সোনালি স্বপ্নের বদলে কৃষকের চোখে এখন অনিশ্চয়তা

ছবি: আগামীর সময়
ঘনিয়ে এসেছে ধান কাটার সময়। মাঠজুড়ে এখন থাকার কথা সোনালি ফসলের উচ্ছ্বাস। কিন্তু রাজশাহীর পবা উপজেলার হরিপুর মাঠে সেই আনন্দের বদলে বইছে হতাশার হাওয়া। এক খেতে তিন রকম ধান দেখে দিশেহারা কৃষক। কোথাও ধান পেকে মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে, কোথাও সদ্য পেকেছে, আবার কোথাও নতুন করে শিষ বের হচ্ছে। এমন অস্বাভাবিক অবস্থায় শ্রমিকরাও ধান কাটতে রাজি নন।
তাই হতাশ কণ্ঠে কৃষক মোর্শেদ আলী বললেন, ‘পাইটের (শ্রমিকের) কাছে গেলছুনু। ওরা বুইলছে এই ধান কাটতে পাইরবে না।’
রাজশাহীর পবা উপজেলার নতুন কসবা গ্রামের কৃষক মোর্শেদ আলী করেছিলেন চার বিঘা জমিতে ব্রি ধান–৮৮ চাষ। গত বছর এই জাত থেকে বিঘাপ্রতি প্রায় সাড়ে ২৭ মণ ধান পেয়েছিলেন তিনি। ভালো ফলনের আশায় এবারও একই বীজ ব্যবহার করেন।
কিন্তু এবার তার জমিতে দেখা দিয়েছে ভয়াবহ বিপর্যয়। এক অংশের ধান পেকে নিচে পড়ে গেছে, আরেক অংশ সদ্য পেকেছে, আর অন্য অংশে এখনো নতুন শিষ বের হচ্ছে। একই জমিতে তিন রকম অবস্থার ধান দেখে হতভম্ব কৃষক।
মোর্শেদ আলীর ভাষ্য, ‘এবার ধানের আশা আমার একদম নাই। আমার দেখাদেখি এলাকার অনেকেই এই ধান চাষ করছে। ওরা আমাক বিশ্বাস করে। এবার আমার সঙ্গে ওহারেও সর্বনাশ হয়ে গেছে।’
হরিপুর মাঠে দূর থেকে তাকালে মনে হবে সবুজে ভরা কোনো স্বপ্নের ফসলি জমি। বাতাসে দুলছে ধানের শিষ। কিন্তু কাছে গেলেই চোখে পড়ে অদ্ভুত বাস্তবতা। পাকা ধান নিচে পড়ে আছে, তার ওপরে নতুন শিষ বাতাসে দুলছে। একই জমিতে তিন ধরনের ধান যেন কৃষকের দুর্ভাগ্যের প্রতিচ্ছবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কৃষকদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) অনুমোদিত ডিলারের কাছ থেকে কেনা ‘ব্রি ধান–৮৮’ জাতের ভিত্তিবীজ থেকেই এই বিপর্যয় তৈরি হয়েছে। যে ভিত্তিবীজকে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মনে করা হয়, সেই বীজই এখন কৃষকের জন্য দুঃস্বপ্ন হয়ে উঠেছে।
মুরারিপুর গ্রামের কৃষক মাসুদ রানাও একই দুর্ভোগে পড়েছেন। তিন বিঘা জমিতে এই ধান চাষ করেছিলেন তিনি। তার জমিতেও একই অবস্থা।
তিনি বলেছেন, ‘একটা ধান পেকেছে, একটা মাঝামাঝি, আরেকটার শিষ বের হচ্ছে। শ্রমিক নিয়ে গেছিলাম কাটতে। ওরা কইছে, সব ধান একসঙ্গে কাটতে হবে, আলাদা করে পাকা ধান কাটা যাবে না।’
এই মৌসুমে বাড়তি সার ও সেচ খরচে তিন বিঘা জমিতে তার ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩৩ হাজার টাকা। সেই টাকাও ধারের। এখন ফলন অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তার।
কথা বলতে বলতে ভেঙে পড়ছিলেন মাসুদ রানা। তিনি বললেন, ‘আমি শ্যাষ হয়্যা গেলছি ভাই, আপনারা একটু কিছু করেন।’
কৃষকেরা জানালেন, হরিপুর ইউনিয়নের বিএডিসির নির্ধারিত পরিবেশক আনারুল ইসলামের কাছ থেকেই তারা এই বীজ কিনেছিলেন।
আনারুল ইসলাম বলেছেন, 'প্রায় ২০ জন কৃষকের কাছে তিনি এই বীজ বিক্রি করেছেন এবং প্রায় সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ইতিমধ্যে কৃষকদের স্বাক্ষর নিয়ে বিএডিসির উপ-পরিচালকের কাছে আবেদন করা হয়েছে ক্ষতিপূরণের।'
বিএডিসি রাজশাহীর উপপরিচালক এ কে এম গোলাম সারওয়ারের মতে, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। তিনি নিজেও মাঠ পরিদর্শন করেছেন। তার ধারণা, কোনোভাবে ব্রি ধান–৮৮–এর সঙ্গে ব্রি ধান–৯২ মিশে গেছে। তবে কীভাবে এই মিশ্রণ ঘটেছে, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি এখনও।
‘ভিত্তিবীজে এ রকম হওয়ার সুযোগ নেই। কোথায় মিশে গেছে, সেটি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে, যোগ করেন তিনি।
জানা গেছে, রাজশাহীর বাইরে আরও কয়েকটি এলাকাতেও একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে। সেখানে কাজ শুরু করেছে তদন্ত কমিটি।
যে মাঠে সোনালি ধানের স্বপ্ন দেখেছিলেন কৃষকেরা, সেই মাঠেই এখন অনিশ্চয়তার ছায়া। পাকা ধান ঝরে পড়ছে, নতুন শিষ বাতাসে দুলছে, আর মাঝখানে দাঁড়িয়ে কৃষকের চোখে জমছে হতাশা। কারণ, কৃষকের কাছে বীজ শুধু ফসল নয়- এটি তার ভবিষ্যতের ভরসা। সেই ভরসাতেই এবার চিড় ধরেছে।




