টেকনাফে অপহরণ-মুক্তিপণের পাহাড়ি সাম্রাজ্য
- অপরাধীদের হাতে ভারী অস্ত্র
- মিয়ানমার সংঘাতের অস্ত্রও তাদের হাতে
- দাবি উঠেছিল সেনাক্যাম্প স্থাপনের
- দেড় বছরে উদ্ধার ৫২৬ জনকে

কাজের সন্ধানে ঘর ছেড়েছিলেন চট্টগ্রামের বাঁশখালীর মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর। কিন্তু কর্মসংস্থানের প্রলোভনে তার ঠাঁই হয় মানব পাচারকারীদের আস্তানায়— পাহাড়ে। সেখানে আরও অনেকের সঙ্গে সাত দিন বন্দি থাকার পর যৌথ বাহিনীর অভিযানে মুক্তি পান তারা। তাদের উদ্ধার অভিযানে নিহত হন সেনাসদস্য তিতাস শেখ।
জাহাঙ্গীর জানালেন, বন্দিদশায় মারধর, লোহার শিকলে বেঁধে রাখা আর অনাহারের মতো পরিস্থিতিতে যেতে হয় তাকে। কাজ দেওয়ার কথা বলে এক দালাল তাদের পাচারকারীদের হাতে তুলে দেন। পরে পাচারকারীরা বলেছেন, তাকে কিনে নেওয়া হয় ১ লাখ টাকায়। পাহাড়ের গভীরে একটি ঝুপড়িতে আটকে রাখা হয় তাকে, প্রতিদিন সেখানে চার-পাঁচজন করে নতুন মানুষ আনা হতো। দিনে দুবার খাবার হিসেবে দেওয়া হতো পাতলা ডাল ও লাউয়ের তরকারি।
টেকনাফ পাহাড়ে জাহাঙ্গীরের মতো এমন নির্মমতা ঘটেছে একই সঙ্গে রাখা অনেকের ক্ষেত্রেও। এর আগে নির্যাতন করে কয়েক দফায় ট্রলারে তুলে সাগরপথে মালয়েশিয়ার দিকে পাচার করা হয় শতাধিক ব্যক্তিকে। টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের রঙ্গিখালী পাহাড়ে গত বৃহস্পতিবার যৌথ বাহিনীর অভিযানে জাহাঙ্গীরসহ ৫৬ জনকে উদ্ধার করা হয়। আটক করা হয় ৬ সন্দেহভাজনকে। প্রায় ১০২ জন রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশি নাগরিককে জিম্মি করে রাখার তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত হয় ওই অভিযান।
টেকনাফের রোহিঙ্গাক্যাম্প ও সংলগ্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে অপহরণ, মুক্তিপণ, চাঁদাবাজি, মাদক ও মানব পাচার ঘিরে চলছে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা। পাহাড়ের দুর্গম ভূখণ্ডকে আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহার করে এসব গোষ্ঠীর বিস্তার, আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় সংঘাতে ঘটছে গুলিবর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড। রোহিঙ্গা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তাকে করে তুলছে ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ। তৈরি হচ্ছে তরুণ-কিশোরদের সশস্ত্র কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা।
অপরাধীদের হাতে ভারী অস্ত্র
বৃহস্পতিবারের যৌথ অভিযানে অংশ নেওয়া এক পুলিশ সদস্য জানালেন, পাহাড়কেন্দ্রিক সশস্ত্র অপরাধীদের হাতে ভারী অস্ত্র থাকে। ওইদিন অভিযানে তাদের সঙ্গে আধা ঘণ্টা ধরে সন্ত্রাসীদের গোলাগুলি চলে। তার ধারণা, অস্ত্রধারীদের কাছে জি-থ্রি রাইফেল ছিল। ঘটনাস্থল থেকে চার রাউন্ড গুলি, একটি একনলা বন্দুক ও একটি দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়।
মিয়ানমার সংঘাতের অস্ত্রও তাদের হাতে
এর আগে পাহাড়ে এ ধরনের অভিযানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ার ঘটনা ঘটেনি। নোয়াপাড়া নিবন্ধিত ক্যাম্পের বাসিন্দা এক যুবক বললেন, মিয়ানমারের রাখাইনের আরাকান আর্মি ও জান্তার সংঘাতের সময়কার বেশ কিছু অস্ত্র রোহিঙ্গাক্যাম্পের মধ্য দিয়ে সন্ত্রাসীদের হাতে পৌঁছেছে। এসব অস্ত্র এখন ব্যবহার করছে সন্ত্রাসীরা।
টেকনাফ রোহিঙ্গাক্যাম্পে কর্মরত ১৬ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) অধিনায়ক, অতিরিক্ত ডিআইজি কাউসার সিকদার বললেন, গত কয়েক মাসের অভিযানে অনেককে আটক করে আইনের আওতায় আনা হয়েছে।
বর্তমানে সবচেয়ে ভয়ংকর হচ্ছে সাদ্দাম গ্রুপ ও আলম গ্রুপ
জানা গেছে, টেকনাফের নোয়াপাড়ায় নিবন্ধিত রোহিঙ্গাক্যাম্প, লেদাক্যাম্প, জাদিমুরা, শালবাগান-সংলগ্ন পাহাড়ে গত সাত বছরে অন্তত ১০টি সশস্ত্র সংগঠন ও বাহিনী তৎপরতা চালিয়ে আসছে। তাদের মধ্যে আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা), রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরএসও), আরাকান রোহিঙ্গা আর্মি (এআরএ), সাদ্দাম গ্রুপ, আলম গ্রুপ অন্যতম। এ ছাড়া নুর করিম গ্রুপ, হাবিব গ্রুপ, জাহাঙ্গীর গ্রুপ, জাকির গ্রুপ, হারুন গ্রুপ, খালেক গ্রুপ ও লেড়াইয়া গ্রুপও তৎপরতা রয়েছে ক্যাম্পগুলোতে।
নোয়াপাড়া রেজিস্টার্ড রোহিঙ্গাক্যাম্পের এক যুবক বললেন, ‘বর্তমানে সবচেয়ে ভয়ংকর সশস্ত্র গোষ্ঠী হচ্ছে সাদ্দাম গ্রুপ ও আলম গ্রুপ। দুই দলনেতাই রোহিঙ্গা। মূলত লেদা, জাদিমুড়া, নোয়াপাড়া নিবন্ধিত ক্যাম্প ও শালবাগান ক্যাম্পের একচ্ছত্র আধিপত্য তাদের হাতে। রোহিঙ্গাক্যাম্পে এ দুই গ্রুপের অনুমতি ছাড়া কারও কিছু করার সাধ্য নেই। স্থানীয়দের অনেকের সঙ্গে তাদের দহরম-মহরমের কথা রোহিঙ্গাদের বলতে শুনেছি।’
দাবি উঠেছিল সেনাবাহিনীর স্থায়ী ক্যাম্প স্থাপনের
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, সীমান্তবর্তী প্রায় ১১ হাজার ৬১৫ হেক্টর দুর্গম পাহাড় ও জঙ্গলের বিভিন্ন স্থানে আস্তানা গড়ে উঠেছে অপহরণকারী চক্রের। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে অস্ত্র, মাদক উদ্ধার এবং নির্যাতনের কাজে ব্যবহৃত টর্চার সেল ধ্বংস করা হলেও অপহরণ পুরোপুরি বন্ধ করা যায়নি। একটি চক্র দুর্বল হলে অন্য চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে— বললেন স্থানীয়রা।
বিশেষ করে রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির ২৪ ও ২৬-এর মধ্যবর্তী দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় সশস্ত্র অপরাধী চক্রের তৎপরতা দীর্ঘদিন ধরে। এমন পরিস্থিতিতে ওই এলাকায় সেনাবাহিনীর স্থায়ী ক্যাম্প স্থাপনের দাবি জোরালো হয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে পাহাড়কেন্দ্রিক টেকনাফে দুটি সেনাক্যাম্প স্থাপন করা হয়।
দেড় বছরে ৫২৬ জনকে উদ্ধার
টেকনাফ থানা-পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন বছরে অপহরণের অন্তত ২৮৮টি অভিযোগ জমা পড়েছে। এসব অভিযোগের মধ্যে কিছু ঘটনায় মামলা করা হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে অভিযোগকারীরা পরে আর থানার সঙ্গে যোগাযোগ করেননি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ৩ মার্চ পর্যন্ত টেকনাফে ৫২৬ জনকে উদ্ধার, ৪১ পাচারকারীকে গ্রেপ্তার এবং মানব পাচার আইনে ২০টি মামলা করা হয়েছে। অন্যদিকে স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, টেকনাফ উপজেলার বাহারছড়া, হ্নীলা ও হোয়াইক্যং ইউনিয়নের পাহাড়ি এলাকায় গত তিন বছরে অন্তত ৪৮৫ জন অপহরণের শিকার হন। তাদের অধিকাংশই মুক্তিপণ দিয়ে পরিবারের কাছে ফিরেছেন। শুধু গত এক বছরেই অপহৃত হয়েছেন অন্তত ১৭৫ জন। তাদের মধ্যে ৭৯ জন রোহিঙ্গা। বাকিরা স্থানীয় জেলে, কৃষক, দিনমজুর, ব্যবসায়ী, বনজসম্পদ সংগ্রহকারী, শ্রমিক ও সাধারণ গ্রামবাসী। জেলা পুলিশ সুপার এ এন এম সাজিদুর রহমান বললেন, মানব পাচার ও অপহরণের মতো অপরাধ সম্পূর্ণ নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত যৌথবাহিনীর অভিযান অব্যাহত থাকবে।
নির্যাতনের ভয়াবহতা
মুক্তিপণ দিয়ে অপহরণকারীদের হাত থেকে ফিরে আসা নুরুল মোস্তফা, ফরিদ আলম ও মাহমুদুল হকের বর্ণনায় উঠে এসেছে অপহরণকারী চক্রের ভয়াবহ নির্যাতনের চিত্র। তাদের ভাষ্য, অপহরণকারীদের কাছে বাংলাদেশি না রোহিঙ্গা— কোনো পরিচয়েরই মূল্য নেই।
নুরুল মোস্তফা আরও বলছিলেন, তাকে অপহরণের পর প্রথমেই তার মায়ের কাছে ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। টাকা দিতে দেরি হওয়ায় শুরু হয় মারধর। তিনি বলেছেন, ‘সেই নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে আমি নিজেই বাড়িতে ফোন করে যেভাবেই হোক টাকা জোগাড় করতে বলি। শেষ পর্যন্ত ৭০ হাজার টাকা দেওয়ার পর তারা আমাকে ছেড়ে দেয়।’
ব্যবসায়ী মাহমুদুল হক (৩৮) বলছিলেন, পাঁচ দিন তাকে আটকে রেখে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়। চাহিদা অনুযায়ী টাকা পাহাড়ে পৌঁছে দেওয়ার পর তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। তিনি বলছিলেন, ‘অপহরণকারীদের দলে প্রায় ১০ জন ছিল। তাদের হাতে অন্তত চারটি ভারী অস্ত্র দেখেছি। দলে বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা— উভয়েই ছিল।’
অপহরণের অধিকাংশ ঘটনায় ভুক্তভোগীর পরিবার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে না জানিয়ে সরাসরি অপহরণকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে মুক্তিপণ দিয়ে স্বজনদের ফিরিয়ে আনে। প্রতিশোধের আশঙ্কায় অনেক পরিবার মামলা করতে আগ্রহী হয় না। ফলে অপহরণের সংখ্যা সরকারি পরিসংখ্যানের তুলনায় আরও বেশি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।



