নাটোরে সড়ক দুর্ঘটনা
রাতে বলেছিলেন ভাঙ্গায়, সকালে খবর এলো স্বামী আর বেঁচে নেই

জুয়েল মাদবরের মৃত্যুতে স্ত্রীসহ স্বজনদের আহাজারি। ছবি: আগামীর সময়
‘আল্লাহ, আমার কাছে কইয়া গেছে রাজশাহী যাইব। সন্ধ্যা ৭টার দিকে রওনা দিছে। রাত ১০টার দিকে ফোন দিছি। কইছে, বাসের জন্য ভাঙ্গায় আছি। এইডাই তার সঙ্গে আমার শেষ কথা। সকালে একজন ফোন দিয়া কয়, তোমার স্বামী আর বেঁচে নেই।’
কথাগুলো বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন নাটোরে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত জুয়েল মাদবরের স্ত্রী মৌসুমী আক্তার।
আগের রাতেও স্বামীর সঙ্গে কথা হয়েছিল মৌসুমীর। কোথায় যাচ্ছেন, কী কাজে যাচ্ছেন, সবই জানিয়েছিলেন জুয়েল। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে সেই পরিচিত কণ্ঠের বদলে স্ত্রীর কাছে আসে স্বামীর মৃত্যুসংবাদ।
এখনো যেন বিশ্বাস করতে পারছেন না মৌসুমী। যে মানুষটি সংসারের হাল ধরতে, সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়তে ব্যবসার কাজে বের হয়েছিলেন, সেই মানুষটিই আর ফিরবেন না। অথচ বাড়িতে তার ফেরার অপেক্ষায় রয়েছে চার বছরের মেয়ে রিদিতা ও দুই বছরের ছেলে সাইফান। তাদের ছোট্ট পৃথিবীতে এখনো বাবা মানে ফিরে আসার অপেক্ষা, বাবার কাছে যাওয়ার আবদার।
আজ মঙ্গলবার ভোরে নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার বনপাড়া এলাকার নাটোর-পাবনা মহাসড়কের সরকারপাড়া এলাকায় যাত্রীবাহী বাস ও বালুবোঝাই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে জুয়েল মাদবরসহ জাজিরার পাঁচ ব্যবসায়ী নিহত হন। এ দুর্ঘটনায় মোট ১৪ জন নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। আহত হয়েছেন আরও বেশ কয়েকজন।
জীবিকার প্রয়োজনে ব্যবসার কাজে বের হয়েছিলেন জুয়েল। পরিকল্পনা ছিল রাজশাহীর তাহেরপুর থেকে ভুট্টাসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য কিনে বাড়ি ফেরার। কিন্তু সেই যাত্রা আর শেষ হয়নি। বাড়িতে ফেরার বদলে তার মৃত্যুর খবর পৌঁছেছে স্বজনদের কাছে।
‘বিধবা হলাম, সন্তানদের এখন কী হবে’
জুয়েলের স্ত্রী মৌসুমী আক্তার বলেন, ‘যে বয়সে স্বামীর সংসারে সন্তানদের নিয়ে সুখে-শান্তিতে থাকার কথা, সেই বয়সে এসে আমি বিধবা হলাম। আমি এখন কী নিয়ে বাঁচব? আমার সন্তানদের এখন কী হবে?’
স্বামীকে হারানোর শোকের সঙ্গে এখন দুই সন্তানকে নিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের চিন্তাও ভর করেছে তার মনে। যে মানুষটির সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছেন সংসারের সুখ-দুঃখ, সেই মানুষটিকে হারিয়ে এখন একাই সন্তানদের বড় করার কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি মৌসুমী।
‘সকালে ফোন পাই, ভাই নাটোরে মারা গেছে’
রাতে ভাই শাহজাহান মাদবরের সঙ্গেও কথা হয় জুয়েলের। শাহজাহান বলেন, ‘গত রাতে জুয়েল আমাকে ফোন দিয়ে বলেছিল, ভুট্টা কিনতে নাটোর যাবে। আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কীভাবে যাবি? সে বলেছিল, সবাই একসঙ্গে পদ্মা সেতুর গোড়া থেকে বাসে উঠবে। এরপর সকালে ফোন পাই, আমার ভাই নাটোরে মারা গেছে। রাতে যে ভাইয়ের সঙ্গে কথা হলো, সকালে শুনলাম সে আর নেই।’
আগের রাতে ব্যবসার পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলা ভাইয়ের মৃত্যুসংবাদ সকালে শুনতে হবে, তা কল্পনাও করেননি শাহজাহান।
‘মা, বাবা কই, কখন আসবে?’
জুয়েলের চার বছরের মেয়ে রিদিতা ও দুই বছরের ছেলে সাইফান এখনো বাবার ফেরার অপেক্ষায়। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, তারা মাকে জিজ্ঞাসা করছে, ‘বাবা কই, মা কখন আসবে?’
শিশু দুটির কাছে বাবার অনুপস্থিতির অর্থ এখনো স্পষ্ট নয়। হয়তো তারা ভাবছে, বাবা কোথাও গেছেন, আবার ফিরে আসবেন। কিন্তু তাদের সেই অপেক্ষার অবসান ঘটবে না আর কোনো দিন।
রিদিতার বয়স মাত্র চার বছর। সাইফানও শৈশবের একেবারে শুরুতে। এই বয়সে বাবার হাত ধরে হাঁটা, বাবার সঙ্গে গল্প করা কিংবা ছোট ছোট আবদার পূরণের কথা তাদের জীবনে থাকার কথা ছিল। অথচ সেই স্মৃতিগুলো গড়ে ওঠার আগেই তারা হারাল বাবাকে।
এক বছর আগে বাবাকে হারান জুয়েল
প্রায় দুই যুগ ধরে জাজিরার কাজিরহাট এলাকায় ব্যবসা করতেন জুয়েল মাদবর। ভুট্টার ব্যবসার পাশাপাশি সেখানে রড-সিমেন্টের ব্যবসাও ছিল তার। দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক সম্পর্কের কারণে স্থানীয় বাজারে পরিচিতি ছিল জুয়েলের।
পরিবারের সদস্যদের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় এক বছর আগে জুয়েলের বাবাও মারা যান। বাবাকে হারানোর শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই এবার জুয়েলের মৃত্যুর খবর পেল পরিবার।
একদিকে ভাইকে হারানোর বেদনা, অন্যদিকে তার স্ত্রী ও ছোট দুই সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা। সব মিলিয়ে পরিবারটির সামনে এখন কঠিন সময়।
চালককে গতি কমাতে বলেছিলেন যাত্রীরা
জুয়েল মাদবর ছাড়াও দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন জাজিরা উপজেলার আরও চার ব্যবসায়ী। তারা হলেন ডুবিসায়বর মোল্যাকান্দি এলাকার জাহান উদ্দিন মোল্যার ছেলে সালাল মোল্যা, ডুবিসায়বর কাজিরহাট এলাকার ইউনুস শিকদারের ছেলে সোহাগ শিকদার, কাজিরহাট এলাকার ভুসামাল ব্যবসায়ী সামাদ ফকির এবং পালেরচর ইউনিয়নের কাথুরিয়া এলাকার রাজ্জাক বেপারীর ছেলে হলুদ ব্যবসায়ী শাহিন বেপারী।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পাঁচজনই দীর্ঘদিন ধরে জাজিরার কাজিরহাটসহ আশপাশের এলাকায় ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ব্যবসায়িক প্রয়োজনে তারা রাজশাহীর তাহেরপুরে যাচ্ছিলেন। সেখান থেকে ভুট্টা, পেঁয়াজ, রসুন, ধনিয়াসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য কেনার পরিকল্পনা ছিল তাদের।
দুর্ঘটনায় বেঁচে যাওয়া এক যাত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, যাত্রাবিরতির পর বাসটি অনিয়ন্ত্রিতভাবে চলছিল। চালককে তন্দ্রাচ্ছন্ন মনে হওয়ায় যাত্রীরা তাকে সতর্ক করেন এবং গতি কমানোর অনুরোধ জানান বলে দাবি করেন ওই যাত্রী। একপর্যায়ে বিপরীত দিক থেকে আসা বালুবোঝাই ট্রাকের সঙ্গে বাসটির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়।
পাঁচ ব্যবসায়ীর আকস্মিক মৃত্যুতে জাজিরার পরিবার-পরিজন, স্বজন ও ব্যবসায়ী মহলে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।





