কুইচ্ছা ধরেই চলে আট জনের সংসার

ছবি: আগামীর সময়
ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ফোটেনি। লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলার বিস্তীর্ণ জলাভূমির ওপর ভেসে আছে হালকা কুয়াশা। হাঁটুসমান পানিতে নেমে কাঁধে বাঁশের তৈরি ফাঁদ আর হাতে একমুঠো কেঁচো নিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে যান নিতাই সরকার। এই কেঁচোগুলোই তাঁর দিনের মূলধন। কেঁচোর টোপে ধরা পড়ে কুইচ্ছা, যা স্থানীয় ভাষায় 'মেটোসাপ' নামে পরিচিত। আর সেই কুইচ্ছা বিক্রির টাকাতেই চলে তার আট সদস্যের সংসার।
সিলেটের হবিগঞ্জের বাসিন্দা নিতাই সরকার প্রায় নয় বছর আগে জীবিকার সন্ধানে রামগঞ্জ উপজেলার বালুয়া চৌমুহনী এলাকায় আসেন। জন্মভিটিতেও তিনি একই কাজ করতেন, কিন্তু সেখানে আয় ছিল অপ্রতুল। এখন বাবা-মা, স্ত্রী ও সন্তানসহ আট সদস্যের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি তিনি।
নিতাই একা নন। তার মতো আরও ২০ থেকে ২৫ জন সিলেট অঞ্চলের মানুষ রামগঞ্জের খাল, বিল ও জলাভূমি থেকে কুইচ্ছা সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। কৃষিকাজে লোকসান, কাজের সংকট এবং দারিদ্র্য তাদের এই পেশায় নিয়ে এসেছে।
কুইচ্ছা ধরা সহজ কাজ নয়। এর জন্য প্রয়োজন ধৈর্য, পরিশ্রম এবং অভিজ্ঞতা। দিনের বড় একটি অংশ কেটে যায় কেঁচো সংগ্রহে। এরপর বাঁশের তৈরি বিশেষ ফাঁদে কেঁচো গেঁথে তা পানিতে ডুবিয়ে রাখা হয়। পরদিন ভোরে ফাঁদগুলো তোলা হয়। তবে সব ফাঁদে কুইচ্ছা মেলে না। অনেক সময় শিং, কৈ কিংবা টাকি মাছ ধরা পড়ে।
সংগ্রহ করা কুইচ্ছা জীবিত অবস্থায় সংরক্ষণ করা হয়। পর্যাপ্ত পরিমাণ জমে গেলে সেগুলো ঢাকার আড়তে পাঠানো হয়। সেখানে প্রতি কেজি কুইচ্ছা ২০০ থেকে ২৫০ টাকায় বিক্রি হয়। দেশের পাশাপাশি বিদেশেও এর চাহিদা রয়েছে।
বর্ষাকালই তাদের সবচেয়ে ব্যস্ত সময়। এ সময় জলাভূমিতে কুইচ্ছার প্রাচুর্য থাকায় মাসে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় হয়। তবে বছরের বাকি সময় কুইচ্ছার পরিমাণ কমে যায়। ফলে আয়ও কমে আসে, আর সংসার চালাতে পড়তে হয় কঠিন সংকটে।
নিতাই সরকার বলেছেন, ‘বর্ষায় কিছুটা ভালো আয় হয়। কিন্তু বছরের অন্য সময় খুব কষ্টে চলতে হয়। আগের মতো এখন আর কুইচ্ছাও পাওয়া যায় না।’
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সাব্বির আহমেদ সিফাত বলেছেন, ‘কুইচ্ছা পরিবেশের জন্য অত্যন্ত উপকারী প্রাণী। এটি ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই এর প্রাকৃতিক আবাসস্থল সংরক্ষণ করা জরুরি।’
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আবুল কাশেম বলেছেন, ‘রামগঞ্জে কুইচ্ছার স্থানীয় বাজার না থাকলেও ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় এবং বিদেশে এর চাহিদা রয়েছে। কেউ কুইচ্ছা চাষে আগ্রহী হলে মৎস্য বিভাগের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহযোগিতা দেওয়া হবে।’
এক মুঠো কেঁচো, কয়েকটি বাঁশের ফাঁদ আর অদম্য পরিশ্রম। এই সামান্য উপকরণ নিয়েই প্রতিদিন নতুন আশায় জলাভূমিতে নামেন নিতাই সরকার ও তার মতো আরও অনেক মানুষ। প্রকৃতির দান কুইচ্ছাই তাদের জীবিকার ভরসা। কিন্তু জলাভূমি সংকুচিত হওয়া ও প্রাকৃতিক আবাস ধ্বংসের কারণে কুইচ্ছার সংখ্যা কমে গেলে অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে এই মানুষের জীবন-জীবিকাও। তাই জীবিকা রক্ষার পাশাপাশি কুইচ্ছার প্রাকৃতিক আবাস সংরক্ষণেও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া সময়ের দাবি।




