মাশরুম শিল্প আগামীর টেকসই কর্মসংস্থান

মাশরুম শিল্প: আগামীর টেকসই কর্মসংস্থান
মাশরুম শিল্প বাংলাদেশের কৃষি ও অর্থনীতিতে একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় খাত। কম পুঁজি, স্বল্প জায়গা ও অল্প সময়ে (মাত্র ১৫-২০ দিন) উচ্চ পুষ্টিগুণসম্পন্ন এই ফসল উৎপাদন করা যায়, যা শিক্ষিত বেকার যুবক ও নারীদের আত্মকর্মসংস্থানের এক চমৎকার সুযোগ। চীন বিশ্বের সর্ববৃহৎ খাবার উপযোগী মাশরুম উৎপাদনকারী দেশরূপে পরিচিতি পেয়েছে। বাংলাদেশেও আধুনিক খাবার হিসেবে মাশরুমের ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটেছে। আধুনিক খাবার হিসেবে নয়, আমাদের আগামী দিনের পুষ্টি নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থানের অপার সম্ভাবনা মাশরুম। বাংলাদেশে মাশরুম চাষের ইতিহাস তুলনামূলকভাবে নতুন এবং এটি আশির দশকে জাইকার সহায়তায় শুরু হয়েছিল। বাংলাদেশে, বেশ কয়েক বছর আগেও শুধু চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের লোকেরা ছাড়া সাধারণ মানুষ মাশরুম খেতে অভ্যস্ত ছিলেন না, সেখানে প্রাকৃতিকভাবে উত্থিত মাশরুম তারা ঐতিহ্যগতভাবে বন থেকে সংগ্রহ করে খায়। সম্প্রতি মানুষ মাশরুম চাষে খুব আগ্রহী এবং সাধারণ মানুষ মাশরুম খেতে অভ্যস্ত হচ্ছেন। পাহাড়ি জনগোষ্ঠী দ্বারা চাষকৃত বিভিন্ন মাশরুমের ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে। মাশরুম উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বেসরকারি পর্যায়ে মাশরুম বীজ উৎপাদক, প্রক্রিয়াজাতকারী তৈরি করা হয়েছে।
মাশরুম চাষ টেকসই কর্মসংস্থান হিসেবে কেন এত জনপ্রিয়
- মাশরুম একটি পুষ্টিকর (উন্নতমানের আমিষ, ভিটামিন ও খনিজসমৃদ্ধ), সুস্বাদু ও ঔষধি গুণসম্পন্ন ফসল।
- মাশরুম চাষের জন্য কোনো উর্বর জমির প্রয়োজন হয় না এবং অল্প জায়গায় অধিক পরিমাণ মাশরুম উৎপাদন করা যায়।
- জমির উলম্বিক ব্যবহার ও অনাবাদি পতিত জমির ব্যবহার বৃদ্ধি করা সম্ভব।
- মাশরুম চাষের জন্য কীটনাশক, রোগনাশক এমনকি রাসায়নিক সারের প্রয়োজন হয় না বিধায় এটি একটি অর্গানিক ফসল।
- স্বল্প পুঁজিতে মাশরুম চাষ শুরু করা যায়।
- বেকার, প্রতিবন্ধীসহ নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব।
- বিশ্বব্যাপী মাশরুমের চাহিদা আছে। এমনকি বাংলাদেশেও এর চাহিদা রয়েছে।
লাভজনক ও দ্রুত উৎপাদন মাশরুম বাংলাদেশের একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় ও লাভজনক কৃষিপণ্য যা দ্রুত বর্ধনশীল, খুব দ্রুত (২-৪ সপ্তাহে) উৎপাদন করা যায় এবং এর উৎপাদন খরচ কম হলেও বাজারমূল্য বেশ ভালো, যা একে একটি লাভজনক ব্যবসা হিসেবে গড়ে তুলেছে।
- কৃষিজ, শিল্পজ ও বনজ উপজাত যেমন— খড়, আখের ছোবড়া, ভুট্টার কব ও কাঠের গুঁড়া ব্যবহার করে ঘরে বসেই এই ফসল চাষ করা সম্ভব।
- আবহাওয়া উপযোগী: বাংলাদেশের আবহাওয়া সারা বছর মাশরুম চাষের জন্য উপযোগী। বাংলাদেশের নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ু, বিশেষ করে শীতকাল, মাশরুমের (বিশেষ করে ওয়েস্টার মাশরুম) উৎপাদনের জন্য খুবই অনুকূল।
- মাশরুম ঘরে চাষ করা হয় বিধায় অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি, খরা, বন্যা ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগ মাশরুমের কোনো ক্ষতি করতে পারে না অর্থাৎ জলবায়ু ঝুঁকি নেই।
- ওয়েস্টার, মিল্কি, ঋষি, ব্ল্যাক মাশরুম, ইরিনজি, শীতাকে, বাটনসহ সারা বছর চাষযোগ্য জাত ও সহজ প্রযুক্তি রয়েছে।
বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা এবং মাশরুমের ভূমিকা
বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে একটি এবং এর ঘনত্ব ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশের ফসলি জমি মানব বসতির জন্য সংকুচিত হয়ে আসছে। বেকারত্ব আমাদের দেশের জন্য একটি উদ্বেগের বিষয়, বিশেষ করে নারী ও শিক্ষিত যুবকদের ক্ষেত্রে। এক্ষেত্রে, মাশরুম চাষ একটি সমাধান হতে পারে। কারণ মাশরুম চাষ একটি শ্রমঘন কাজ এবং এর জন্য পর্যাপ্ত জমির প্রয়োজন হয় না। স্বল্প বিনিয়োগ ও সব স্তরের জনগণের পক্ষেই মাশরুম চাষ করা সম্ভব। এটি নারী এবং শিক্ষিত যুবকদের জন্য স্বনির্ভর হওয়ার চমৎকার সুযোগ, যা দারিদ্র্যবিমোচনে সাহায্য করে। পুষ্টি চাহিদা মেটানো ও বেকারত্ব দূরীকরণে এটি একটি টেকসই উদ্যোগ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আনছে। তবে সঠিক সংরক্ষণ ও বিপণনব্যবস্থার উন্নয়ন করা গেলে এই সেক্টরে আরও বড় সম্ভাবনা তৈরি হবে। সুতরাং বাংলাদেশের কৃষকরা এটিকে একটি লাভজনক কৃষি ব্যবসা হিসেবে স্বাগত জানাতে পারেন।
মাশরুম উৎপাদন ও রপ্তানি
- দেশীয় চাহিদা: বাংলাদেশে ১৭ কোটি মানুষের জন্য বছরে প্রায় ১৫ দশমিক ৫১ লাখ টন মাশরুমের প্রয়োজন। যদি মাত্র ১০% মানুষ নিয়মিত মাশরুম খান, তখন দৈনিক প্রয়োজন প্রায় ৪৫০ টন। মাশরুমের নিয়মিত ব্যবহার স্বাস্থ্য সুরক্ষা যেমন— টিউমার প্রতিরোধ, উচ্চরক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে সেক্ষেত্রে চাহিদা আরও বৃদ্ধি পায়।
- বর্তমান উৎপাদন: দেশে বর্তমানে বছরে ৪০-৪২ হাজার টন মাশরুম উৎপাদন হয়, যার মধ্যে ওয়েস্টার মাশরুম প্রধান এবং ব্ল্যাক/কান, মিল্কি, ঋষি, ইরিনজি ও বাটনজাতের উৎপাদনও কিছু অংশে রয়েছে। মোট বাজারমূল্য প্রায় ৮০০ কোটি টাকা বা ৬৫ দশমিক ৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার
- সম্ভাবনা ও সম্প্রসারণ: দেশে মাশরুম চাষ সম্প্রসারণের মাধ্যমে স্থানীয় চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। ২০৩০-৩৩ সালের মধ্যে মাশরুম উৎপাদন সম্প্রসারণ এবং প্রক্রিয়াজাতকরণের উন্নয়নের মাধ্যমে বার্ষিক বাজার মূল্য ১১৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করার সম্ভাবনা রয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা: দেশীয় চাহিদা পূরণ, প্রক্রিয়াজাত মাশরুম উৎপাদন সম্প্রসারণ এবং রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন।
প্রয়োজনীয় উদ্যোগ
বাংলাদেশে মাশরুম চাষ সম্প্রসারণের অন্তরায়গুলোকে চিহ্নিত করে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর মাশরুমকে একটি জনপ্রিয় খাদ্য হিসেবে পরিচিত করতে এবং রপ্তানি বাজারকে কাজে লাগাতে প্রায় ৯৬ দশমিক ৬৪ কোটি টাকার একটি প্রকল্প নিয়েছে। প্রকল্পটি মাশরুম উৎপাদন ও ব্যবহার বৃদ্ধির মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন, দারিদ্র্য হ্রাসকরণ, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে সারা দেশে কৃষির ১৪টি অঞ্চলের ৯৮টি উপজেলা, ৩৩টি হর্টিকালচার সেন্টার, ১৫টি মেট্রোপলিটন থানা ও মাশরুম উন্নয়ন ইনস্টিটিউটকে নিয়ে গবেষণা ও সম্প্রসারণ কাজ করছে। এ ছাড়া কিছু সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে কাজ করছে।
- মাশরুম উৎপাদন ও চাষ সম্প্রসারণের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা এবং স্পন/মাতৃবীজ প্রাপ্তি নিশ্চিতকরণ
- উন্নত প্রজাতি ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণ
- উচ্চ দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি যেমন উদ্যোক্তা তৈরি, দলভুক্ত চাষি তৈরি ও তাদের মাধ্যমে সমবায় পুনরুজ্জীবন
- প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধা গড়ে তোলা এবং বাজারজাতকরণের ব্যবস্থাপনা
- স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে স্থানীয় চাহিদা বৃদ্ধিও
- খাদ্যাভ্যাসে মাশরুমকে অন্তর্ভুক্ত করতে প্রচার ও প্রচারণার মাধ্যমে জনগণকে মাশরুম বিষয়ে অবহিতকরণ
- রপ্তানির সম্ভাবনা উন্নয়ন করা।
প্রযুক্তি সম্প্রসারণ ও সারা দেশে মাশরুম উৎপাদন
- বাংলাদেশের মাশরুমচাষি, উদ্যোক্তা, বিপণনকারী এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবসায়ীরা নতুন উদ্ভাবিত লাগসই ও টেকসই প্রযুক্তি এবং যন্ত্রপাতি ব্যবহার করছেন।
- প্রায় ২০ হাজার মাশরুম খামার থেকে প্রতি বছর প্রায় ৪০০০০ টন মাশরুম উৎপাদিত হচ্ছে এবং মাশরুম উৎপাদনের প্রবণতা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
- আমাদের দেশে বেশ কিছু বড় মাশরুম খামার গড়ে উঠেছে যা দেশের ক্ষুদ্র, মৌসুমী এবং নতুন মাশরুমচাষিদের জন্য অনুপ্রেরণা এবং উৎপাদন উপকরণ যেমন মাতৃবীজ এবং স্পন প্যাকেট প্রাপ্তির উৎস।
- আমাদের দেশেও বেশ কিছু মাশরুম প্রক্রিয়াজাতকরণ খামার গড়ে উঠেছে। তারা মাশরুমজাত পণ্য উৎপাদন করছেন।
- উচ্চগুণগত মানসম্পন্ন মাশরুম ও মাশরুমজাত পণ্য উৎপাদন ও ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে
- প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে বিভিন্ন পর্যায়ে দক্ষ জনবল তৈরি হচ্ছে বিশেষ করে উদ্যোক্তার ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হওয়ায় উদ্যোক্তাকে কারিগরি পরামর্শ প্রদানে বিশেষ ভূমিকা রাখছেন।
- মাশরুম উন্নয়ন ইনস্টিটিউট ও ৩৩টি হর্টিকালচার সেন্টার এবং উদ্যোক্তার মাধ্যমে সারা দেশে মাশরুমের বীজ প্রাপ্তি নিশ্চিত হচ্ছে।
- পুরনো উদ্যোক্তা ও নতুন উদ্যোক্তাদের লিংকেজের মাধ্যমে, সুপারশপ, কাঁচা বাজার, ভ্রাম্যমাণ দোকান, ফলের দোকান ইত্যাদি জায়গায় মাশরুম বিক্রয় হচ্ছে।
- মৌসুমভিত্তিক মাশরুম চাষ না করে মাশরুম উৎপাদন ক্যালেন্ডার অনুসরণ ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে সারা বছর মাশরুম উৎপাদনে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে।
- প্যাকেজিংসহ বিভিন্ন সহজ প্রযুক্তি গ্রহণে পরামর্শ ও উৎপাদনে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে।
তাই মাশরুম চাষ সম্প্রসারণের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন ও দারিদ্র্য হ্রাসকরণ প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশে মাশরুম চাষ সম্প্রসারণের সমস্যা/অন্তরায় অনেকটাই উত্তরণ করা সম্ভব। সম্ভাবনাময় এ ফসলটির চাষ সম্প্রসারণের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও কৃষি মন্ত্রণালয় গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করছে। আবাদি জমির স্বল্পতা, জনসংখ্যার আধিক্য, পুষ্টির ঘাটতি পূরণ, বেকারত্ব দূরীকরণ ইত্যাদি বিষয় বিবেচনায় মাশরুম চাষ সম্প্রসারণ ও বাংলাদেশের মানুষের খাদ্যাভ্যাসে মাশরুম যুক্ত করা সময়ের দাবি।







