পায়রার ভাঙনে বিলীন শত শত ঘর, আড়াই বছরেও হয়নি প্রতিকার

বাহেরচর ও আশপাশের এলাকায় পায়রা নদীর ভাঙন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ছবি: আগামীর সময়
পটুয়াখালীর দুমকী উপজেলার আঙ্গারিয়া ইউনিয়নের বাহেরচর ও আশপাশের এলাকায় পায়রা নদীর ভাঙন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। এরই মধ্যে কয়েকশ ঘরবাড়ি ও কৃষিজমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ভাঙনের ঝুঁকিতে থাকা অনেক পরিবার বসতঘর সরিয়ে রাস্তার পাশে ঝুপড়ি তুলে বসবাস করছেন। কেউ আশ্রয় নিয়েছে সরকারি আবাসনে। আবার আর্থিক সংকট ও ঋণের চাপে কেউ কেউ এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন।
ক্ষতিগ্রস্তদের অভিযোগ, নদীভাঙন রোধে জরুরি সংস্কারের আওতায় নেওয়া প্রকল্পের কাজ আড়াই বছরেও শেষ করতে পারেনি পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। ফলে প্রতিদিনই নদীতে বিলীন হচ্ছে নতুন নতুন ঘরবাড়ি ও কৃষিজমি।
আজ মঙ্গলবার সরেজমিন আঙ্গারিয়া ইউনিয়নের বাহেরচর গ্রাম ঘুরে এবং স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, গত এক বছরে শতাধিক পরিবার ঘরবাড়ি ও কৃষিজমি হারিয়েছে। এর আগের কয়েক বছরে আরও প্রায় ২০০ পরিবার নদীভাঙনের শিকার হয়েছে। ভাঙন থেকে রক্ষা পাওয়া স্থাপনাগুলোও এখন সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। অনেক পরিবার ভাঙা ঘরের টিন, কাঠসহ বিভিন্ন মালামাল দিয়ে রাস্তার পাশে অস্থায়ী ঝুপড়ি তৈরি করে বসবাস করছে।
ভাঙনে বসতঘর হারিয়ে স্বামী-সন্তান নিয়ে স্থানীয় সরকারি আবাসনে থাকছেন লাকী বেগম (২৩)। তার স্বামী আল আমীন (২৭) নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন। দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ তিনি। এর মধ্যে জমি-জমা ও বসতঘর হারিয়ে পরিবারটি এখন সরকারি আবাসনে আশ্রয় নিয়েছে।
লাকী বেগমের মতো বসতঘর হারিয়ে সরকারি আবাসনে থাকছেন মো. রুবেল হাওলাদার (৪২)। তার ভাষ্য, ২০২১ সালে নদীতে তার ঘর বিলীন হয়। এরপর পরিবার নিয়ে সরকারি আবাসনে বসবাস করছেন।
লাভলী বেগম (৩৫) এক বছর আগে ক্যানসারে স্বামীকে হারিয়েছেন। স্বামী মারা যাওয়ার ছয় মাসের মধ্যেই তার বসতঘরও নদীতে বিলীন হয়। পরিবারে উপার্জন করার মতো আর কেউ না থাকায় চরম অসহায় অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন তিনি। একইভাবে এক বছর আগে বসতঘর হারিয়ে পরিবার নিয়ে আবাসনে আশ্রয় নিয়েছেন ট্রলারচালক মো. অলিউল্লাহ।
সরেজমিন দেখা যায়, বসতভিটা হারিয়ে পায়রা নদীর তীরে বসে আছেন শতবর্ষী মো. দলিল উদ্দিন ফকির। গত বছরের অক্টোবরে তার বসতঘর নদীতে বিলীন হয়। এখন রাস্তার পাশে ঝুপড়ি তুলে পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন।
স্থানীয় ট্রলারশ্রমিক জাকির হোসেনও (৪০) একই পরিস্থিতিতে রয়েছেন। তার ভাষ্য, দুই বছর আগে নদীতে তার বসতঘর বিলীন হয়। পরে অন্য জায়গায় নতুন ঘর তুলে বসবাস শুরু করেন। কিন্তু গত বছরের অক্টোবরে সেই ঘরও নদীগর্ভে চলে যায়। এখন নতুন জমি কেনা বা ঘর তোলার সামর্থ্য নেই। তাই পুরনো ঘরের মালামাল দিয়ে রাস্তার পাশে ঝুপড়ি তুলে থাকতে হচ্ছে।
আঙ্গারিয়া বাজারের পান-সুপারির দোকানি বিনয় চন্দ্র পাইক (৭০)। গত বছরের অক্টোবরে তার পৈতৃক ভিটা নদীতে বিলীন হয়েছে। বর্তমানে পরিবারের ছয় সদস্যকে নিয়ে আঙ্গারিয়া বাজারে ভাড়া বাসায় থাকছেন। এর আগেও তিনবার তার বসতঘর ও কৃষিজমি নদীগর্ভে গেছে। আর্থিক সংকটের কারণে এবারও ভাড়া বাসাতেই থাকতে হচ্ছে তাকে।
ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত সাবেক ইউপি সদস্য কবীর সিকদার বলেছেন, ২০২৪ সালের জুনে পাউবো জিও ব্যাগে বালু ভরে ভাঙন রোধের উদ্যোগ নেয়। কিন্তু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জিও ব্যাগে বালু ভরে রেখে গেলেও পরে সেগুলো নদীতীরে স্থাপন করা হয়নি। সময়মতো জিও ব্যাগ বসানো হলে এত পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হতো না।
কবীর সিকদারের হিসাব অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে পায়রা নদী-সংলগ্ন বাহেরচর গ্রামের প্রায় ৫০০ একর জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাড়ে ৩০০ থেকে ৪০০ পরিবার। যাদের সামর্থ্য আছে, তারা অন্যত্র ঘর তুলেছেন। আর সামর্থ্যহীন পরিবারগুলো উদ্বাস্তু হয়ে জীবনযাপন করছে।
তিনি জানালেন, বিউটি বেগম, জাকির হোসেন, মিলন মিয়া ও অলি সিকদারসহ প্রায় ৩০টি পরিবারের বসতবাড়িসহ কয়েক কিলোমিটার এলাকা এরই মধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। বাহেরচর বাজার ও আশপাশে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দুটি মসজিদ, একটি মাদ্রাসাসহ অসংখ্য বসতি রয়েছে। দ্রুত ভাঙন রোধ করা না গেলে এসব স্থাপনাও ঝুঁকিতে পড়বে।
পাউবো পটুয়াখালী কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দুমকী উপজেলার আঙ্গারিয়া ইউনিয়নের বাহেরচর গ্রামের পায়রা নদীর ভাঙন রোধে জরুরি সংস্কার প্রকল্প নেওয়া হয়। ২০২৪ সালের মে মাসে শহিদ-খুশি নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে ৩ কোটি ৯৭ লাখ টাকায় কার্যাদেশ দেওয়া হয়। এক বছর মেয়াদি প্রকল্পটির কাজ ২০২৫ সালের মে মাসে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কার্যাদেশ দেওয়ার পর ২৬ মাস পেরিয়ে গেলেও কাজ শেষ হয়নি।
পাউবোর পটুয়াখালী কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী এমরান হোসেন বলেছেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ না করায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কার্যাদেশ বাতিল করা হয়েছে।
নতুন করে প্রকল্পের বরাদ্দের বিষয়ে তিনি জানান, সরকারি টাকা একবার ফেরত গেলে তা আবার পাওয়া কঠিন। তবে পুনরায় বরাদ্দ এনে কাজটি করার চেষ্টা চলছে।




