‘ভাইরাল জাহিদ’ এখন সংসার চালান সৈকতে গান শুনিয়ে

সৈকতে গিটার হাতে জাহেদ হাসান
কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে ঘুরে ঘুরে পর্যটকদের বলতেন, ‘ভাইয়া, একটা গান শুনাই?’ বয়স তখন খুবই কম। হাতে মাইক নেই, বাদ্যযন্ত্র নেই, নেই কোনো মঞ্চও। ছিল শুধু গান গাওয়ার আগ্রহ আর অভাবের সংসার। সেই জাহিদ হাসান একসময় ‘মধু হই হই’ গান গেয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছিলেন। কণ্ঠের প্রশংসা ছড়িয়ে পড়ায় সুযোগ পান বিজ্ঞাপনে গান গাওয়ার। সৈকতের গণ্ডি পেরিয়ে ঢাকার বিভিন্ন মঞ্চে গান করেছেন। কাজ করেছেন কক্সবাজারের পাঁচ তারকা মানের সায়মান হোটেলেও। তখন মনে হয়েছিল, গানই হয়তো বদলে দেবে তার জীবন।
কিন্তু সময় সব হিসাব এক রাখেনি। মঞ্চের ডাক কমেছে, কাজের সুযোগও ফুরিয়েছে। একসময় আড়ালে চলে যাওয়া সেই জাহিদকে আবার দেখা যাচ্ছে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে। তবে এবার শিল্পী হিসেবে কোনো মঞ্চে নয়, সৈকতে পর্যটকদের গান শুনিয়ে জীবিকা নির্বাহের চেষ্টা করছেন তিনি।
ছোটবেলায় পরিবারের অসচ্ছলতার কারণে সৈকতে পর্যটকদের শরীর মাসাজ করে টাকা আয় করতেন জাহিদ। পরে গানকেই বেছে নেন আয়ের পথ হিসেবে। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় গান গেয়ে পর্যটকদের মন জয় করার চেষ্টা করতেন।
জাহিদ হাসান বললেন, ‘ছোটবেলা থেকেই সৈকতে কাজ করেছি। পর্যটকদের মাথা টিপে টাকা আয় করতাম। পরে গান গাইতে শুরু করি। পর্যটকদের বলতাম, ভাইয়া একটা গান শুনায়। কেউ টাকা দিতেন, কেউ দিতেন না। কিন্তু আমি গান গাওয়া ছাড়িনি।’
২০১৬ সালের দিকে বদলে যেতে শুরু করে তার জীবন। সৈকতে গান গাওয়ার সময় তার কণ্ঠ নজর কাড়ে অনেকের। পরে একটি বিজ্ঞাপনে গান গাওয়ার সুযোগ পান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে তার গান। বিশেষ করে ‘মধু হই হই’ গানটি তাকে এনে দেয় ব্যাপক পরিচিতি।
ভাইরাল হওয়ার পর ঢাকার বিভিন্ন মঞ্চে গান গাওয়ার সুযোগ পান জাহিদ। কিছুদিন সায়মান হোটেলেও গান করেছেন। পরিচিতি বাড়ার সঙ্গে তার জীবনও বদলাবে, এমন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সেই ব্যস্ততা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ধীরে ধীরে কমতে থাকে গান গাওয়ার সুযোগ। মঞ্চে ডাকও আগের মতো আসেনি। সংসারের খরচ মেটাতে তখন তাকে আবার নানা ধরনের কাজ করতে হয়েছে।
জাহিদ বলেছেন, ‘ভাইরাল হওয়ার পর অনেক মানুষ আমাকে চিনেছে। বিভিন্ন জায়গায় গান গাওয়ার সুযোগও পেয়েছি। কিন্তু সবসময় কাজ থাকে না। একটা সময় মঞ্চে গান গাওয়াও কমে যায়। তখন আবার জীবিকার জন্য নানা কাজ করতে হয়েছে।’
বর্তমানে সৈকতে পর্যটকদের কাছে গিয়ে গান শোনান জাহিদ। কোনো মঞ্চ নেই, নেই আলো-ঝলমলে আয়োজন। পর্যটকের সামনে দাঁড়িয়ে বা ঘুরে ঘুরে গান করেন। কেউ খুশি হয়ে টাকা দিলে নেন, না দিলে চলে যান অন্য কারও কাছে।
তার ভাষায়, ‘এখন আবার সৈকতে গান গাই। পর্যটকদের গান শোনাই। যেটুকু আয় হয়, তা দিয়ে সংসার চালানোর চেষ্টা করি। গান আমার ভালো লাগে, আবার গানই আমার আয়ের একটা পথ।’
জাহিদের কাছে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত শুধু পর্যটনকেন্দ্র নয়, এটি তার জীবনের উত্থান-পতনের সাক্ষী। শৈশবে এই সৈকতে কাজ করে পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন। এখানেই গান গেয়ে পেয়েছেন পরিচিতি। আবার জীবিকার সংকটে বছর ঘুরে সেই সৈকতেই ফিরতে হয়েছে তাকে।
তবে থেমে যেতে চান না জাহিদ। এখনো স্বপ্ন দেখেন আবার নিয়মিত মঞ্চে গান গাওয়ার। সুযোগ পেলে নিজের গান নিয়ে নতুন করে মানুষের সামনে দাঁড়াতে চান।
জাহিদ বললেন, ‘আমি আবার ভালোভাবে গান করতে চাই। সুযোগ পেলে মঞ্চে গান গাইতে চাই। মানুষ আমাকে আবার আগের মতো চিনুক, এটাই আমার আশা।’








