সংবাদ প্রকাশের জেরে দুই সাংবাদিকের হাত কেটে নেওয়ার হুমকি

অভিযুক্ত হুমায়ুন কবির
কুড়িগ্রামের চিলমারীতে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়ে সংবাদ প্রকাশের জেরে দুই সাংবাদিকের হাত কেটে ফেলার পরিকল্পনার অভিযোগ উঠেছে।
এ ঘটনায় চিলমারী উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) কার্যালয়ের এক কর্মচারীর কথোপকথনের একটি অডিও প্রকাশ হয়েছে। এতে দুই সাংবাদিকের হাত কেটে ফেলার জন্য স্থানীয় কয়েকজন যুবকের সঙ্গে চুক্তির কথা বলতে শোনা যায় ওই কর্মচারীকে।
নিরাপত্তা ও আইনি সহায়তা চেয়ে গতকাল সোমবার চিলমারী মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন হুমকির শিকার দুই সাংবাদিক।
বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন চিলমারী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নয়ন কুমার।
অভিযুক্ত কর্মচারীর নাম হুমায়ুন কবির। তিনি চিলমারী পিআইও কার্যালয়ে কার্যসহকারী পদে মাস্টাররোলে দৈনিক হাজিরাভিত্তিক কর্মচারী হিসেবে কাজ করেন। গতকাল সোমবার সকালে তিনি ঘনিষ্ঠ কয়েকজনের কাছে দুই সাংবাদিকের হাত কেটে ফেলার পরিকল্পনার কথা জানালেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ওই কথোপকথনের একটি অডিও রেকর্ডও পাওয়া গেছে।
হুমকির শিকার দুই সাংবাদিক হলেন কালবেলার চিলমারী প্রতিনিধি এস এম রাফি এবং দৈনিক ইনকিলাবের চিলমারী প্রতিনিধি ফয়সাল হক রকি।
সম্প্রতি তারা উপজেলার টিআর, কাবিখা ও কাবিটা প্রকল্পের বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ে নিজ নিজ পত্রিকায় প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। এরপর থেকেই হুমায়ুনসহ স্থানীয় কয়েকজন সুবিধাভোগী তাদের বিভিন্নভাবে চাপ দেওয়ার চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ সাংবাদিকদের।
প্রকাশিত অডিওতে হুমায়ুনকে রাফি ও রকির ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করতে শোনা যায়। সেখানে তিনি বলেছেন, ‘চেংড়া বেংড়ার আমার সাথে চুক্তি হইছে, ৭২ ঘণ্টার মধ্যে চোটাচুটি হইবে। আমিও থাকমো সাথে। ওই দুই জনের ৭২ ঘণ্টার মধ্যে হয় হাত যাইবে, অন্য কাইয়ো না চোটাইলে আমি চোটামো। আমার চাকরি যায় যাইবে। ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ওই দুজনের হাত নামামো।’
অডিওতে হুমায়ুন আরও দাবি করেন, কয়েকটি প্রকল্প নিয়ে তিনি নিজেও কাজ করেছেন। এ বিষয়ে সংবাদ প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে সাংবাদিক রাফি ও রকিকে তিনি ৩০ হাজার টাকা দিয়েছিলেন; কিন্তু এরপরও সংবাদ প্রকাশ করায় তাদের হাত কেটে ফেলার জন্য স্থানীয় কয়েকজন যুবকের সঙ্গে চুক্তি করেছেন বলে অডিওতে দাবি করেন তিনি। প্রয়োজনে নিজেই হাত কেটে দেওয়ার কথাও তাকে বলতে শোনা যায়।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে হুমায়ুন প্রথমে তা অস্বীকার করেন। পরে তিনি বলেছেন, ‘রাগের মাথায় বলে ফেলেছি। আমাকে মাফ করে দেন। যাদের সামনে বলেছি, তারা আমার সঙ্গে বেঈমানি করে এটা ছড়ায় দিছে। এখন আমাকে যা করতে বলবেন করব। যদি ওই দুজনের পা ধরতে হয়, তাও ধরব।’
অডিও প্রকাশের পর নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দুই সাংবাদিক। জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে সোমবার চিলমারী মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ করেন সাংবাদিক এস এম রাফি। অডিও রেকর্ডের একটি কপি ডিজিটাল প্রমাণ হিসেবে চিলমারী মডেল থানার অফিসিয়াল ই-মেইলে পাঠানো হয়েছে বলেও তিনি জানিয়েছেন।
রাফি বলেছেন, ‘সংবাদ প্রকাশের জেরে জীবন হুমকিতে রয়েছে। আমরা বর্তমানে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে অভিযুক্তদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।’
সংবাদ প্রকাশ না করতে টাকা দেওয়ার বিষয়ে হুমায়ুনের দাবিকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন রাফি। তার ভাষ্য, ‘এটা অমূলক অভিযোগ। তাহলে সংবাদ প্রকাশ করলাম কেন! নিজেদের দায় এড়ানোর জন্য এখন তারা আমাদের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অপবাদ দেওয়ার হীন চেষ্টা করছে। এটা পিআইও কার্যালয়ের ওই চক্রের কাজ।’
চিলমারী সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি সাওরাত হোসেন সোহেল জানিয়েছেন, অনিয়ম হলে সাংবাদিকরা তা নিয়ে প্রতিবেদন করবেন। এ কারণে সাংবাদিকদের হুমকি দেওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়। তিনি ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে তদন্ত করে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি করেছেন।
পিআইও মো. সোহেল রহমান জানিয়েছেন, বিষয়টি তিনি দেখছেন।
চিলমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান বলেছেন, ‘এভাবে কাউকে হুমকি দেওয়ার সুযোগ নেই। এটি ফৌজদারি অপরাধ। এমন ঘটনা ঘটে থাকলে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে পারেন।’
চিলমারী থানার ওসি নয়ন কুমার জানিয়েছেন, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।






