গুলশান-বনানী-বারিধারা লেক উন্নয়ন
৩ বছরের প্রকল্প শেষ হয়নি ১৬ বছরেও

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
রাজধানীর গুলশান-বনানী-বারিধারা লেক উন্নয়ন প্রকল্প। শেষ হওয়ার কথা ছিল তিন বছরে। কিন্তু পেরিয়ে গেছে প্রায় সাড়ে ১৬ বছর। এরপরও প্রকল্পের নেই বাস্তব কোনো অগ্রগতি। কাজ শেষ হয়েছে প্রায় ৮২ শতাংশ। টাকা খরচ হয়েছে আরও কম। হয়েছে মাত্র ৫৬ শতাংশ।
এরই মধ্যে যেসব কাজ শেষ হয়েছে, সেগুলো থেকেও মিলছে না প্রত্যাশিত সুফল। এখনো সাতটি স্থানে লেকের সঙ্গে সরাসরি স্যুয়ারেজ ও ড্রেনেজ সংযোগ রয়েছে। অনিয়ন্ত্রিতভাবে ফেলা হচ্ছে বর্জ্য। এতে পানির গুণগত মান নষ্ট হচ্ছে। ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ। অন্যদিকে জরাজীর্ণ অবকাঠামো, অপর্যাপ্ত নিরাপত্তা ও অবৈধ দখলে কমছে লেকের ব্যবহারযোগ্যতা।
ভূমি অধিগ্রহণের মামলা নিষ্পত্তি করতেই লেগেছে ১৫ বছর। বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাবও প্রকল্পকে দিয়েছে পিছিয়ে। ছিল কার্যকর তদারকিরও ঘাটতি।
বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) পরিচালিত নিবিড় পরিবীক্ষণের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এসব তথ্য।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক ছাবের আহমেদ আগামীর সময়কে বললেন, ‘আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই প্রকল্পের কাজ শেষ করা হবে। এখন যেসব কাজ বাকি রয়েছে, সেগুলো মূলত জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের। ভূমি অধিগ্রহণের অর্থ পরিশোধ করা গেলেই আর্থিক অগ্রগতি শতভাগ হবে।’
তিনি জানালেন, ‘মামলার কারণে দীর্ঘদিন প্রকল্পের কাজ বন্ধ ছিল। সেটি আমার দায়িত্ব নেওয়ার আগের ঘটনা। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে কাজ এগিয়ে চলছে।’
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীন রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। ঢাকার পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা। প্রাকৃতিক জলাধার পুনরুদ্ধার। এসব লক্ষ্য নিয়ে নেওয়া হয় গুলশান-বনানী-বারিধারা লেক উন্নয়ন প্রকল্প।
২০১০ সালের জুলাইয়ে কাজ শুরু হয় প্রকল্পটির। শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০১৩ সালের জুনে। কিন্তু নানা কারণে দফায় দফায় বাড়ানো হয় সময়। সর্বশেষ মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রকল্পের সময় বেড়েছে প্রায় ৪৫০ শতাংশ।
প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪১০ কোটি ২৫ লাখ টাকা। পরে তা বাড়িয়ে করা হয় ৫৫৫ কোটি ৩১ লাখ টাকা। অর্থাৎ মূল ব্যয়ের তুলনায় ব্যয় বেড়েছে ৩৫ দশমিক ৩৬ শতাংশ।
প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল লেক দখলমুক্ত করা। পানি ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি করা। জলাবদ্ধতা কমানো। একই সঙ্গে রাজধানীর পরিবেশগত উন্নয়নে ভূমিকা রাখা।
প্রকল্পের আওতায় লেক খনন, তীর সংরক্ষণ, লেক ড্রাইভ সড়ক, ওয়াকওয়ে নির্মাণ এবং বৃক্ষরোপণের মতো প্রধান অবকাঠামোগত কাজ শেষ হয়েছে। এতে এলাকাটির পরিবেশ ও যাতায়াত ব্যবস্থায় পরিবর্তন এসেছে কিছু ইতিবাচক। তবে প্রকল্প বিলম্বের অন্যতম কারণ ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতা। ১৫ বছরের আইনি জটিলতা শেষে ১০ দশমিক ৭৫ একর জমি অধিগ্রহণের কার্যক্রম আবার শুরু হয়েছে।
গত মে মাসে অনুষ্ঠিত পিএসসি সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নতুন ৩ দশমিক ২১ একর জমি প্রকল্প থেকে বাদ দিয়ে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো সংস্কারের জন্য দরপত্র মূল্যায়নের কাজও চলছে।
আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্প কার্যালয়ের সঙ্গে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এবং সংশ্লিষ্ট সোসাইটির মধ্যে সমন্বয় ছিল দুর্বল। নিয়মিত তদারকিও হয়নি।
লেকের পরিবেশগত উন্নয়নের লক্ষ্য নিয়ে প্রকল্পটি নেওয়া হলেও সরেজমিন তার পূর্ণ প্রতিফলন পাওয়া যায়নি। অনেক ক্ষেত্রে তৈরি হয়েছে নতুন ঝুঁকি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্রয় কার্যক্রমে পিপিআর-২০০৮ অনুসরণ করা হলেও ভেরিয়েশন অনুমোদনে নিয়মের ব্যত্যয় ঘটেছে। প্রকল্পে ২৩টি অডিট আপত্তি ওঠে। এর মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে ৯টি। বাকি ১৪টি ঝুলে আছে এখনো।
আইএমইডি আরও বলছে, প্রকল্প শুরুর আগে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করা হয়নি। সময়মতো ভূমি অধিগ্রহণ শেষ করা যায়নি। একাধিকবার প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তন হয়েছে। মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নে ছিল ধীরগতি। দরপত্র ও চুক্তি প্রক্রিয়ায় হয়েছে বিলম্ব। হয়নি প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ। নিয়মিত সমন্বয় সভাও হয়নি। মাঠপর্যায়ে মনিটরিং ছিল দুর্বল।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ইকো-ট্যুরিজম ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের মাধ্যমে একটি টেকসই নগর মডেল গড়ে তোলার সুযোগ থাকলেও তা কাজে লাগানো হয়নি।
লেকের পরিবেশ উন্নয়ন ও জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রকল্পটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে। তবে আইনি জটিলতা, দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, লেকের পানি ধারণক্ষমতা কমে যাওয়া, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
প্রকল্পের সার্বিক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, লেক খনন থেকে শুরু করে ওয়াকওয়ে ও সড়ক নির্মাণ পর্যন্ত সব কাজেই প্রকৌশল মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়েছে।
তবে প্রায় ৯ কিলোমিটার লেকের মধ্যে মাত্র ২ দশমিক ৪ কিলোমিটার অংশ থেকে ক্ষতিকর স্লাজ, পলি ও বর্জ্য অপসারণ করা হয়েছে। অপসারিত বর্জ্য ঢাকার বাইরে নির্ধারিত স্থানে নেওয়া হয়েছে।
পুনঃখনন করা অংশে পানি ধারণক্ষমতা বেড়েছে। কিন্তু লেকের বাকি অংশে এখনো বিপুল পরিমাণ পলি ও বর্জ্য জমে রয়েছে। এতে ভবিষ্যতে পানি ধারণক্ষমতা আরও কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। একই সঙ্গে লেকের প্রাকৃতিক পুনর্ভরণ প্রক্রিয়াও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
এ ছাড়া লেকের স্যুয়ারেজ লাইন বিচ্ছিন্নকরণ এবং বিকল্প নিষ্কাশন ব্যবস্থা এখনো পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। ঢাকা ওয়াসার পূর্ব পরিকল্পনা বাস্তবায়িত না হওয়ায় বর্জ্য প্রবাহ নিয়ন্ত্রণেও ঘাটতি রয়েছে। তবে ওয়াসার চলমান পানি শোধনাগার প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে এ সমস্যার আংশিক সমাধান হতে পারে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, গুলশান, বনানী ও বারিধারা দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। এসব এলাকার লেক নগরের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপ, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অবৈধ দখল এবং দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনায় লেকগুলো ধীরে ধীরে তাদের স্বাভাবিক রূপ হারিয়েছে। দূষিত হয়েছে পানি। কমেছে ধারণক্ষমতা। বেড়েছে পরিবেশগত অবক্ষয়।
একই সঙ্গে পর্যাপ্ত খোলা জায়গা, হাঁটার পথ ও বিনোদন সুবিধার অভাব নগরবাসীর জীবনমানেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এই বাস্তবতায় লেকগুলোর পুনরুদ্ধার, সংরক্ষণ ও আধুনিকায়ন এখনো সমানভাবে জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।







