৪৭তম বিসিএসে পুলিশ ক্যাডারে প্রথম
স্বপ্ন ছিল কনস্টেবল হলেন এএসপি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বাবার আনসারের ইউনিফর্ম, বুট আর বেল্ট নিয়ে খেলতে খেলতেই স্বপ্ন শুরু। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে ছিল ব্যর্থতা, অনিশ্চয়তা আর নানা চ্যালেঞ্জ। কিন্তু হাল ছাড়েননি বাচ্চু রহমান। ৪৫তম বিসিএসে প্রিলিমিনারিতে ব্যর্থ হওয়া সেই তরুণই আজ ৪৭তম বিসিএসে পুলিশ ক্যাডারে প্রথম। এই সাফল্যের পেছনের গল্প, প্রস্তুতির কৌশল আর ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে আগামীর সময়ের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মানিক রাইহান বাপ্পী
আগামীর সময় : বাচ্চু রহমান, প্রথমেই আপনাকে অভিনন্দন। পুলিশ ক্যাডারে প্রথম হওয়ার অনুভূতি কেমন?
বাচ্চু রহমান : সত্যি বলতে, প্রথম হব— আমি কখনোই ভাবিনি। কারণ ৪৭তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষার প্রশ্ন ছিল আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক ভিন্ন ও কঠিন। পরীক্ষা দিয়েও বুঝতে পারছিলাম না কেমন হয়েছে; ক্যাডার পাব কি না, তা নিয়ে খুবই চিন্তিত ছিলাম। সেই জায়গা থেকে পুলিশ ক্যাডারে প্রথম হওয়ার অনুভূতি বর্ণনাতীত। তবে এতটুকুই মনে পড়ে, রেজাল্ট দেখার পরে জোরে চিৎকার দিয়ে উঠেছিলাম। কথা বলতে পারছিলাম না, বিশ্বাস হচ্ছিল না যে আমিই প্রথম হয়েছি। নিজের রোল নম্বর দেখে বিশ্বাসই করতে পারিনি। কয়েকবার মিলিয়ে দেখেছি, ভাইকেও দিয়ে যাচাই করিয়েছি।
আগামীর সময় : পুলিশ ক্যাডারই কেন প্রথম পছন্দ?
বাচ্চু রহমান : ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন ছিল পুলিশের কনস্টেবল হওয়ার। কারণ বাবা আনসার সদস্য ছিলেন। তার ইউনিফর্ম, বুট, বেল্ট নিয়ে খেলতে খেলতেই বড় হয়েছি। তখন থেকেই মনে হতো, পুলিশ বা সেনাবাহিনীতে চাকরি করব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর জানতে পারি, বিসিএসের মাধ্যমে এএসপি হওয়া যায়। তখনই লক্ষ্য স্থির করি— পুলিশ ক্যাডারেই যাব। ক্যাম্পাস জীবনে প্রচুর পত্রিকা পড়তাম। এতে নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, মাদক ও সাইবার অপরাধের চিত্র চোখের সামনে ভেসে উঠত। এগুলোর বিরুদ্ধে কাজ করার প্রবল ইচ্ছা থেকেই এই ক্যাডারের প্রতি আগ্রহ আরও বাড়ে।
আগামীর সময় : বিসিএসের চিন্তা কীভাবে এলো?
বাচ্চু রহমান : ২০১৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মার্কেটিং বিভাগে ভর্তি হই। প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন ছিল। কিন্তু প্রথম দুই সেমিস্টারের ফলাফল খুবই খারাপ হয়। তখনই শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন ভেঙে যায়। এরপর সরকারি চাকরির দিকে নজর দিই। পরে জানতে পারি, বিসিএসের মাধ্যমে পুলিশের এএসপি হওয়া যায়। তখনই এএসপি হওয়ার প্রবল ইচ্ছা তৈরি হয়।
আগামীর সময় : প্রস্তুতির কৌশল কী ছিল?
বাচ্চু রহমান : কমার্স ব্যাকগ্রাউন্ডের ছাত্র ছিলাম। শুরু থেকেই মুখস্থনির্ভর প্রস্তুতিতে বিশ্বাস করিনি। প্রচুর পত্রিকা পড়তাম। বিসিএসের বইয়ের পাশাপাশি নিয়মিত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পত্রিকা পড়েছি। বিজ্ঞান, সমসাময়িক বিষয়, অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে গভীরভাবে জানার চেষ্টা করেছি। পড়াশোনার পাশাপাশি প্রচুর চিন্তা করতাম। গুগল, কুয়োরা ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক শিক্ষামাধ্যম ব্যবহার করে যেকোনো বিষয় বিস্তারিত বোঝার চেষ্টা করেছি। আমার বিশ্বাস, শুধু তথ্য মুখস্থ করলে হবে না; বিষয়টি কেন ঘটছে এবং তার সমাধান কী— সেটিও জানতে হবে।
আগামীর সময় : লিখিত পরীক্ষায় ভালো করার পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কী ছিল?
বাচ্চু রহমান : সত্যি বলতে, প্রিলির জন্য আলাদা কোনো প্রস্তুতি নিইনি। মূল ফোকাস ছিল লিখিত পরীক্ষার দিকে। প্রিলিমিনারির জন্য টানা পাঁচ-ছয় মাস পড়েছি। এতেই মোটামুটি প্রস্তুতি হয়ে গিয়েছিল। রিটেনে একটা কৌশল অবলম্বন করতাম— প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেওয়া। অপ্রয়োজনীয় ভূমিকা লিখতাম না। পয়েন্ট আকারে, সংক্ষিপ্ত ও তথ্যভিত্তিক উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেছি। পাশাপাশি টাইম ম্যানেজমেন্টে বিশেষ গুরুত্ব দিতাম। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সব প্রশ্ন শেষ করার চেষ্টা করেছি। পত্রিকার জ্ঞান লিখিত পরীক্ষায় দারুণ কাজে দিয়েছে।
আগামীর সময় : প্রস্তুতির সময় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী ছিল?
বাচ্চু রহমান : দীর্ঘ সময় পড়াশোনা করতাম। অনেক সময় দিনে ১৪-১৫ ঘণ্টাও পড়েছি। এতে কিছু শারীরিক সমস্যা হয়েছিল। এ ছাড়া বিসিএস ছাড়া অন্য কোনো চাকরির প্রস্তুতিতে মনোযোগ না দেওয়ায় মাঝেমধ্যে দুশ্চিন্তা কাজ করত। তবে পরিবার, বন্ধু ও ছোট ভাইদের সহযোগিতা আমাকে সব সময় অনুপ্রাণিত করেছে।
আগামীর সময় : শিক্ষা ক্যাডারে প্রথম হওয়ার পরও কেন সন্তুষ্ট ছিলেন না?
বাচ্চু রহমান : ৪৯তম বিসিএসে মার্কেটিংয়ে প্রথম হয়েছিলাম। শিক্ষকতা অবশ্যই সম্মানজনক পেশা। কিন্তু আমার মনে হয়েছে, পুলিশে থেকে মানুষের জন্য সরাসরি কাজ করার সুযোগ বেশি। সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে মানুষের সবচেয়ে কঠিন সময়ে পাশে দাঁড়ানোর ইচ্ছা থেকেই পুলিশ ক্যাডার বেছে নিয়েছি।
আগামীর সময় : ভবিষ্যতে কী ধরনের কাজ করতে চান?
বাচ্চু রহমান : পিবিআই, সিআইডি বা ডিবির মতো তদন্তভিত্তিক ইউনিটে কাজ করার আগ্রহ আছে। ভবিষ্যতে ক্রিমিনোলজিতে উচ্চশিক্ষা নিতে চাই। বিশেষ করে নারী নির্যাতন, মাদক ও সাইবার অপরাধ প্রতিরোধে কাজ করতে চাই। এমন কিছু করতে চাই, যাতে সাধারণ মানুষ পুলিশের প্রতি আস্থা রাখতে পারে।
আগামীর সময় : বিসিএস প্রার্থীদের জন্য পরামর্শ কী?
বাচ্চু রহমান : শুধু চাকরি পাওয়ার জন্য নয়, জানার জন্য পড়াশোনা করতে হবে। নিয়মিত পত্রিকা পড়তে হবে। দেশের ইতিহাস, সংবিধান, অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক বিষয় সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা রাখতে হবে। মৌলিক বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। বিশ্লেষণী চিন্তা বাড়াতে হবে।
আগামীর সময় : কোন ব্যর্থতা সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করেছে?
বাচ্চু রহমান : আমি অনেক পড়াশোনা করতাম। ৪৫তম বিসিএসে প্রিলিমিনারিতে ফেল করি। তখন জেদ করেছিলাম, এমনভাবে প্রস্তুতি নেব, যাতে যেকোনো প্রিলিতে ২০০-এর মধ্যে ১৫০ পাওয়া যায়। প্রিলিতে ব্যর্থ হওয়া এবং ৪৬তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষায় ব্যর্থতা আমাকে আরও পরিশ্রমী করেছে। কখনো হতাশ হইনি; বরং ব্যর্থতা আমার দুর্বলতা খুঁজে বের করতে সাহায্য করেছে।
আগামীর সময় : পাঁচ-দশ বছর পর নিজেকে কোথায় দেখতে চান?
বাচ্চু রহমান : পদ বা পদবি নয়; একজন সৎ, দক্ষ ও মানবিক পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে নিজেকে দেখতে চাই। মানুষ বিপদে পড়লে সাধারণত ডাক্তার বা পুলিশের কাছে যায়। এমনভাবে দায়িত্ব পালন করতে চাই, যাতে ভুক্তভোগী মানুষ পুলিশের প্রতি আস্থা পান। সততার সঙ্গে দেশের মানুষের জন্য কাজ করাই আমার সবচেয়ে বড় অর্জন হবে।
আগামীর সময় : আপনাকে ধন্যবাদ।
বাচ্চু রহমান : আপনাকেও আন্তরিক ধন্যবাদ।




