সংরক্ষিত বনের পথে অরক্ষিত প্রাণী

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ভোরের আলো তখনো ছড়িয়ে পড়েনি পুরোপুরি। হবিগঞ্জের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের গাছের ডাল বেয়ে নেমে আসছিল মুখপোড়া হনুমানের দল। এক পাশের বন থেকে অন্য পাশে যেতে পার হতে হয় মাঝখানের পথ। ঠিক তখনই ছুটে আসে একটি যানবাহন। মুহূর্তেই চাপা পড়ে মারা যায় হনুমানের একটি শাবক। আহত হয় তার মা। কয়েক সেকেন্ডের এই দুর্ঘটনা যেন সাতছড়ির দীর্ঘদিনের এক নির্মম বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। প্রাণীদের জন্য সড়কটি এখন পরিণত হয়েছে মৃত্যুফাঁদে।
চুনারুঘাট উপজেলার সংরক্ষিত এই বন বিরল ও বিপন্ন বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল হিসেবে পরিচিত। কিন্তু এই বনভূমির বুক চিরে চলে যাওয়া পুরনো ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে একের পর এক প্রাণী গাড়িচাপায় মারা যাচ্ছে।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে এই সড়কে গাড়িচাপায় মারা গেছে শতাধিক বন্যপ্রাণী। যদিও প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ, অনেক প্রাণী সড়ক থেকে দূরে গিয়ে মারা যায় বা আহত হয়ে বনেই হারিয়ে যায়। ফলে সব ঘটনার তথ্য সংরক্ষণ করা সম্ভব হয় না।
ঠিক কত প্রাণী মারা গেছে, তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব নেই। তবে গাড়িচাপায় প্রাণী মারা যাচ্ছে, এটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই— বলছিলেন বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) আবুল কালাম। তবে আগের কয়েক বছরের তুলনায় সাম্প্রতিক সময়ে প্রাণীমৃত্যুর সংখ্যা কিছুটা কমেছে— দাবি করেন তিনি।
সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি করছে বিরল ও বিপন্ন প্রাণীদের মৃত্যু। সম্প্রতি মারা যাওয়া মুখপোড়া হনুমানের শাবকটি তারই একটি উদাহরণ। বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, সাতছড়িতে বর্তমানে হাতেগোনা কয়েক জোড়া মুখপোড়া হনুমান টিকে আছে। ফলে একটি শাবকের মৃত্যুও এই বিপন্ন প্রজাতির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
শুধু মুখপোড়া হনুমান নয়, সড়কটি প্রতিনিয়ত কেড়ে নিচ্ছে আরও বহু প্রাণীর জীবন। জাতীয় উদ্যান ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য মোবাশ্বির মিয়া জানালেন, শুধু গত বছরই গাড়িচাপায় মারা গেছে প্রায় ১২ ফুট লম্বা একটি কিং কোবরা, চিতা বিড়াল, শঙ্খিনী সাপ, কালনাগিনী, চশমাপরা হনুমান, মুখপোড়া হনুমান, মায়া হরিণ এবং কয়েকটি বানর। এ ছাড়া বনমোরগ, সজারু, বনরুই, মেছোবিড়াল, বন্য কুকুরসহ বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণীও নিয়মিত শিকার হচ্ছে দুর্ঘটনার। স্থানীয়দের পর্যবেক্ষণেও উঠে এসেছে একই চিত্র। তাদের ভাষ্য, সবচেয়ে বেশি মারা যায় বানর। কারণ, বনের দুই পাশেই তাদের বিচরণ। খাদ্যের সন্ধানে কিংবা দলবদ্ধভাবে চলাচলের সময় বারবার রাস্তা পার হতে গিয়ে গাড়ির নিচে পড়ে প্রাণ হারায় তারা।
সাতছড়ি সংরক্ষিত বনের ভেতর দিয়ে প্রতিদিন চলাচল করে দুই শতাধিক ট্রাক। পাশাপাশি কয়েকশ সিএনজিচালিত অটোরিকশা, বাস, ট্রাক্টর ও অন্যান্য যানবাহনও ব্যবহার করছে এই সড়ক। বনাঞ্চলের ভেতরে সর্বোচ্চ গতিসীমা ২০ কিলোমিটার নির্ধারিত থাকলেও অধিকাংশ যানবাহন মানছে না তা। ফলে প্রাণীদের রাস্তা পার হওয়ার সুযোগই থাকে না— ভাষ্য স্থানীয়দের।
বন বিভাগের তথ্য বলছে, প্রায় ৬০০ একর আয়তনের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে রয়েছে ১৯৭ প্রজাতির বন্যপ্রাণী। এর মধ্যে রয়েছে ২৪ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ১৮ প্রজাতির সরীসৃপ, ৬ প্রজাতির উভচর প্রাণী এবং প্রায় ২০০ প্রজাতির পাখি। দেশের অল্প কয়েকটি স্থানের মধ্যে সাতছড়িই মুখপোড়া হনুমান, চশমাপরা হনুমানসহ বেশ কয়েকটি বিরল প্রাণীর গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল।
সমস্যা শুধু চালকদের বেপরোয়া গতি নয়; ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতাও সমানভাবে দায়ী বলে মনে করেন পরিবেশবিদরা। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ সোসাইটির (ডব্লিউসিএস) সমন্বয়কারী সামিউল মোহসেনিনের ভাষায়, বনাঞ্চলের ভেতরের প্রায় এক কিলোমিটার সড়কে ২০ কিলোমিটার গতিসীমা নির্ধারণ করা হলেও প্রয়োজনীয় সংখ্যক সতর্কীকরণ সাইনবোর্ড নেই। অনেক চালক প্রাণী চলাচলের বিষয়টিকে গুরুত্ব দেন না। ফলে দুর্ঘটনা বাড়ছেই।
তার মতে, আরও বেশি রোড সাইন, কঠোর গতি নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত নজরদারি ছাড়া উন্নতি হবে না পরিস্থিতির। এই সংকট নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সামিউল মোহসেনিন বলেছেন, ‘জার্মানির একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাতছড়িতে সড়ক দুর্ঘটনায় বন্যপ্রাণীর মৃত্যুর হার নিয়ে গবেষণা করছে। গবেষকরা বিষয়টিকে উদ্বেগজনক হিসেবে দেখছেন।




