নিজের স্বপ্ন থামিয়ে গ্রামের শিশুদের স্বপ্ন বুনছেন শামীম

ছবি: আগামীর সময়
উন্নত জীবনের স্বপ্ন ছিল। বিদেশে যাওয়ার ইচ্ছাও ছিল। ঢাকায় গড়ে তুলতে পারতেন নিজের ক্যারিয়ার। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজের স্বপ্নের চেয়ে গ্রামের শিশু-কিশোরদের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্নকেই বড় করে দেখেছেন কুমিল্লার মেঘনার লক্ষীপুর গ্রামের শামীম বাদশাহ।
মরহুম হাজী খোরশেদ আলমের ছেলে শামীম বাদশাহ। সাধারণ পরিবেশে বেড়ে ওঠা এই তরুণেরও অন্যদের মতোই স্বপ্ন ছিল পড়াশোনা শেষ করে ভালো কিছু করার। তবে সময়ের সঙ্গে তার সেই স্বপ্নের পরিধি বদলে যায়। নিজের সাফল্যের পাশাপাশি অন্যদের জীবনেও পরিবর্তন আনার তাগিদ থেকেই শহুরে জীবন ছেড়ে এখন গ্রামের শিশুদের পাশে দাঁড়িয়েছেন তিনি।
শেখেরগাঁও আব্দুল অদুদ মুন্সী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০১৫ সালে মাধ্যমিক এবং দনিয়া বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে ২০১৭ সালে উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করেন শামীম। পরে ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।
স্কুলজীবনে আর দশজন শিক্ষার্থীর মতোই ছিলেন তিনি। তবে কলেজে ওঠার পর ইংরেজি ভাষা ও বিষয়ের প্রতি তার বিশেষ আগ্রহ তৈরি হয়। সেই আগ্রহ থেকেই আইইএলটিএস পরীক্ষাও সম্পন্ন করেন। উচ্চশিক্ষা ও উন্নত জীবনের আশায় বিদেশে যাওয়ার পরিকল্পনাও ছিল। একই সঙ্গে ঢাকায় নিজের ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগও তৈরি হয়েছিল। কিন্তু নিজের জীবনে সাফল্য অর্জনের চেয়ে অন্যের জীবন বদলে দেওয়ার সুযোগকেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন শামীম।
গ্রামের শিক্ষার সংকট বদলানোর স্বপ্ন
লক্ষীপুর গ্রামের অনেক ছেলে-মেয়ে ধীরে ধীরে পড়াশোনা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে—বিষয়টি তাকে ভাবিয়ে তোলে। গ্রামে ভালো মানের শিক্ষকের সংকটও রয়েছে। উচ্চশিক্ষিত তরুণদের অধিকাংশই উন্নত জীবনের আশায় গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র চলে যান। ফলে গ্রামে থাকা শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পড়াশোনা ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার মতো মানুষের সংখ্যা কমে যায়।
এই বাস্তবতায় ইংরেজি শিক্ষার গুরুত্ব উপলব্ধি করেন শামীম। তার বিশ্বাস, একজন শিক্ষার্থী ইংরেজিতে দক্ষ হয়ে উঠতে পারলে উচ্চশিক্ষা ও কর্মজীবনে তার সামনে অনেক নতুন সুযোগ তৈরি হয়। নিজের অর্জিত জ্ঞান তাই শুধু নিজের মধ্যে আটকে না রেখে গ্রামের শিশু-কিশোরদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
বাবার মৃত্যুর পর বদলে গেল জীবনের পথ
গত ২৫ জুন বাবার মৃত্যুর পর গ্রামের শিশু-কিশোরদের শিক্ষার বিষয়টি আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করেন শামীম। এরপর আর ঢাকায় ফেরেননি তিনি।
স্কুলজীবন শেষ হওয়ার পর দীর্ঘদিন ঢাকায় বসবাস করা এবং শহুরে জীবনে অভ্যস্ত এই তরুণ এখন গ্রামের মাটিতেই অবস্থান করছেন। গত তিন মাস ধরে কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই গ্রামের ছেলে-মেয়েদের বিনামূল্যে ইংরেজি শেখাচ্ছেন তিনি।
অবশ্য জীবিকার প্রয়োজনে তার একটি প্রিমিয়াম স্টুডেন্ট ব্যাচও রয়েছে। তবে এর বাইরে গ্রামের শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে পাঠদান চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
শামীমের উদ্যোগ শুধু ইংরেজি শিক্ষাতেই সীমাবদ্ধ নয়। গ্রামের শিশুরা যেন ধর্মীয় শিক্ষাতেও পিছিয়ে না পড়ে, সে বিষয়টিও গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি। ইংরেজির পাশাপাশি আরবি শিক্ষা, সূরা-কালাম শুদ্ধভাবে শেখা এবং সঠিক নিয়মে নামাজ আদায়ের বিষয়েও শিশুদের সহযোগিতা করতে চান তিনি।
‘পরিবর্তনের শুরুটা একজন মানুষ থেকেই হতে পারে’
শামীম বাদশাহ মনে করেন, একজন আদর্শ ও দায়িত্বশীল শিক্ষক শুধু একটি বিষয় শেখান না; একজন শিক্ষার্থীর চিন্তাভাবনা, আত্মবিশ্বাস ও ভবিষ্যৎ গঠনের পথেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
নিজের সামর্থ্য যতটুকু, সততার সঙ্গে সেই দায়িত্ব পালন করাকেই বড় করে দেখছেন তিনি।
শামীম বাদশাহ বলেন, অজপাড়া গ্রামের এই ছেলে-মেয়েদের জন্য কিছু করতে পারছি, এটাই আমার কাছে অনেক বড় পাওয়া। তারা ইংরেজির পাশাপাশি আরবিতেও প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করুক, সূরা-কালাম শুদ্ধভাবে শিখুক এবং সঠিক নিয়মে নামাজ আদায় করতে পারুক—এটাই আমার চাওয়া।
তিনি বলেন, আমার স্বপ্ন খুব বড় কিছু নয়। আমি চাই, আমার এই ছোট উদ্যোগ একদিন লুটেরচর ইউনিয়নের আরও অনেক গ্রামে ছড়িয়ে পড়ুক। একা একজন মানুষের পক্ষে সমাজের সবকিছু বদলে দেওয়া সম্ভব নয়, কিন্তু পরিবর্তনের শুরুটা একজন মানুষ থেকেই হতে পারে। আমি সেই পরিবর্তনের একজন ছোট্ট সহযোগী হতে চাই।
নিজের ভবিষ্যতের চেয়ে এলাকার শিশুদের ভবিষ্যৎকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে শামীম বলেন, নিজের জন্য যতটা না, তার চেয়েও বেশি আমার এলাকার ছেলে-মেয়েদের ভবিষ্যতের জন্য কাজ করে যেতে চাই। এই অজপাড়া গাঁয়ের সন্তানদের জন্য নিজেকে সততার সঙ্গে উজাড় করে দিতে চাই। সবাই আমার জন্য দোয়া করবেন, যেন আমি আমার গ্রামের এই ছেলে-মেয়েদের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার একজন সত্যিকারের সহযোগী হতে পারি।



