প্রধানমন্ত্রী আসার খবরে বালুচাপা দেওয়া হলো ২০ বছরের ময়লার ভাগাড়

ছবি: আগামীর সময়
কিশোরগঞ্জ-ভৈরব আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে প্রায় ২০ বছর ধরে জমে থাকা ময়লার ভাগাড় নিয়ে দীর্ঘদিনের জনদুর্ভোগ। দুর্গন্ধ, মশা-মাছি, পচা বর্জ্য আর বৃষ্টির পানিতে পিচ্ছিল সড়ক-সব মিলিয়ে এলাকাবাসীর ভোগান্তির যেন শেষ ছিল না। বছরের পর বছর ময়লা পড়ে থাকলেও তা অপসারণে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি।
তবে এবার প্রধানমন্ত্রীর কিশোরগঞ্জ সফর সামনে রেখে বদলে গেছে দৃশ্যপট। তড়িঘড়ি করে ময়লার স্তূপের একাংশ সরিয়ে ফেলা হচ্ছে, আর নিচে পড়ে থাকা বর্জ্যের বড় অংশ বালুচাপা দিয়ে ঢেকে দেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রীর চোখে যাতে ময়লার স্তূপ ও নাকে দুর্গন্ধ না পৌঁছায়, সে কারণেই এমন সাময়িক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
তাদের আশঙ্কা, প্রধানমন্ত্রীর সফর শেষ হলে আবারও আগের মতো ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হবে সড়কের পাশের এই বিশাল এলাকা। আগামীকাল রবিবার (১৬ আগস্ট) প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কিশোরগঞ্জ সফরকে কেন্দ্র করে গত এক সপ্তাহ ধরে সদরের খিলপাড়া এলাকায় চলছে এই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ। একইভাবে কটিয়াদীর বাসস্ট্যান্ড এলাকার ময়লার স্তূপও বালু ফেলে ঢেকে দেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার খিলপাড়া এলাকায় কিশোরগঞ্জ-ভৈরব আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে প্রায় এক কিলোমিটার এলাকা জুড়ে দীর্ঘদিন ধরে ময়লা-আবর্জনা ফেলা হচ্ছে। বছরের পর বছর ধরে জমতে জমতে ময়লার স্তূপগুলো পাহাড় বা টিলার মতো আকার নেয়। একপর্যায়ে ময়লা সড়কের একটি অংশও দখল করে নেয়। কিশোরগঞ্জ পৌরসভার বিভিন্ন বাজার, বাসাবাড়ি ও অন্যান্য স্থান থেকে প্রতিদিন ট্রাকে করে বর্জ্য এনে এখানে ফেলা হতো।
স্থানীয় মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও বিভিন্ন ক্লিনিকের বর্জ্যও নিয়মিত এখানে ফেলার অভিযোগ রয়েছে। শুধু পৌরসভা নয়, আশপাশের কটিয়াদী, পাকুন্দিয়া ও হোসেনপুর উপজেলার কিছু এলাকার বর্জ্যও এখানে এনে ফেলা হতো বলে স্থানীয়রা জানান।
উন্মুক্ত স্থানে বছরের পর বছর বর্জ্য পড়ে থাকায় সৃষ্টি হয় তীব্র দুর্গন্ধ। মশা-মাছির উপদ্রব, পরিবেশদূষণ এবং পথচারী ও যানবাহন চলাচলে তৈরি হয় চরম দুর্ভোগ। ঢাকা, ময়মনসিংহ, সিলেট ও ভৈরবসহ বিভিন্ন গন্তব্যের হাজারো যানবাহন ও মানুষ প্রতিদিন এই সড়ক দিয়ে চলাচল করেন। বৃষ্টির সময় পচা ময়লা ও জমে থাকা পানিতে সড়ক পিচ্ছিল হয়ে প্রায়ই দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হয়। দুর্গন্ধের কারণে পথচারীদের নাক চেপে চলাচল করতে হতো।
খিলপাড়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, আগের সেই বিশাল ময়লার স্তূপ আর নেই। ময়লার ওপরের অংশের একটি বড় অংশ সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। নিচে জমে থাকা পুরনো বর্জ্যের ওপর দেওয়া হচ্ছে বালুর স্তর। ফলে দূর থেকে জায়গাটিকে আগের তুলনায় অনেকটাই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন মনে হচ্ছে। যে স্থানে আগে পথচারী ও যাত্রীদের দুর্গন্ধ থেকে বাঁচতে নাক চেপে চলাচল করতে দেখা যেত, সেখানে এখন অনেকটা স্বস্তির পরিবেশ।
তবে স্থানীয়দের ভাষ্য, এটি স্থায়ী কোনো সমাধান নয়, বরং প্রধানমন্ত্রীর সফরকে সামনে রেখে দ্রুত দৃশ্যমান পরিবর্তন আনার চেষ্টা। একই চিত্র দেখা গেছে কটিয়াদীর বাসস্ট্যান্ড এলাকাতেও। সেখানকার ময়লার স্তূপের ওপরও বালু ফেলে ঢেকে দেওয়া হচ্ছে।
খিলপাড়ার স্থানীয় বাসিন্দা মাহমুদুল হাসান বলেন, কিশোরগঞ্জ-ভৈরব আঞ্চলিক মহাসড়কের এই স্থানটি দীর্ঘদিন ধরে মানুষের জন্য চরম ভোগান্তির কারণ হয়ে ছিল। এখান দিয়ে চলতে গেলে ময়লার দুর্গন্ধে নাড়িভুঁড়ি বের হয়ে যাওয়ার উপক্রম হতো। বৃষ্টির সময় দুর্ভোগ আরও বেড়ে যেত। পচা ময়লার কারণে রাস্তা পিচ্ছিল হয়ে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটত। ময়লা অপসারণের জন্য পৌর কর্তৃপক্ষের কাছে একাধিকবার লিখিত ও মৌখিক আবেদন করা হলেও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এখন প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে ঠিকই দ্রুত বালু চাপা দিয়ে ময়লা ঢেকে দেওয়া হচ্ছে। এতে প্রমাণিত হয়, কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছা থাকলে জনদুর্ভোগ কমানো সম্ভব। তবে শুনেছি, এটি অস্থায়ীভাবে করা হচ্ছে। আমাদের দাবি, এখানে স্থায়ীভাবে ময়লা ব্যবস্থাপনার ব্যবস্থা করা হোক।
অভিযোগ রয়েছে, এই ময়লার ভাগাড়ের সমস্যা নতুন নয়। তিন থেকে চার বছর আগে এখানে প্রায় ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু লোকবল সংকটসহ নানা কারণে প্রকল্পটি এখনো চালু করা সম্ভব হয়নি।
এদিকে ময়লা অপসারণের দাবিতে স্থানীয়রা দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছেন। এ নিয়ে মানববন্ধনসহ বিভিন্ন প্রতিবাদ কর্মসূচিও পালন করা হয়েছে। কিশোরগঞ্জের ময়লার ভাগাড়ের দুর্ভোগ বিভিন্ন গণমাধ্যমে একাধিক প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু এতদিনেও সমস্যাটির স্থায়ী সমাধান হয়নি।
কিশোরগঞ্জ স্থানীয় সরকার অধিদপ্তরের উপপরিচালক ও পৌরসভার দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রশাসক জেবুন নাহার শাম্মী বলেন, প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে কিশোরগঞ্জ-ভৈরব আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে ময়লা ফেলার জায়গাটিতে আপাতত অস্থায়ীভাবে বালু চাপা দিয়ে ঢেকে দেওয়া হচ্ছে। এখানে স্থায়ীভাবে ময়লা নিরসনের একটি প্রজেক্ট হাতে নেওয়া হয়েছে। কিছুদিন পর হয়তো সেটি চালু করা যাবে।







