রাজশাহীর সড়ক
বেপরোয়া গাড়ির গতিতে মানুষের দুর্গতি
- এক বছরে ১৬৯ দুর্ঘটনায় ১৬০ প্রাণহানি
- বেপরোয়া ট্রাক ও মোটরসাইকেল
- দুর্বল ব্যবস্থাপনায় থামছে না দুর্ঘটনা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
এক বছরে ১৬৯ সড়ক দুর্ঘটনায় ১৬০ প্রাণহানি। অর্থাৎ গড়ে প্রতি দুই থেকে তিন দিনে ঘটেছে একটি প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা। রাজশাহী জেলা ও মহানগর পুলিশের এই পরিসংখ্যান শুধু কয়েকটি দুর্ঘটনার তথ্য নয়; এটি জেলার সড়কব্যবস্থার চরম অব্যবস্থাপনার প্রতিচ্ছবিও। জেলার সড়কে প্রতিদিনের যাতায়াতের সঙ্গে মিশে আছে অনিশ্চয়তা, আতঙ্ক এবং স্বজন হারানোর শঙ্কা।
পরিসংখ্যান বলছে, দুর্ঘটনার প্রায় অর্ধেকই জড়িত মোটরসাইকেল। প্রায় ৪০টি ঘটনায় সম্পৃক্ত ট্রাক ও ডাম্প ট্রাক। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতিরিক্ত গতির এ দুই বাহনই সড়ককে পরিণত করেছে মৃত্যুফাঁদে। অবশ্য, আইন অমান্য, অদক্ষ চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, দুর্বল তদারকি এবং অপরিকল্পিত সড়ক ব্যবস্থাপনাও আছে দুর্ঘটনার নেপথ্যে।
চলতি বছরের ৫ মে রাজশাহী-নাটোর মহাসড়কের পুঠিয়া উপজেলার বিড়ালদহ এলাকায় একটি ডাম্প ট্রাকের ধাক্কায় প্রাণ হারান এক দোকানি। দুর্ঘটনার পরপরই বিক্ষুব্ধ মানুষ দুটি ডাম্প ট্রাকে আগুন ধরিয়ে দেয়। দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকে মহাসড়কে যান চলাচল। স্থানীয়দের অভিযোগ, ওই সড়কে দীর্ঘদিন ধরেই ডাম্প ট্রাকগুলো অতিরিক্ত গতিতে এবং নিয়ম ভেঙে চলাচল করছে। বারবার অভিযোগ করা হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
কিন্তু এ ঘটনাই বছরের সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল না। চলতি বছরের প্রথম দিনই রাজশাহী-নাটোর মহাসড়কের ঝলমলিয়া বাজারে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি বালুবাহী ট্রাক ঢুকে পড়ে বাজারের ভেতরে। মুহূর্তেই প্রাণ হারান চারজন। আহত হন আরও কয়েকজন। নতুন বছরের প্রথম দিনই এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনা রাজশাহীর মানুষকে নাড়িয়ে দেয়। এর মাত্র কয়েক সপ্তাহ পর ২৬ জানুয়ারি বেলপুকুর এলাকায় বাস ও অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত হন তিনজন।
পরিবহন সংশ্লিষ্টরা জানান, অনেক ডাম্প ট্রাক ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি বালু বা মাটি বহন করে। অতিরিক্ত ওজনের কারণে গাড়ির ভারসাম্য নষ্ট হয়। ব্রেক নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ে। আবার অধিকাংশ ট্রাকে বহন করা বালু বা মাটি ঢেকে রাখার জন্য কোনো সুরক্ষা কাভার ব্যবহার করা হয় না। ফলে চলন্ত অবস্থায় ধুলোবালি উড়ে আশপাশের যানবাহনের চালকদের দৃষ্টিসীমা কমে যায়। বিশেষ করে মোটরসাইকেল চালকরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়েন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ আরও গুরুতর। রাজশাহী শহরের বাসিন্দা ওয়ালিউর রহমান বাবু নামে একজনের ভাষ্য, অনেক ডাম্প ট্রাকচালক ওভারটেকিংয়ের সময় কোনো নিয়ম মানেন না। দিনের পাশাপাশি রাতেও বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালান। এতে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হয়।
অন্যদিকে পরিবহন মালিক ও শ্রমিক নেতারা বলছেন, দুর্ঘটনার জন্য শুধু ডাম্প ট্রাককে দায়ী করা ঠিক নয়। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক এবং রাজশাহী ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতির সভাপতি আলামিন সরকার টিটুর মতে, মহাসড়কে ইজিবাইক, অটোরিকশা ও ভটভটির জন্য পৃথক লেন না থাকাই বড় সমস্যা। এসব চালকের অনেকেরই পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ নেই। একই সঙ্গে মহাসড়কের পাশে অবৈধ স্থাপনা ও হাটবাজার গড়ে ওঠায় সড়ক সংকুচিত হয়ে পড়েছে।
তার পরামর্শ, মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করা গেলে এবং ধীরগতির যানবাহনের জন্য পৃথক লেন নির্মাণ করলে দুর্ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা সংগঠন ‘নিরাপদ সড়ক চাই’র রাজশাহী জেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. আমানুল্লাহ বিন আখতার আবিদ বলছেন, দুর্ঘটনার পেছনে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও বড় কারণ। তবে সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে তিনি দেখছেন সচেতনতার অভাব। তার মতে, রাজশাহীর সড়কগুলো ঘণ্টায় ৪০ থেকে ৫০ কিলোমিটার গতির বেশি সহ্য করার মতো নয়। এর বেশি গতিতে চললে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
পুলিশও একই ধরনের পর্যবেক্ষণের কথা বলছে। রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. নূর আলম সিদ্দিকী বললেন, অনেক চালক এখনো বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া যানবাহন চালাচ্ছেন। ট্রাফিক আইন সম্পর্কে অজ্ঞতা এবং অসচেতনতার কারণেও দুর্ঘটনা বাড়ছে।
রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. মাহফুজুর রহমান রিটন জানালেন, বর্তমানে যেসব সড়ক এক লেনের, সেগুলো পর্যায়ক্রমে চার ও ছয় লেনে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। ট্রাফিক বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে নগরীর ট্রাফিক ব্যবস্থার আধুনিকায়নেও কাজ চলছে।
বর্তমানে রাজশাহীতে রয়েছে ৮৭ কিলোমিটার জাতীয় মহাসড়ক, ৪৪ কিলোমিটার আঞ্চলিক মহাসড়ক এবং ২৮৮ কিলোমিটার জেলা সড়ক। কিন্তু সড়কের দৈর্ঘ্য যতটা বেড়েছে, তার চেয়ে অনেক দ্রুত বেড়েছে যানবাহনের সংখ্যা। সেই চাপ সামাল দেওয়ার মতো নিরাপদ অবকাঠামো, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এখনো গড়ে ওঠেনি। ফলে প্রতিনিয়ত বাড়ছে দুর্ঘটনা।




