মেলান্দহ
পরিবারের জন্য পাড়ি জমিয়েছিলেন ইরাকে, এক যুগ পর ফিরলেন লাশ হয়ে

ছবি: আগামীর সময়
ঈদে বাড়ি ফেরার কথা ছিল রমজান আলীর। দীর্ঘ এক যুগ প্রবাস জীবনের ইতি টেনে নববধূকে নিয়ে নতুন ঘরে সুখের সংসার গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। ইরাকে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাওয়ার চার মাস পর বাড়িতে ফিরলেন, তবে জীবিত নয়, কফিন বন্দি হয়ে।
বৃহস্পতিবার (২১ মে) দুপুর ১২টার দিকে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তদারকিতে রমজানের মরদেহ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছালে সেখানে হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
শেষবারের মতো এক নজর দেখতে বাড়িতে ভিড় করেন স্থানীয়রা। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
নিহত রমজান আলী (৩৫) জামালপুরের মেলান্দহ উপজেলার মাহমুদপুর ইউনিয়নের আগপয়লা ঠেঙ্গেপাড়া এলাকার রহিম বাদশার ছেলে। তিন ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন মেঝো।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, অসুস্থ বাবার সংসারের হাল ধরতেই প্রায় এক যুগ আগে জীবিকার সন্ধানে ইরাকে পাড়ি দেন রমজান। দীর্ঘ প্রবাস জীবনে কঠোর পরিশ্রম করে পরিবারের জন্য নির্মাণ করেন একটি বাড়ি। বাবা-মায়ের প্রতি ভালোবাসা থেকে বাড়িটির নাম রাখেন ‘মা-বাবা ভিলা’। মাত্র আট মাস আগে প্রবাস থেকেই পরিবারের পছন্দে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে বিয়ে করেন তিনি। স্বপ্ন ছিল, দেশে ফিরে নববধূকে নিয়ে নতুন জীবন শুরু করবেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন ভেঙে যায় গত ৩ জানুয়ারি। ইরাকে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান রমজান আলী। এরপর দীর্ঘ চার মাসেও দেশে আনা সম্ভব হয়নি তার মরদেহ। এতে অনিশ্চয়তা ও মানসিক কষ্টে দিন কাটছিল পরিবারের সদস্যদের।পরে বিষয়টি নজরে আসে জেলা গণঅধিকার পরিষদের সাবেক সহ-সভাপতি আরিফুল ইসলাম তুহিনের। তিনি প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে মরদেহ দেশে আনতে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেন।
আরিফুল ইসলাম তুহিন জানালেন, দীর্ঘদিন মরদেহ দেশে না আসায় পরিবারটি অনেক কষ্টে ছিল। পরে বিষয়টি জানতে পেরে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করি। সবার সহযোগিতায় অবশেষে মরদেহ দেশে আনা সম্ভব হয়েছে।
ছেলের মৃত্যুতে শোকে ভেঙে পড়েছেন বাবা রহিম বাদশা। অসুস্থ এই বৃদ্ধ ঠিকমতো কথাও বলতে পারছিলেন না। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বললেন, আমার ছেলেটা সংসারের জন্য বিদেশ গেছিল। আমার অসুখের পর সব দায়িত্ব ওই নিয়েছিলেন। কত কষ্ট করে টাকা পাঠাইছে, বাড়ি করছে। ঈদে বাড়ি আসব কইছিল..কিন্তু লাশ হয়ে আসব, এটা কোনোদিন ভাবি নাই। আল্লাহ আমার ছেলেডারে জান্নাত দিক।
স্থানীয়রা জানান, ছোটবেলা থেকেই রমজান আলী খুব শান্ত, ভদ্র ও পরিশ্রমী ছিলেন। পরিবারের প্রতি তার দায়িত্ববোধ ছিল অনেক বেশি। অসুস্থ বাবার সংসারের হাল ধরতেই অল্প বয়সে বিদেশে পাড়ি দিয়েছিলেন তিনি। নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের কথা না ভেবে সবসময় পরিবারের কথাই ভাবতেন।
এ নিয়ে সোলায়মান নামে এলাকার বড় ভাইয়ের ভাষ্য, পরিবারের জন্য ও অনেক কষ্ট করেছে। এত সুন্দর বাড়ি করেছে, বিয়েও করেছে। কিন্তু সেই সুখ আর ভোগ করতে পারল না। এমন মৃত্যু সত্যিই খুব কষ্টের।
পরে দুপুর ৩টা দিকে বাড়ির উঠানে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে বাড়ির পাশেই দাফন করা হয় রমজান আলীকে।




