ঘুরতে গেছিলেন পাঁচ বন্ধু ফিরলেন ৪ জন

নিহত সাইফুল— সংগৃহীত
বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে এসেছিলেন সিলেটে। হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরান (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত করেছেন, ঘুরেছেন সাদাপাথরসহ বিভাগের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে। কয়েকদিনের আনন্দভ্রমণ শেষে শুক্রবার সকালে বাড়ি ফেরার কথা ছিল পাঁচ বন্ধুর। কিন্তু সেই ফেরা আর হলো না কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরের মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামের (সোহরাব)। সিলেটের ওসমানীনগরে ভয়াবহ বাস দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান তিনি।
আজ শুক্রবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে ওসমানীনগরের কাশিকাপন এলাকায় ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে সিলেট থেকে ঢাকাগামী ইউনিক পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে বিপরীত দিক থেকে আসা বেঙ্গল পরিবহনের একটি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। ভয়াবহ এ দুর্ঘটনায় সাইফুলসহ ৯ জন নিহত হন এবং আহত হন আরও বেশ কয়েকজন যাত্রী।
স্বজন ও বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত মঙ্গলবার রাতে কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর থেকে পাঁচ বন্ধু সিলেটে বেড়াতে আসেন। তারা হলেন— কুলিয়ারচরের ছাত্রদলের সাবেক সহ-সভাপতি ও উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম (সোহরাব), পৌর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. লতিফ, থানা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ফাখরুল ইসলাম ফারুক, রানা মিয়া ও জমরেদ মিয়া।
সিলেটে এসে তারা হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরান (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত করেন। পরে সাদাপাথরসহ বিভিন্ন পর্যটনস্থল ঘুরে দেখেন। বৃহস্পতিবার রাতে আত্মীয়ের একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে দ্রুত বাড়ি ফেরার সিদ্ধান্ত নেন তারা। প্রথমে ট্রেনে ফেরার পরিকল্পনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত বাসে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
পাঁচ বন্ধুর মধ্যে রানা মিয়া ও জমরেদ মিয়া বিমানে কিশোরগঞ্জের উদ্দেশে রওনা দেন। অপর তিন বন্ধু সাইফুল ইসলাম, ফাখরুল ইসলাম ফারুক ও মো. লতিফ শাহপরান মাজার গেট এলাকা থেকে ইউনিক পরিবহনের টিকিট কেটে শুক্রবার সকালে সিলেটের হুমায়ুন চত্বর থেকে বাসে ওঠেন। কিন্তু বাড়ি ফেরার সেই যাত্রাই সাইফুলের জীবনের শেষ যাত্রা হয়ে দাঁড়ায়।
দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে যাওয়া বন্ধু মো. লতিফ বলেছেন, ‘বাসে আমরা তিন বন্ধু ছাড়াও প্রায় ৩৬ জন যাত্রী ছিলাম। বাসটি স্বাভাবিক গতিতেই চলছিল। সকাল সাড়ে ৭টার দিকে হঠাৎ বিকট শব্দ হয়। এরপর দেখি বাসটি সড়ক ছেড়ে পাশের জমিতে পড়ে গেছে। সাইফুলের কপালে গুরুতর আঘাত লাগে। ঘটনাস্থলেই সে মারা যায়। আমাদের আরেক বন্ধু ফাখরুল ইসলাম ফারুক গুরুতর আহত হয়েছেন। আমিও আহত হয়েছি।’
শুক্রবার দুপুরে শেরপুর পুলিশ ফাঁড়িতে সাইফুলের মরদেহ গ্রহণ করতে এসে দুর্ঘটনার সেই বিভীষিকাময় মুহূর্তের বর্ণনা দেন লতিফ। খবর পেয়ে নিহতের ভাই মাহাজারুল ইসলামও সেখানে পৌঁছান। আইনি প্রক্রিয়া শেষে পুলিশের পক্ষ থেকে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
নিহত মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম (সোহরাব) কুলিয়ারচরের গোবরিয়া আবদুল্লাপুর ইউনিয়নের লক্ষ্মীপুর মুন্সীবাড়ির বাসিন্দা। তিনি মৃত সামিউদ্দিনের বড় ছেলে। রাজনীতির পাশাপাশি ঠিকাদারি পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং এলাকায় একজন পরিচিত মুখ হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
যে ভ্রমণ ছিল বন্ধুদের সঙ্গে কিছু আনন্দের স্মৃতি নিয়ে বাড়ি ফেরার, সেটিই শেষ পর্যন্ত পরিণত হলো আজীবনের বেদনায়। চার বন্ধু ফিরলেও সাইফুল ফিরলেন না। তার নিথর দেহই পৌঁছাবে স্বজনদের কাছে।
সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত অন্যরা হলেন দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই ইউনিক পরিবহনের যাত্রী কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার গোবরীনা লক্ষ্মীপুর গ্রামের সাইফুল ইসলাম (৫০), ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার বারি মিয়ার ছেলে আবুল হোসেন (৪৬), কিশোরগঞ্জ জেলার ভৈরব উপজেলার চণ্ডীবের গ্রামের কালু মিয়ার মেয়ে সঙ্গীত শিল্পী পেহেলি ভৈরবী (১৯), কুমিল্লার লাকসাম থানার রফিকুল ইসলামের পুত্র আরমান হোসেন রাহিম (১৯)। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় ঢাকা বিক্রমপুরের জাহাঙ্গীর শেখের কন্যা জাইফা ইসলাম (৩) এবং সিলেট মহানগরীর সোবহানিঘাট এলাকার উত্তম রায়ের ছেলে সপ্তম রায় প্রীতম (২২)-কে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাদের মৃত ঘোষণা করেন। এছাড়া বাকি তিনজনের আঙ্গুলের ছাপ নিয়ে পরিচয় শনাক্তকরণের কাজ করছে পিবিআই।





