বিদেশি ব্র্যান্ডের মোড়কে তৈরি হতো নকল সাপ্লিমেন্ট

জব্দ করা নকল সাপ্লিমেন্ট
বাইরে থেকে সাধারণ একটি বাড়ি। দরজায় তালা। ভেতরে চলছিল ভিন্ন এক কারবার। তৈরি হচ্ছিল বিদেশি নামীদামি প্রতিষ্ঠানের নামে ফুড সাপ্লিমেন্ট। প্যাকেটের গায়ে যুক্তরাজ্য, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র কিংবা মালয়েশিয়ার পরিচয়। দাম দুই থেকে তিন হাজার টাকা। অথচ উৎপাদনের ঠিকানা রাজশাহীর বাঘা।
অনলাইনে অর্ডার নেওয়া হতো। কুরিয়ার সার্ভিসে পৌঁছে যেত ক্রেতার ঠিকানায়। এভাবেই বিদেশি ব্র্যান্ডের মোড়কে বাজারজাতের প্রস্তুতি চলছিল বিপুল পরিমাণ নকল ফুড সাপ্লিমেন্টের। শেষ পর্যন্ত সন্ধান মেলে গোপন কারখানাটির। অভিযানে জব্দ করা হয় প্রায় দেড় কোটি টাকা মূল্যের পণ্য। এর মধ্যে দুই ট্রাক পণ্য ঘটনাস্থলেই পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর বাঘা উপজেলার তেঁথুলিয়া মাঠের ওই বাড়িতে অভিযান চালায় প্রশাসন। প্রায় দুই ঘণ্টার এই অভিযানে ভেতরে পাওয়া যায় কার্টনভর্তি তৈরি সাপ্লিমেন্ট। ছিল উৎপাদনের যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য সরঞ্জাম। আরও তিন ট্রাক পণ্য সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি চলছিল। জব্দ করা মালামাল পরিবহনে আনা হয় আড়ানী পৌরসভার একটি ট্রাক।
অভিযানে নেতৃত্ব দেন বাঘা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নুসরাত জাহান। সঙ্গে ছিলেন ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের রাজশাহী জেলার তত্ত্বাবধায়ক মেহেদী আফজাল ও বাঘা থানা-পুলিশের সদস্যরা। কারখানার পণ্যের মোড়কগুলো ছিল বেশ আকর্ষণীয়। কোথাও যুক্তরাজ্যে উৎপাদনের তথ্য। কোথাও জাপানি কোম্পানির নাম। আবার কোনো প্যাকেটে যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদনসংক্রান্ত পরিচয়। এসব পণ্যের মধ্যে ছিল ‘কারকুমা’ নামের একটি সাপ্লিমেন্ট। প্রতিটি প্যাকেটের দাম লেখা ২ হাজার ১৭০ টাকা। কোরিয়ায় তৈরি বলে প্রচার করা একটি পণ্যের দাম ২ হাজার ৩৯৯ টাকা। মালয়েশিয়ার নাম ব্যবহার করা আরেকটির দাম ২ হাজার ২৯০ টাকা।
ওষুধ প্রশাসনের কর্মকর্তা মেহেদী আফজাল বলেছেন, ‘বিদেশি প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে অনুমোদনহীন এসব পণ্য তৈরি করা হচ্ছিল। পণ্যভেদে প্রতিটি প্যাকেটের দাম দুই থেকে তিন হাজার টাকা। মোড়কে সরাসরি ওষুধ হিসেবে উল্লেখ না থাকায় ওষুধ প্রশাসনের আইনি পদক্ষেপে জটিলতা রয়েছে। তবে অনুমোদন না থাকায় ভ্রাম্যমাণ আদালতে জরিমানা করা হয়েছে।
তিনি আরও জানালেন, এই কারখানার সন্ধান পাওয়া যায় রাজধানীর বনানী থানার একটি মামলার তদন্তে। গত বুধবার গোপন তথ্যের ভিত্তিতে বাঘায় অভিযান চালায় বনানী থানা-পুলিশ। স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় পরিচালিত ওই অভিযানে ১১ জনকে আটক করা হয়। তাদের মধ্যে মামলার দুই আসামিকে ঢাকায় নিয়ে যায় পুলিশ।
যোগাযোগ করা হলে বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. সালাউদ্দিন জানালেন, জুলাই মাসে করা একটি মামলার তদন্তের সূত্র ধরে বাঘায় অভিযান চালানো হয়। সেখান থেকে মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আলামত জব্দ করা হয়েছে। নকল ফুড সাপ্লিমেন্ট তৈরির কারখানাটির সন্ধানও মেলে ওই অভিযানে। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে পাঁচজন অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। অন্য চারজনকে ভ্রাম্যমাণ আদালতে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। জরিমানার অর্থ তাৎক্ষণিক আদায় করা হয়। পরে কারখানাটি সিলগালা করে দেওয়া হয়। জরিমানার রশিদে স্বাক্ষর করেন চারঘাটের চকলক্ষ্মীপুর গ্রামের খালিদ হাসান। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯-এর ৪১ ধারায় এ জরিমানা করা হয়।
সরজমিনে দেখা গেছে, কারখানার ভেতরের দৃশ্যও ছিল অস্বাভাবিক। উৎপাদন যন্ত্রপাতির পাশেই ছিল শোবার খাট ও খাবারের থালাবাসন। বাড়ির ভেতরেই ছিল নলকূপ। বাইরে থেকে অবশ্য কিছু বোঝার উপায় ছিল না।
স্থানীয়দের ভাষ্য, বাড়িটি সব সময় তালাবদ্ধ থাকত। পেছনের একটি দরজা দিয়ে লোকজন ভেতরে প্রবেশ করতেন। বাড়িটির মালিক হায়দার আলী চাকরির সুবাদে ঢাকায় থাকেন। তার ভাই শামীম ও মা রিনা বেগম জানালেন, প্রায় ৬ মাস আগে নাটোরের রেজাউল করিম নামের এক ব্যক্তি মাসিক ৮ হাজার টাকায় বাড়িটি ভাড়া নেন। ভেতরে কী কাজ চলত, তা তারা জানতেন না বলে দাবি করেন।
শামীমের দাবি, ভাড়াটিয়া রেজাউল করিম ‘নাটোর ভেষজ মার্ট’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্সের ফটোকপি জমা দিয়েছিলেন। নাটোরের খোলাবাড়িয়া ইউনিয়ন থেকে নেওয়া ওই লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২৫ সালের ৫ মে। তবে রেজাউল করিমের মোবাইলে বন্ধ থাকায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
কারখানায় পাওয়া পণ্যগুলো কীভাবে বাজারে ছড়িয়েছে, তার কিছু নমুনাও পেয়েছেন অভিযানে অংশ নেওয়া কর্মকর্তারা। কুরিয়ারে পাঠানোর জন্য প্রস্তুত করা পার্সেল জব্দ করা হয়েছে।
প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, অনলাইনেই চলত পণ্যের বিপণন। অর্থাৎ উৎপাদন হতো বাঘার একটি বাড়িতে, আর বিক্রির নেটওয়ার্ক ছিল অনলাইন ও কুরিয়ারনির্ভর। প্রায় দেড় কোটি টাকার পণ্য জব্দ ও ধ্বংসের মধ্য দিয়ে কারখানাটির কার্যক্রমের একটি চিত্র সামনে এসেছে। তবে কত দিন ধরে এই উৎপাদন চলছিল, দেশের কোথায় কোথায় পণ্য সরবরাহ করা হয়েছে এবং এর পেছনে আর কারা রয়েছেন- এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি।



