ব্যবসায়ীকে নির্যাতন : বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় ছিল গ্রেপ্তার ২ ব্যক্তি
- অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ আজিজের বিরুদ্ধে
- ঘটনার সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পৃকতা নেই, দাবি লিটুর স্ত্রীর
- বিএনপির দলীয় প্রোগ্রামে গ্রেপ্তারকৃতদের সরব উপস্থিতি ছিল
- বিনিয়োগ করে অর্থ পায়নি অগ্রণী হাউজিং’র অংশীদাররা

বরিশালে বিএনপির মিছিলে নেতৃত্বে আবুল কালাম ও লিটু- বরিশাল অফিস
বরিশালে পাওনা টাকা চাওয়াকে কেন্দ্র করে এক ডেভলপার ব্যবসায়ীকে নির্যাতনের ঘটনায় গ্রেপ্তার দুই ব্যক্তি বিএনপির রাজনীতিতে জড়িত। একাধিক সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে এ তথ্য। বিএনপির নানা কর্মসূচিতে তাদের সরব উপস্থিতির একাধিক স্থিরচিত্র এসেছে এই প্রতিবেদকের হাতে।
বরিশাল নগরীর অগ্রণী হাউজিং কোম্পানি লিমিটেডের অফিসে ঢুকে প্রতিষ্ঠানের এমডি আব্দুল আজিজ হাওলাদারকে মারধর করে ‘অণ্ডকোষ’ চেপে ধরে চেক ও নন জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেয় নগরীতে কথিত যুবদল নেতা হিসেবে পরিচিত মোস্তাফিজুর রহমান লিটু ও বিএনপি নেতা আবুল কালাম আজাদ এবং সহযোগিরা। ঘটনার একটি সিসি টিভি ফুটেজ রবিবার সোশ্যালে ভাইরাল হয়। ঘটনাটি ২৭ জুনের হলেও মামলা দায়ের করা হয় গতকাল রবিবার। এই ঘটনায় লিটু ও আজাদকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
তবে সামাজিক মাধ্যমে অভিযুক্তদের যুবদল নেতা উল্লেখ করে প্রচার করায় সংবাদ সম্মেলন করে রবিবারই প্রতিবাদ জানায় মহানগর ও জেলা যুবদল। তাদের দাবি অভিযুক্তরা দলের কেউ নয়। প্রতিবেদকের হাতে আসা একাধিক ছবি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বিএনপির একাধিক দলীয় প্রোগ্রামে মোস্তাফিজুর রহমান লিটুর সরব উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। বিশেষ করে বরিশাল সদর আসনের সংসদ সদস্য মজিবর রহমান সরওয়ারের দলীয় অনুষ্ঠানগুলোতে উপস্থিত থাকতেন তিনি।
বরিশাল সিটি প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরিণের সঙ্গেও পাওয়া গেছে তার ছবি। মোস্তাফিজুর রহমান লিটু বরিশাল মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সভাপতি মাহাবুবুর রহমান পিন্টুর ছোট ভাই। তাছাড়া তিনি ৯ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সদস্য ও বিএনপির সৌদি আরব শাখার সাবেক সম্পাদক বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে গ্রেপ্তার হওয়া আবুল কালাম আজাদেরও মিলেছে দলীয় পরিচয়। তিনি শহীদ জিয়া স্মৃতি সংসদ বরিশাল মহানগরের দপ্তর বিষয়ক সম্পাদক, জিয়া মঞ্চ বরিশাল সদর উপজেলার সহ সভাপতি, ১৩ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সিনিয়র সহ সভাপতি ও জেলা শ্রমিক দলের সাবেক সদস্য ছিলেন। বিএনপির দলীয় প্রোগ্রামে তার ছবি দেখা গেছে একাধিকবার। এ ছাড়া তার সঙ্গে সংসদ সদস্য মজিবর রহমান সরওয়ার, সিটি প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরিণ, প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর, বরিশাল মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব জিয়াউদ্দিন সিকদার, জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি এবায়দুল হক চাঁন ও উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি মেজবাহ উদ্দিন ফরহাদসহ একাধিক নেতার সঙ্গে ছবি পাওয়া গেছে।
এদিকে, মোস্তাফিজুর রহমান লিটু ও আবুল কালাম আজাদ রবিবার বিকালে গ্রেপ্তারের আগে জানিয়েছেন, তারা বিএনপির মিছিল মিটিং করেন এবং দলীয় কর্মকাণ্ডে তারা জড়িত। তাছাড়া ঘটনাটির জন্য তখন দুঃখ প্রকাশও করেন তারা। তাছাড়া আজিজের কাছে সকল অংশীদার টাকা পায় এবং আজিজ তা আত্মসাৎ করেছে বলে অভিযোগ করেন লিটু। ঘটনার সঙ্গে রাজনৈতিক কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
কেন্দ্রীয় যুবদলের সহ সাংগঠনিক সম্পাদক ও জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক এইচএম তসলিম উদ্দিন এমনটা অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেন, অভিযুক্তরা কেউ যুবদল বা বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। এটা আমরা নিশ্চিত করে বলতে পারি। একটি চক্র দলের নাম খারাপ করার জন্য সামাজিক মাধ্যমে এমনটা ছড়াচ্ছে। আমরা সংবাদ সম্মেলন করে বিষয়টি পরিষ্কার করেছি। নেতাদের কাছে অনেক ধরণের লোকই যায়, ছবি থাকতেই পারে। তার মানে এই না যে দলের অংশ এসব লোকজন। আমরা তো অভিযুক্তদের ছবি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গেও দেখেছি।
কেন্দ্রীয় বিএনপির সহ সাংগঠনিক সম্পাদক ও বরিশাল জেলা পরিষদ প্রশাসক আকন কুদ্দুসুর রহমানও একই দাবি করেছেন। তিনি বললেন, লিটু বা অভিযুক্তরা আমাদের দলের কেউ না।
অগ্রণী হাউজিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আব্দুল আজিজকে ঘিরে আলোচিত ঘটনাকে রাজনৈতিক বা চাঁদাবাজির রূপ দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে দাবি করেছেন প্রধান অভিযুক্ত লিটুর স্ত্রী মৌসুমি আক্তার লুবনা। তার ভাষ্য, এটি কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি বা চাঁদাবাজির ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক পাওনা আদায়কে কেন্দ্র করেই ওই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। রবিবার সন্ধ্যায় বরিশাল প্রেসক্লাবে সম্মেলনে তিনি এসব দাবি করেন।
সংবাদ সম্মেলনে লিটুর স্বজন, গ্রেপ্তার আবুল কালাম আজাদের স্ত্রী এবং অগ্রণী হাউজিংয়ের পরিচালক মাহাবুবুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।
লিখিত বক্তব্যে লুবনা বলেছেন, মোস্তাফিজুর রহমান লিটু ২০ বছর বিদেশে ছিলেন। তিনি দীর্ঘদিন অগ্রণী হাউজিংয়ের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রতিষ্ঠানটিতে ২৯ লাখ ৭০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন তিনি। কিন্তু লভ্যাংশ তো দূরের কথা, মূলধনের বিপরীতে মাত্র ১২ লাখ টাকা ফেরত পেয়েছেন। বাকি অর্থ এবং লাভের হিসাব বারবার চাইলেও তা দেওয়া হয়নি।
তার দাবি, প্রায় ১৭ লাখ ৭০ হাজার টাকার বেশি পাওনা আদায়ের জন্যই লিটু এমডির সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। পাওনা বুঝে না পেয়ে ক্ষোভের থেকে এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জন্ম হয়। তাই ঘটনাটিকে রাজনৈতিক বা চাঁদাবাজির ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা বিভ্রান্তিকর। গ্রেপ্তার আবুল কালাম আজাদও অগ্রণী হাউজিংয়ের একজন পরিচালক। তিনিও ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল আজিজের মাধ্যমে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
অগ্রণী হাউজিংয়ের পরিচালক মাহাবুবুর রহমানও সংবাদ সম্মেলনে একই ধরনের অভিযোগ তুলে ধরেন। তিনি বললেন, ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠানটিতে ২৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন। কিন্তু এক যুগ পেরিয়ে গেলেও মূলধন কিংবা কোনো লভ্যাংশ ফেরত পাননি। আরও একাধিক বিনিয়োগকারী একইভাবে অর্থ হারিয়েছেন। এমনকি প্রতিষ্ঠানের এমডির বড় ভাইও প্রতারণার শিকার হয়েছেন। এ বিষয়ে আদালতে মামলাও করেছেন। আমরা কখনো জোর করে কিছু আদায় করতে চাইনি। আইনগত ও স্বাভাবিক উপায়ে আমাদের পাওনা ফেরত চেয়েছি। কিন্তু বছরের পর বছর ঘুরেও কোনো সমাধান পাইনি।
অভিযোগের বিষয়ে অগ্রণী হাউজিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল আজিজ বলেছেন, লিটু একসময় আমাদের আবাসন প্রকল্পের অংশীদার ছিলো। তার লভ্যাংশ হিসেব করে সম পরিমাণ জমি তাকে হস্তান্তরের মাধ্যমে নিস্পত্তি করা হয়। এরপরও আমার কাছে এক কোটি টাকা দাবি করে আসছিলো লিটু। ২৭ জুন আমাকে মারধর করে ৭০ লাখ টাকার একটি চেক, একটি সাদা চেক এবং সাদা দুইটি স্ট্যাম্পে আমার স্বাক্ষর নেওয়া হয়। তবে ব্যাংকে অভিযোগ দিয়ে রাখায় তারা টাকা তুলতে পারেনি।
সংবাদ সম্মেলনে লিটুর স্ত্রীর দেওয়া বক্তব্য মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে অভিহিত করেছেন আজিজ।







