মহেশখালী
বন বিভাগের আপত্তিতে থমকে সড়ক সংস্কার, দুর্ভোগে ২০ হাজার মানুষ

ছবি: আগামীর সময়
কক্সবাজারের মহেশখালীতে বন বিভাগের আপত্তিতে থমকে গেছে কালারমারছড়া–জেএম ঘাট সড়কের উন্নয়নকাজ। দীর্ঘদিনের জরাজীর্ণ সড়কটি পাকা করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও সংরক্ষিত বনাঞ্চলের বিষয়টি সামনে এনে বন বিভাগ আপত্তি তোলায় কাজ বন্ধ রয়েছে। এতে শাপলাপুরসহ আশপাশের এলাকার প্রায় ২০ হাজার মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, একটি পুরোনো চলাচলের পথ সংস্কার করে আরসিসি সড়কে উন্নীত করার কাজকে বন বিভাগ ‘বনভূমিতে উন্নয়নকাজ’ হিসেবে দেখিয়ে বাধাগ্রস্ত করছে।
শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) জুমার নামাজের পর সড়কটির উন্নয়নকাজ দ্রুত চালুর দাবিতে জেএম ঘাট সড়কে মানববন্ধন করেছেন শাপলাপুর এলাকার নারী-পুরুষসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, কালারমারছড়া থেকে শাপলাপুর পর্যন্ত ৪ দশমিক ৬৬ কিলোমিটার সড়কটি দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় মানুষের যাতায়াতের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। বর্তমানে সড়কটির অধিকাংশ অংশের অবস্থা এতটাই নাজুক যে বর্ষাকালে যানবাহন চলাচল তো দূরের কথা, হেঁটে চলাও কঠিন হয়ে পড়ে। অথচ বহুল প্রত্যাশিত সড়কটি উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়ার পরও প্রশাসনিক জটিলতায় কাজ বন্ধ হয়ে আছে।
স্থানীয়দের দাবি, সড়কটি উন্নয়নে নতুন করে পাহাড় কাটা কিংবা গাছ নিধনের প্রয়োজন নেই। বিদ্যমান ব্রিকসলিং সড়কটিকেই আরসিসি সড়কে উন্নীত করা হবে। তাই বন বিভাগের আপত্তির প্রকৃত কারণ সরেজমিনে তদন্ত করে দ্রুত কাজ শুরুর ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দক্ষিণ চট্টগ্রাম আঞ্চলিক উন্নয়ন প্রকল্পের (SCRDP) আওতায় এলজিইডির উদ্যোগে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) অর্থায়নে প্রায় ২২ কোটি টাকা ব্যয়ে জেএম ঘাট–কালারমারছড়া সংযোগ সড়কটি পাকাকরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কাজও শুরু হয়েছিল। ইতোমধ্যে সড়কের কিছু অংশে কংক্রিট ঢালাই এবং কয়েকটি কালভার্ট নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু বন বিভাগের আপত্তির পর কাজ বন্ধ করে দেয় এলজিইডি।
বন বিভাগের দাবি, সড়কটির একটি অংশ সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভেতর দিয়ে গেছে। সেখানে অনুমোদন ছাড়া উন্নয়নকাজ পরিচালনার সুযোগ নেই। সংরক্ষিত বনভূমিতে পাকা সড়ক নির্মাণ হলে গাছপালা ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি বনভূমিতে অনুপ্রবেশ, অবৈধ দখল এবং গাছ ও বন্যপ্রাণী পাচারের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য আলমগীর মুহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ ফরিদ বন বিভাগকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানিয়ে ডিও লেটার দেন। জবাবে বন বিভাগ জানায়, সংরক্ষিত বনভূমির ভেতরে পাকা সড়ক নির্মাণের ক্ষেত্রে সরকারপ্রধানের অনুমোদন প্রয়োজন।
এদিকে পরিবেশবাদী সংগঠন বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) বিষয়টি নিয়ে বন বিভাগ, এলজিইডিসহ সরকারের নয়টি দপ্তরে চিঠি দিয়েছে। গত ২ জুলাই দেওয়া ওই চিঠিতে বলা হয়, মহেশখালীর ১২ নম্বর পাহাড় মৌজা গুরুত্বপূর্ণ জীববৈচিত্র্যসমৃদ্ধ সংরক্ষিত বনাঞ্চল। ১৯৫৪ সালে গেজেট নোটিফিকেশনের মাধ্যমে ১৮ হাজার ২৮৬ দশমিক ৪০ একর ভূমি ১০০ বছরের জন্য বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে ১৯৫৭ সালে এলাকাটিকে সংরক্ষিত বন ঘোষণা করা হয়।
বেলার তথ্যমতে, বনাঞ্চলে হরিণ, বানর, অজগরসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী ও অসংখ্য প্রজাতির পাখির আবাসস্থল রয়েছে। সম্প্রতি এলজিইডি বনাঞ্চলের ভেতরে একটি পুরোনো কালভার্ট ভাঙার কাজ শুরু করলেও এ বিষয়ে বন বিভাগের অনুমোদন নেওয়া হয়নি বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।
তবে স্থানীয়দের বক্তব্য, এটি কোনো নতুন সড়ক নয়, দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত একটি পুরোনো আঞ্চলিক পথ। পূর্ব ফকিরজুম পাড়ার ৮৩ বছর বয়সী মোহাম্মদ নবী বলেছেন, প্রায় ৭০ বছর ধরে তিনি এই পথ ব্যবহার করছেন। পর্যাপ্ত সংস্কার ও বরাদ্দের অভাবে সড়কটি এখন এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত যে স্বাভাবিক চলাচলও কঠিন। সম্প্রতি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে খারাপ রাস্তার কারণে গাড়ি না পেয়ে প্রতিবেশীরা তাকে কোলে করে হাসপাতালে নিয়ে যান।
৭০ বছর বয়সী স্থানীয় বাসিন্দা বদন আলী বললেন, প্রায় এক শ বছরের পুরোনো একটি চলাচলের পথের সংস্কারকে ‘পাহাড় কেটে নতুন রাস্তা নির্মাণ’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিনের অবহেলার পর সরকার যখন সড়কটি উন্নয়নের উদ্যোগ নিয়েছে, তখন প্রশাসনিক জটিলতায় কাজ আটকে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ দুর্ভোগে পড়েছেন।
শাপলাপুরের বাসিন্দা মো. নুরুল আলশের ভাষ্য, বর্ষাকালে সড়কটি দিয়ে চলাচল করা অত্যন্ত কষ্টকর। রোগী হাসপাতালে নেওয়া, শিক্ষার্থীদের স্কুল-কলেজে যাওয়া এবং কৃষিপণ্য বাজারে নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিদিনই ভোগান্তি পোহাতে হয়।
কালারমারছড়ার বাসিন্দা ছৈয়দুল করিম বলেন, দুই সরকারি বিভাগের মতপার্থক্যের কারণে সাধারণ মানুষকে ভুগতে হচ্ছে। সড়কটি নির্মাণ হলে নারী, শিশু, বয়স্ক ও গর্ভবতী নারীদের চলাচলে বড় সুবিধা হবে। দ্রুত সমস্যাটির সমাধান প্রয়োজন।
স্থানীয় সমাজকর্মী এএম হোবাইব সজীবের ভাষায়, কালারমারছড়া ও শাপলাপুরের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি এই সড়ক। জাইকার অর্থায়ন ও এলজিইডির উদ্যোগে নেওয়া প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।
তবে পরিবেশের বিষয়টি উপেক্ষা না করার কথাও বলছেন পরিবেশবাদীরা। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) মহেশখালী শাখার সাধারণ সম্পাদক আবু বক্কর সিদ্দীক বলেছেন, তারা উন্নয়নবিরোধী নন এবং সড়কটি বহু পুরোনো চলাচলের পথ। তবে যথাযথ পরিবেশগত মূল্যায়ন ও পরিকল্পনা ছাড়া সড়কটি পাকাকরণ করা হলে ভবিষ্যতে এর সুযোগ নিয়ে পাহাড় কাটা, নতুন বসতি ও স্থাপনা গড়ে ওঠার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এতে দীর্ঘমেয়াদে জীববৈচিত্র্য ও স্থানীয় বাস্তুসংস্থানের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মহেশখালী উন্নয়ন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ফরিদুল আলম দেওয়ান বলেন, মহেশখালীর পাহাড়গুলোর অনেক অংশ ন্যাড়া। পরিকল্পিতভাবে সড়ক নির্মাণ করা হলে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতির পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পর্যটন ও স্থানীয় অর্থনীতির বিকাশ ঘটবে। দীর্ঘদিনের যোগাযোগ সংকট নিরসনে সড়কটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
মহেশখালী থানার ওসি মো. আব্দুস সুলতান বলেন, জনস্বার্থে সড়কটি প্রয়োজন। অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে অনেক সময় পুলিশিং কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হয়। সড়কটি নির্মিত হলে কালারমারছড়া থেকে শাপলাপুরে দ্রুত যাতায়াত সম্ভব হবে।
এলজিইডি মহেশখালী উপজেলা প্রকৌশলী বনি আমিন জনি বলেছেন, এটি এলজিইডির গেজেটভুক্ত সড়ক। স্থানীয় মানুষের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সড়কটি পাকাকরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে বন বিভাগের আপত্তির কারণে কাজ বন্ধ রয়েছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম উপকূলীয় বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এম এ হাসান বলেছেন, সংরক্ষিত বনের ভেতরে মানুষের চলাচলের পুরোনো পথ থাকতে পারে, কিন্তু সেটিকে পাকা সড়কে রূপান্তরের সুযোগ আইন দেয় না। এতে বনভূমিতে অনুপ্রবেশ বাড়বে এবং গাছপালা ও বন্যপ্রাণী হুমকির মুখে পড়বে। এ বিষয়ে এলজিইডিকে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হয়েছে। কাজ বন্ধ না হলে বন আইনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সংরক্ষিত বনে কোনো উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করতে হলে সরকারপ্রধানের অনুমোদন প্রয়োজন বলেও জানান তিনি।
এরই মধ্যে বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে গত ৬ আগস্ট কালারমারছড়া–শাপলাপুর সংযোগ সড়ক নির্মাণকাজের ওপর দুই মাসের জন্য স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। বিচারপতি ফাহমিদা কাদের ও বিচারপতি মো. আসিফ হাসানের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এ আদেশ দেন।
ফলে উন্নয়ন বনাম পরিবেশ, দুই পক্ষের টানাপোড়েনে আটকে আছে গুরুত্বপূর্ণ এ সড়ক। একদিকে সংরক্ষিত বন রক্ষার প্রশ্ন, অন্যদিকে বছরের পর বছর দুর্ভোগে থাকা মানুষের যোগাযোগের দাবি। এখন সংশ্লিষ্টদের সমন্বিত উদ্যোগ ও আইনসম্মত সমাধানের দিকেই তাকিয়ে আছেন স্থানীয়রা। তাদের প্রত্যাশা, পরিবেশের সুরক্ষা নিশ্চিত করেই দ্রুত সড়কটির উন্নয়নকাজের জট খুলবে এবং দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ থেকে মুক্তি মিলবে হাজারো মানুষের।





