টুংটাং টুংটাং শব্দে দা, বঁটি, চাপাতিতে আগুন

কোরবানির ঈদ সামনে এলেই বদলে যায় জেলার কামারপল্লীর চিত্র। টুংটাং শব্দে মুখর হয়ে ওঠে আগুন আর লোহার কারখানা। রাত-দিন আগুনে পুড়িয়ে, হাতুড়ির আঘাতে তৈরি হচ্ছে দা, বঁটি, চাপাতি ও ছুরি। বছরের অন্য সময় কাজ কম থাকলেও ঈদ ও ধান কাটার মৌসুম ঘিরে এখন সবচেয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন কামাররা।
সরেজমিনে সদর উপজেলার ধ্যাইনা ইউনিয়ন, করটিয়া বাজার, কাকুয়া ইউনিয়নের অমরপুর, চিলাবাড়ীসহ বিভিন্ন এলাকায় দেখা যায়, কামাররা বিরামহীনভাবে লোহা গরম করে পিটিয়ে তৈরি করছেন কোরবানির সরঞ্জাম। কেউ দা বানাচ্ছেন, কেউ বঁটি, আবার কেউ ছুরি ও চাপাতি তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
কাকুয়ার অমরপুর গ্রামের কামার সামান তুলে ধরেন, বাপ-দাদার পুরোনো ঐতিহ্য ধরে রাখতেই এখনও এই পেশায় টিকে আছেন। সারা বছর তেমন কাজ না থাকলেও কোরবানির ঈদ ও ধান কাটার মৌসুমে কর্মব্যস্ততা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। তবে কয়লার দাম বাড়ায় সরঞ্জামের দামও কিছুটা বাড়াতে হয়েছে। দা, বঁটি, ছুরি ও চাপাতির আকারভেদে দাম নির্ধারণ করা হচ্ছে।
চিলাবাড়ী এলাকার কামার হাসান উল্লেখ করেন, লোহা ও কয়লার দাম বাড়ায় উৎপাদন খরচ অনেক বেড়েছে। ফলে কঠোর পরিশ্রম করেও কাঙ্ক্ষিত লাভ হচ্ছে না।
একই এলাকার প্রবীণ কামার ইদ্রিস স্মৃতিচারণ করে জানান, একসময় পশ্চিম টাঙ্গাইলের চরাঞ্চলে তাদের বংশের কামারশিল্প ছিল খুবই জমজমাট। পরে যমুনা নদীর ভাঙনে অনেক পরিবার ছড়িয়ে পড়ে। নতুন প্রজন্ম অন্য পেশায় চলে যাওয়ায় ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে বসেছে এই ঐতিহ্যবাহী পেশা।
তার ভাষ্য, ছোটবেলা থেকেই বাবার সঙ্গে কামারের কাজে যুক্ত হন তিনি। প্রায় ৩৫ বছর ধরে এই পেশায় আছেন। ছেলেদের অন্য পেশায় পাঠিয়েছেন। হয়তো আরও কয়েক বছর কাজ করবেন, তারপর বাপ-দাদার এই পেশা আর ধরে রাখার কেউ থাকবে না।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ঈদের সময় ছাড়া গ্রামের হাটবাজারে টুকটাক কাজ করেই জীবিকা চালাতে হয়। তবে কোরবানির মৌসুমে কাজের চাপ এতটাই বেড়ে যায় যে, সরঞ্জাম নিতে হলে চার থেকে পাঁচ দিন আগেই অর্ডার দিতে হচ্ছে।
কাকুয়ার পল্লি চিকিৎসক আব্দুর রশিদ মন্তব্য করেন, কোরবানির সময় দা, বঁটি ও ছুরির চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় দাম কিছুটা বাড়লেও এ নিয়ে ক্রেতাদের তেমন অভিযোগ নেই।
যুগনীর সোহেল তুলে ধরেন, পশু জবাই ও মাংস প্রক্রিয়াজাত করতে এসব সরঞ্জাম অপরিহার্য। তাই প্রয়োজনের তাগিদেই মানুষ বেশি দাম দিয়ে কিনছেন।
ক্রেতা সাইফুল ইসলামের মতে, বাইরে থেকে কাজটি সহজ মনে হলেও বাস্তবে আগুনে পুড়ে লোহা পেটানোর কাজ অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। সেই তুলনায় কামারদের পারিশ্রমিক আরও বেশি হওয়া উচিত।
কামার আনোয়ার জানান, পরিশ্রমের তুলনায় আয় খুব কম। তবু পূর্বপুরুষের ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতেই এখনও এই পেশায় আছেন।
ইমাম সমিতির সভাপতি মাওলানা আবুল হাশেম মনে করেন, সরকারি সহায়তা ও পৃষ্ঠপোষকতা পেলে দেশের ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প আরও সমৃদ্ধ হতে পারে। তার ভাষ্য, ঈদ এলেই মানুষ কামারদের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন, অথচ বছরের বাকি সময় এই পেশার মানুষগুলো অনেকটাই অবহেলিত থাকেন।
কাকুয়া ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জয়নাল উল্লেখ করেন, একসময় উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে কামারপল্লী ছিল সরগরম। এখন হাতে গোনা কয়েকটি পরিবার এই পেশা ধরে রেখেছে।
অ্যাডভোকেট আজিমুদ্দিন বিপ্লব জানান, সদর উপজেলার হুগড়া ইউনিয়নের চিনাখালী, কাকুয়া ইউনিয়নের অমরপুর, বাসাখানপুর, বিন্যাফৈর, চিলাবাড়ী, অয়নাপুর, মগড়া, শহরের পার্ক বাজার ও ছয়আনী বাজার এলাকায় একসময় কামারশিল্পের ব্যাপক প্রসার ছিল।
মো. ওয়াসিম সরকার জানিয়েছেন, যে কোনো শিল্প উদ্যোক্তা সহযোগিতা চাইলে বিসিক প্রশিক্ষণ ও সহজ শর্তে ঋণসহ প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে প্রস্তুত রয়েছে। তার মতে, কামারশিল্পের কারিগররা এগিয়ে এলে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে আরও টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে।





