উঠল সুন্দরবনে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা
একদিকে আনন্দ, অন্যদিকে দস্যু আতঙ্ক

ছবি: আগামীর সময়
টানা তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে আগামীকাল (১ সেপ্টম্বর) খুলছে সুন্দরবনের দ্বার। দীর্ঘদিনের নীরবতা ভেঙে জেলে, বনজীবী ও পর্যটকদের পদচারণায় আবার মুখর হয়ে উঠবে বিশ্বে বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনের খাল-খাড়ী, নদ-নদী আর পর্যটনকেন্দ্রগুলো।
জীবিকা ফিরে পাওয়ায় জেলে ও বনজীবীদের মাঝে যেমনি দেখা দিয়েছে আনন্দ, তেমনি পর্যটন ব্যবসায়ীদের মাঝেও দেখা দিয়েছে কর্মব্যস্ততা। এতে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরবে সুন্দরবননির্ভর অর্থনীতিতেও, এমনটাই আশা করছেন মৎস্য ও পর্যটন সংশ্লিষ্টরা।
তবে আনন্দের পাশপাশি রয়েছে আতঙ্কও। বিশেষ করে পূর্ব সুন্দরবনে সম্প্রতি বনদস্যুদের হাতে জেলে অপহরণের ঘটনায় নতুন করে দেখা দিয়েছে উদ্বেগ। নিষেধাজ্ঞা ওঠার আগমুহূর্তে গত ২২ আগস্ট সাগরে বৈরী আবহাওয়ার কারণে শরণখোলা রেঞ্জের শ্যালার চর ও নারকেলবাড়িয়া এলাকায় আশ্রয় নেয় জেলেরা। এ সময় একটি ট্রলারসহ পাঁচ জেলেকে বনদস্যু বড় জাহাঙ্গীর বাহিনী অপহরণ করে নিয়ে যাওয়ায় সৃষ্টি হয় এই আতঙ্ক ও উদ্বেগ।
এদিকে সুন্দরবনে তিন মাস মাছ ও কাঁকড়া আহরণ এবং পর্যটক প্রবেশে বন্ধ থাকায় চরম আর্থিক সংকটে পড়ে সুন্দরবননির্ভর জেলে পরিবার ও পর্যটন ব্যবাসয়ীরা। জীবীকা বন্ধ থাকায় ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন অনেকেই। নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ায় সেই ঋণ পরিশোধের স্বপ্ন দেখছেন তারা।
তবে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতাও বাড়ানো হয়েছে। কোস্টগার্ডে নেতৃত্বে পরিচালনা করা হচ্ছে সুন্দরবনে ‘অপরারেশন ম্যানগ্রোভ শিল্ড’ ও ‘অপারেশন রিস্টোর পিস ইন সুন্দরবন’ নামে বিশেষ দুটি অভিযান। গত দেড় বছরে এসব অভিযানে দস্যু আটক, অস্ত্র উদ্ধার এবং জিম্মি জেলেদের উদ্ধারেরও তথ্য জানিয়েছে কোস্টগার্ড।
এদিকে বন বিভাগ জানিয়েছে, ১ সেপ্টেম্বর থেকে নির্ধারিত নিয়ম মেনে পাস-পারমিট নিয়ে জেলে-জনজীবীরা প্রবেশ করতে পারবেন সুন্দরবনে। পর্যটকরাও যাওয়ার সুযোগ পাবেন নির্ধারিত পর্যটনকেন্দ্রগুলোতেও। অনুমতিপত্র অনুযায়ী বনে অবস্থানকারী জেলেদের তালিকা সংশ্লিষ্ট বন অফিসে রাখা হবে এবং বনরক্ষীরা নিয়মিত টহলের মাধ্যমে অনুমোদিত নৌযান যাচাই করবেন। জেলেদের নিরাপত্তায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহযোগিতা করবে বন বিভাগ। এ ছাড়া পর্যকটদের নিরাপত্তা ও পর্যটন এলাকাগুলো যাতে দুষণমুক্ত থাকে সে ব্যাপারেও তদারকি করবে বনবিভাগ।
স্থানীয় জেলে জামাল হাওলাদার, মাদেল হাওলাদার, আসাদুল কবিরাজ ও জামাল ফরাজী জানালেন, সুন্দরবনই তাদের জীবিকার প্রধান অবলম্বন। তিন মাস বনে যেতে না পারায় অনেকে ধার-দেনা করে সংসার চালাতে হয়েছে। এখন বন খুললেও বনদস্যু আতঙ্ক তাদের পিছু ছাড়ছে না। নিরাপদে মাছ ধরতে না পারলে আবারও তারা ক্ষতির মুখে পড়ার আশঙ্কা করছেন। নির্বিঘ্নে মৎস্য আহরণের জন্য সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত করারও দাবি জানান তারা।
খুলনার পর্যটন ব্যবসায়ী সৌরভ এভার ইউথ ট্যুরের মালিক সোহরাব হোসেন সৌরভ বললেন, পর্যটন ব্যবসায়ীরা তাদের বিলাশবহুল লঞ্চ ও জাহাজগুলো সুসজ্জিত করে অপেক্ষায় রয়েছেন পর্যটকদের। প্রথম দিন (১ সেপ্টেম্বর) খুলনা থেকে ২২০ জন পর্যটক নিয়ে পাঁচটি জাহাজ সুন্দরবনের উদ্দেশে ছেড়ে যাবে। দীর্ঘ তিন মাস বন্ধ থাকার পর পর্যটনকেন্দ্রগুলো খুলে দেওয়ায় ইতিমধ্যে বেশ আগ্রহও দেখা গেছে পর্যটকদের মাঝে। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে অনেকেই বুকিংয়ের জন্য ট্যুর অপারেটরদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন।
ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব সুন্দরবনের (টোয়াস) যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক শাহেদী ইসলাম রকি বললেন, সুন্দরবন ভ্রমণে বরাবরই পর্যটকদের আকর্ষণ একটু বেশিই থাকে। এবারও অনেক সাড়া পাচ্ছি। দীর্ঘ তিন মাস বন্ধ থাকায় পর্যটন ব্যবসায়ীরা অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সামনে বড়ধরণের কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে বলে আশা করি।
টোয়াসে নেতা রকি আরো বলেন, পর্যটকদের আমরা যথাযথ গাইলাইন দিয়েই বনে নিয়ে যাই। সুন্দরবনের পর্যটনকেন্দ্রসহ বনের সার্বিক পরিবশে পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে প্রতিবছর আমরা নিজেরাই কাজ করি। টোয়াসের মাধ্যমে আগামী ৬ সেপ্টেম্বর ৭৫ জনের একটি দল নিয়ে সুন্দরবনে যাওয়া হবে। চালানো কবে পরিস্কার-পচ্ছিন্নতা কার্যক্রম।
বনদস্যু আতঙ্ক আছে কী না জানতে চাইলে এই পর্যটন ব্যবসায়ীরা বলেন, বনদস্যুরা পর্যটকদের ওপর আক্রমণ করবে না এমনটাও নিশ্চিত করে বলা যায় না। তবে এখন পর্যন্ত এধরণের কোনো ঘটনা ঘটেনি। বিশেষ করে তারা জেলে-বাওয়ালী ও মৌয়ালদেরই টার্গেট করে। তারপরও আমরা সতর্কতার সঙ্গেই বনে চলাচল করে থাকি।
সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, নিষেদেজ্ঞা শেষে বন খুলে দেওয়ার প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। অনুমোদিত নৌযান ও ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্ট বন অফিস থেকে চেকিংয়ের মাধ্যমে প্রবেশ করানো হবে। বনের পরিবেশ দূষণমুক্ত রাখতে জেলে, পর্যটক ও পর্যটন ব্যবসায়ীদের বিশেষ দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
ডিএফও আরো বলেন, বনদস্যুদের হাত থেকে জেলে ও পর্যটকদের নিরাপত্তায় বন বিভাগের টহল জোরদার করা হয়েছে। এ ব্যাপারে কোস্টগার্ডসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করা হবে।
মোংলা কোসটগার্ড পশ্চিম জোন সূত্র জানিয়েছে, সুন্দরবনের নিরাপত্তায় কঠোর নজরদারি থাকবে কোস্টগার্ডের। বনদস্যুদমন এবং সুন্দরবননির্ভর জেলে-বনজীবী এবং পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত টহলের পাশাপাশি পূর্বের ন্যায় বিশেষ অভিযান কার্যক্রমও অব্যাহত থাকবে।









