাজ পেলেন ১৫ নম্বর ঠিকাদার

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (যবিপ্রবি)। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের রাজস্ব বাজেটের আওতায় বিভিন্ন ভবনের মেরামত ও সংরক্ষণকাজের জন্য দেড় কোটি টাকার একটি ই-জিপি টেন্ডার আহ্বান করা হয়। কিন্তু পুরো টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অভিযোগ উঠেছে অনিয়মের।
অভিযোগ রয়েছে, ২২ জন দরদাতার মধ্যে প্রথম ১৪ জন সর্বনিম্ন দরদাতাকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এরপর ১৫ নম্বর অবস্থানে থাকা একটি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয়েছে কার্যাদেশ।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির প্রাক্কলিত মূল্য ছিল ১ কোটি ৫০ লাখ ৩২ হাজার টাকা। টেন্ডারে ‘এম/এস যমুনা প্রকৌশলী’ ১ কোটি ২৬ লাখ ৭৯ হাজার ৪৯২ টাকায় কাজ শেষ করার প্রস্তাব দেয়। কিন্তু মূল্যায়ন কমিটি শেষ পর্যন্ত ১ কোটি ৩৬ লাখ ৮০ হাজার টাকা দরপ্রস্তাবকারী ‘নিশিত বসু’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেয়। সর্বনিম্ন দরদাতাকে বাদ দিয়ে তুলনামূলক বেশি দরপ্রস্তাবকারী প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়। এতে সরকারের প্রায় ১০ লাখ টাকা বাড়তি খরচ হয়।
অভিযোগ রয়েছে, ৫ শতাংশ অগ্রিম কমিশনের বিনিময়ে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় করা হয়েছে অনিয়ম। ৩০ জুনের মধ্যে কাজ শেষ দেখিয়ে বিল তোলার জন্য অর্থবছরের শেষ দুই কার্যদিবস বাকি থাকতেই এই কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, যবিপ্রবির বিভিন্ন ভবনের মেরামত ও সংরক্ষণকাজের জন্য ২০২৫-২৬ অর্থবছরের রাজস্ব বাজেট থেকে দেড় কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এ কাজের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী (অতিরিক্ত দায়িত্ব) অধ্যাপক ড. মোখলেসুর রহমান ই-জিপির মাধ্যমে দরপত্র আহ্বান করেন। নথি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২ জুন টেন্ডার আহ্বান করা হয়। দরপত্র দাখিল ও উন্মুক্ত করার তারিখ নির্ধারণ করা হয় ১৮ জুন।
পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর)-২০০৮ ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক বিধিমালা অনুযায়ী, উন্মুক্ত দরপত্রের ক্ষেত্রে দরদাতাদের প্রস্তুতি ও দরপত্র মূল্যায়নের জন্য পর্যাপ্ত সময় দিতে হয়। কিন্তু ১৮ জুন টেন্ডার খোলার পর মাত্র ১২ দিনের মধ্যেই দেড় কোটি টাকার এ টেন্ডারের মূল্যায়ন শেষ হয়। এরপরই কার্যাদেশ জারি করা হয়। এত অল্প সময়ে মূল্যায়ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ায় তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, রাজস্ব তহবিলের অর্থ ব্যয়ে অনিয়মের সুযোগ তৈরি করতে পিপিআরের বিধান মানা হয়নি। প্রতি অর্থবছরের জুন ক্লোজিংয়ের সময় ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিতে নির্দিষ্ট সময়সীমা অনুসরণ করতে হয়। বিধি অনুযায়ী, ৩০ জুনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট কাজ শেষ করে চূড়ান্ত বিল পরিশোধের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার কথা।
যবিপ্রবির এই প্রকল্পে দেখা গেছে, ১৮ জুন টেন্ডার খোলার পর প্রয়োজনীয় নথিপত্র প্রস্তুত করা হয় ৩০ জুন। মাত্র দুই কার্যদিবস হাতে রেখে ঠিকাদারকে দেড় কোটি টাকার এই কাজের চূড়ান্ত কার্যাদেশ দেওয়া হয়। প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা, মাত্র দুই কার্যদিবসের মধ্যে দেড় কোটি টাকার মেরামতকাজ বাস্তবে শেষ করা কতটা সম্ভব।
পিপিআর ২০০৮-এর বিধি ৭৩ ও ৯৮ অনুযায়ী, দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সব শর্ত পূরণকারী সর্বনিম্ন দরদাতাকে কার্যাদেশ দেওয়ার জন্য সুপারিশ করে। কিন্তু এই টেন্ডারে দেশের ২২ জন নিবন্ধিত ঠিকাদার অংশ নেন। প্রথম ১৪ জন সর্বনিম্ন দরদাতাকে বাদ দিয়ে ১৫ নম্বর অবস্থানে থাকা ‘নিশিত বসু’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে কাজের জন্য নির্বাচন করা হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ তৌহিদ ইমাম ৫ শতাংশ অগ্রিম কমিশনের বিনিময়ে এই জালিয়াতি করেছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী, প্রকৌশল দপ্তরের সব বড় ক্রয়ের টেন্ডার প্রক্রিয়া প্রধান প্রকৌশলীর কার্যালয় থেকে পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত হওয়ার কথা। কিন্তু যবিপ্রবির নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ তৌহিদ ইমাম সব টেন্ডার প্রক্রিয়া নিজের হাতেই রেখেছেন।
তৌহিদ ইমাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল দপ্তরের ই-জিপি পোর্টালের আইডি, পাসওয়ার্ড ও নিবন্ধিত অফিশিয়াল ইমেল অ্যাড্রেস নিজের ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন। সেই সুযোগে তিনি দরপত্র জালিয়াতি করে পছন্দের ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী (অতিরিক্ত দায়িত্ব) অধ্যাপক ড. মোখলেসুর রহমান আগামীর সময়কে বললেন, ‘ক্রয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আমি হলেও পুরো প্রক্রিয়াটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ তৌহিদ ইমাম পরিচালনা করেছেন। এ বিষয়ে তিনিই বিস্তারিত বলতে পারবেন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের রাজস্ব খাতের এ কাজ ‘নিশিত বসু’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান পেয়েছে।’
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ তৌহিদ ইমাম আগামীর সময়কে বললেন, ‘নিয়ম মেনেই টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। এসএলটি অনুযায়ী ‘নিশিত বসু’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান কাজটি পেয়েছে। অনলাইনে টেন্ডারে কোনো ধরনের দুর্নীতির সুযোগ নেই। আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সত্য নয়।’
জুনের শেষ দিকে এত বড় টেন্ডার প্রসঙ্গে তৌহিদ ইমাম জানালেন, ‘ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশেই টেন্ডার দেওয়া হয়েছে। এটি রাজস্ব খাতের কাজ। নিয়ম অনুযায়ী জুনের মধ্যেই কাজ শেষ করার কথা।’
কাজের বিল পরিশোধ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বললেন, ‘যেহেতু জুন ক্লোজিং হয়ে গেছে, কাজের বিল কীভাবে পরিশোধ করা হবে, সেটি কর্তৃপক্ষই ভালো বলতে পারবে।’
যবিপ্রবি উপ-উপাচার্য অধ্যাপক শেখ মাহমুদুল হাসান জানালেন, তিনি কয়েকদিন হলো যোগদান করেছেন। এ বিষয় এখনো কোনো কিছু জানেন না।
যবিপ্রবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইয়ারুল কবির বললেন, ‘২০২৫-২৬ অর্থবছরের রাজস্ব বাজেটের টাকা নিদিষ্ট সময়ের মধ্যে খরচ করতে না পারায় তা ফেরত যাবে।’
এর আগে যবিপ্রবিতে কোটি কোটি টাকার লিফট ও ফায়ার ফাইটিং ডিটেকশন সিস্টেম প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগে দুদক তদন্ত করেছে। এ ছাড়া সাবেক উপাচার্যসহ একাধিক প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে আদালতে মামলাও চলমান রয়েছে।






