খোয়াইয়ের বুকে ৬০০ স্থাপনা

হবিগঞ্জ শহরের মাঝ দিয়ে একসময় প্রবল স্রোতে ছুটে চলত পুরাতন খোয়াই নদী। তবে সে জৌলুস আর নেই এখন। অনেক জায়গায় সরু খাল, কোথাও আবার জলাশয়ে পরিণত হয়েছে নদীটি। গড়ে উঠেছে বহুতল ভবন, টিনশেড ঘর ও দোকানপাট।
স্থানীয়দের ভাষ্য, মাছুলিয়া থেকে নাতিরাবাদ পর্যন্ত প্রায় চার কিলোমিটার এলাকা জুড়ে দুই তীর ও ভেতরে গড়ে উঠেছে অন্তত ৬০০ স্থাপনা। প্রশাসন একাধিকবার উচ্ছেদ অভিযান শুরু করলেও থেমে গেছে বারবার। দখল-দূষণে নদী হারাচ্ছে গতি। সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতায় নাকাল হচ্ছে শহর।
শহরের শ্যামলী এলাকায় নদীর মাঝামাঝি অংশে একটি টিনশেড বাড়ি। চারপাশে ফুল ও ফলের বাগানঘেরা বাড়িটি জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সাবেক পাবলিক প্রসিকিউটর সিরাজুল ইসলামের বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। বাড়ির মালিকানার বৈধ কাগজ কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন তারা।
সিরাজুল ইসলাম হবিগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সাবেক সহসভাপতি। দখলদারদের বড় অংশই আইনজীবী, রাজনৈতিক নেতা বলে জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।
জেলা প্রশাসক ড. জি এম সরফরাজ বলেছেন, ‘এবার আর পিছু হটার সুযোগ নেই।’ তার ভাষায়, প্রভাবশালীরা যতই শক্তিশালী হোক, নদী ছেড়ে দিতেই হবে তাদের। শহরকে জলাবদ্ধতা থেকে মুক্ত করতে নেওয়া হবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা।
মাছুলিয়া এলাকায় নদীর ওপরই ছয়তলা ভবনে নির্মাণ করা হয়েছে একটি ডায়াবেটিক হাসপাতাল। আশপাশেও রয়েছে অসংখ্য বহুতল ভবন। কোথাও নদীর প্রস্থ নেমে এসেছে মাত্র চার থেকে পাঁচ ফুটে। অনন্তপুর, সদর হাসপাতাল এলাকা, স্টাফ কোয়ার্টারসংলগ্ন অংশ, মুসলিম কোয়ার্টার, শ্যামলী, সাধুর সমাধি, উত্তর শ্যামলী কালভার্ট, হরিপুর ও নাতিরাবাদ এলাকায় নদীর ভেতর কিংবা তীরে গড়ে উঠেছে শত শত দোকান ও বসতঘর— নদীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে এমন চিত্র।
খোয়াই রিভার ওয়াটারকিপার তোফাজ্জল সোহেল মনে করেন, নদী দখল ও দূষণের কারণেই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে পানি নিষ্কাশন। ‘তিন দশক আগেও এই নদীতে চলত পণ্যবাহী নৌকা। এখন পরিণত হয়েছে সরু খালে’— আক্ষেপ করেন তিনি।
ভারতের ত্রিপুরা থেকে উৎপত্তি হওয়া খোয়াই নদী একসময় প্রবাহিত হতো হবিগঞ্জ শহরের মাঝ দিয়ে। ১৯৭৬ সালে শহর রক্ষায় নদীর একটি অংশ কেটে তৈরি করা হয় নতুন চ্যানেল। পরে দ্বিতীয় দফায় নদীর গতিপথ আরও পরিবর্তন করা হলে কামড়াপুর থেকে মাছুলিয়া পর্যন্ত অংশটি মূল প্রবাহ থেকে হয়ে পড়ে বিচ্ছিন্ন। এরপর থেকে এটি পুরাতন খোয়াই নদী নামে পরিচিতি পায়।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য বলছে, ২০২৩ সালে হবিগঞ্জ পৌরসভা নদী পুনরুদ্ধারে একটি প্রকল্প প্রস্তাব আকারে পানি উন্নয়ন বোর্ডে (পাউবো) পাঠায়। পরে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পুরাতন খোয়াই নদী পুনরুদ্ধার নামে নতুন প্রকল্প পাঠানো হয় পরিকল্পনা কমিশনে।
হবিগঞ্জ পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী সায়েদুর রহমান বললেন, ‘প্রকল্পটি অনুমোদনের সুপারিশ করা হয়েছে। অনুমোদন পেলেই দরপত্রসহ আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শেষে শুরু হবে কাজ।’






