যাদের জন্য বিশ্রামাগার জানেন না তারা

সকাল থেকেই ঠাকুরগাঁও আদালত প্রাঙ্গণে মানুষের ভিড়। কেউ এসেছেন মামলার শুনানিতে, কেউ সাক্ষ্য দিতে, আবার কেউ স্বজনের জামিনের অপেক্ষায়। দূরদূরান্ত থেকে আসা এসব মানুষের অনেককেই অপেক্ষা করতে হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। তাদের বিশ্রামের জন্য আদালত চত্বরে প্রায় ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছে ‘ন্যায়কুঞ্জ’। কিন্তু এ বিশ্রামাগারটি কোথায়, সেটিই জানেন না অনেক বিচারপ্রার্থী।
আখানগর থেকে আদালতে এসেছিলেন পঞ্চাশোর্ধ্ব আসমা বেগম। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হবে বলে বসার জায়গা খুঁজছিলেন তিনি। আদালত প্রাঙ্গণেই বিচারপ্রার্থীদের জন্য একটি বিশ্রামাগার রয়েছে জানালে তিনি বললেন, ‘এখানে ন্যায়কুঞ্জ নামে কোনো জায়গা আছে, সেটাই তো জানি না।’
শুধু আসমা বেগম নন, হরিপুর থেকে আসা বাবুল বণিক ও লোহাগাড়া থেকে আসা ইয়াকুব আলীরও একই কথা। তাদের কেউই জানেন না, আদালতে অপেক্ষার সময় একটু স্বস্তিতে বসার জন্যই নির্মাণ করা হয়েছে ন্যায়কুঞ্জ।
২০২৩ সালে ঠাকুরগাঁও জেলা ও দায়রা জজ আদালত প্রাঙ্গণে নির্মাণ করা হয় ন্যায়কুঞ্জ। উদ্দেশ্য ছিল, দূরদূরান্ত থেকে আদালতে আসা বিচারপ্রার্থীরা মামলার শুনানি বা অন্যান্য কার্যক্রমের জন্য অপেক্ষার সময় বিশ্রাম নিতে পারবেন সেখানে। কিন্তু নির্মাণের প্রায় তিন বছর পরও স্থাপনাটি অপরিচিতই রয়ে গেছে অনেকের কাছে।
সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, আদালত ভবনের পেছনে ন্যায়কুঞ্জের অবস্থান। ব্যস্ত আদালত চত্বর থেকে সহজে চোখে পড়ে না ভবনটি। এর অবস্থান নির্দেশ করে দৃশ্যমান সাইনবোর্ডও নেই। ফলে প্রথমবার আদালতে আসা মানুষের পক্ষে ন্যায়কুঞ্জ খুঁজে পাওয়া কঠিন।
ন্যায়কুঞ্জে প্রায় ৪০ জনের বসার ব্যবস্থা রয়েছে। নারী ও পুরুষের জন্য পৃথক টয়লেট, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা এবং একটি ছোট টি-স্টলও রয়েছে। তবে নিয়মিত ব্যবহার না হওয়ায় ধুলো জমেছে আসবাবপত্র ও বিভিন্ন স্থানে।
আখানগর থেকে আসা আসমা বেগম, হরিপুরের বাবুল বণিক, লোহাগাড়ার ইয়াকুব আলীর ভাষ্য, আদালতে এসে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়। আগে জানলে এখানে এসে বসতে পারতাম। জায়গাটা কোথায়, মানুষকে জানানো দরকার।’
তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, ন্যায়কুঞ্জ পুরোপুরি অব্যবহৃত নয়। অনেক বিচারপ্রার্থী সেখানে বসেন। কিন্তু ভবনটি আদালত ভবনের পেছনে হওয়ায় অনেকে এর অবস্থান সম্পর্কে জানেন না।
ঠাকুরগাঁও জেলা ও দায়রা জজ আদালতের প্রশাসনিক কর্মকর্তা প্রদীপ কুমার সরকার বলেছেন, ‘ন্যায়কুঞ্জটি আদালত ভবনের পেছনে হওয়ায় অনেক বিচারপ্রার্থী এর অবস্থান জানেন না। ভবিষ্যতে যাতে আরও বেশি মানুষ এটি ব্যবহার করতে পারেন, সে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
আদালতের প্রবেশপথে বিচারপ্রার্থীদের তথ্য দেওয়ার জন্য একটি তথ্যসেবা কেন্দ্রও রয়েছে। সেখানেও বসার ব্যবস্থা আছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
তবে বিচারপ্রার্থীদের দাবি, প্রায় ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত ন্যায়কুঞ্জটি নিয়মিত খোলা রাখা, এর অবস্থান নির্দেশ করে দৃশ্যমান সাইনবোর্ড স্থাপন এবং আদালতে আসা মানুষকে এ বিষয়ে জানানো দরকার। তাদের প্রশ্ন— যাদের বিশ্রামের জন্য ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছে, তারাই যদি সেটির অস্তিত্ব ও অবস্থান না জানেন, তাহলে সরকারি অর্থে নির্মাণের উদ্দেশ্য কতটা পূরণ হচ্ছে?
বিচারপ্রার্থীদের প্রত্যাশা, ন্যায়কুঞ্জ যেন শুধু আদালত প্রাঙ্গণের একটি ভবন হয়ে না থাকে। মামলার দীর্ঘ অপেক্ষার সময়ে ক্লান্ত মানুষের জন্য এটি যেন সত্যিকারের স্বস্তির জায়গা হয়ে ওঠে।






