‘মানব পাচার রুখতে মূল হোতাদের ধরতে হবে’

ছবি: আগামীর সময়
কক্সবাজারের টেকনাফ-উখিয়া উপকূল দিয়ে সমুদ্রপথে অবৈধ মানব পাচার উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। সংঘবদ্ধ এই অপরাধ চক্রের মূল হোতাদের আইনের আওতায় আনা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে স্থানীয় সাংবাদিকদের আরও কার্যকর ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন বক্তারা।
একই সঙ্গে মানব পাচার প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত অভিযান ও গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
আজ রবিবার টেকনাফের সেন্ট্রাল রিসোর্টের সম্মেলনকক্ষে ‘মানব পাচার, অভিবাসী চোরাচালান ও ঝুঁকিপূর্ণ অনিয়মিত অভিবাসন বিষয়ে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা’ শীর্ষক কর্মশালায় এসব বিষয় উঠে আসে। এতে টেকনাফ ও উখিয়ার ৪২ জন সাংবাদিক অংশ নিয়েছেন।
কর্মশালায় অভিবাসনের বর্তমান প্রবণতা, মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালানের পরিবর্তিত চিত্র তুলে ধরেন ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল ইসলাম হাসান।
নিজের দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেছেন, আমরা যদি মানব পাচার কিংবা মাদকের মতো সংঘবদ্ধ অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারি, একদিন আপনার-আমার সন্তানরাও এর শিকার হবে। তখন হয়তো এই এলাকাই ছেড়ে যেতে হবে। পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হওয়ার আগেই সাংবাদিকদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
তার ভাষ্য, দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা শুধু তথ্য প্রকাশেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি মানুষকে সচেতন করে, ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত থেকে বিরত রাখে এবং নিরাপদ অভিবাসনের বার্তা ছড়িয়ে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
কর্মশালায় মানব পাচারের তদন্ত, অপরাধ চক্রের কার্যক্রম এবং এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে আলোচনা করেন পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার মোমেনা আক্তার।
তিনি বলেছেন, মানব পাচার থেকে রাষ্ট্র লাভবান হয় না। অনেকে মনে করেন বিদেশে মানুষ গেলে দেশে অর্থ আসে। বাস্তবে পাচারের মাধ্যমে বৈধ রেমিট্যান্স কমে যায়, অর্থ বিদেশেই থেকে যায়। বরং পাচারের অর্থে অপরাধী চক্র আরও শক্তিশালী হয় এবং সেই অর্থ মাদকসহ নানা অপরাধে ব্যবহৃত হয়। এটাই দেশের সবচেয়ে বড় ক্ষতি।
তিনি আরও বলেছেন, মানব পাচার প্রতিরোধ শুধু পুলিশের একার দায়িত্ব নয়। এটি সবার দায়িত্ব। সাংবাদিকদের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন সাংবাদিকও যদি সচেতন হন, তাহলে হয়তো একজন মানুষের জীবন বাঁচানো সম্ভব।
প্রথম আলোর কক্সবাজার প্রতিনিধি আব্দুল কুদ্দুস রানা তার তিন দশকের সাংবাদিকতা জীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেছেন, আমরা সেই ঘাটের কাছেই দাঁড়িয়ে আছি, যেখান থেকে সমুদ্রপথে মানব পাচার হচ্ছে। অথচ বিদেশি গণমাধ্যমে ট্রলারডুবির খবর আগে প্রকাশিত হয়। ভয় পেলে চলবে না। মানব পাচারের বিরুদ্ধে সাংবাদিকদের আরও সাহসী ভূমিকা রাখতে হবে।
কর্মশালায় বাংলাদেশ ন্যাশনাল উইমেন লইয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএনডব্লিউএলএ) কক্সবাজারের কো-অর্ডিনেটর (লিগ্যাল সার্ভিস) বিশ্বজিৎ ভৌমিক মানব পাচারসংক্রান্ত মামলার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।
এ সময় মানব পাচারের শিকার হয়ে দেশে ফিরে আসা টেকনাফের বাসিন্দা মোহাম্মদ সাবের নিজের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার বর্ণনা দেন।
কর্মশালায় মানব পাচার, অভিবাসী চোরাচালান ও অনিয়মিত অভিবাসনের পার্থক্য, বঙ্গোপসাগর ও আন্দামান সাগর হয়ে পরিচালিত ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথ, স্থানীয় বাস্তবতা, নৈতিক সাংবাদিকতা, ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক প্রতিবেদন এবং অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়। পরে অংশগ্রহণকারীরা মুক্ত আলোচনায় মতামত তুলে ধরেন।
একই দিন বিকালে টেকনাফে ‘সমুদ্রপথে মানব পাচার প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক পৃথক কর্মশালার আয়োজন করা হয়।
সেখানে পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার মোমেনা আক্তার বলেছেন, মানব পাচার ও মাদকের মতো সংঘবদ্ধ অপরাধ বন্ধ করতে হলে মাঠের কর্মীদের নয়, মূল হোতাদের আইনের আওতায় আনতে হবে।
কর্মশালায় কক্সবাজারের উখিয়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রকিবুল হাসান, র্যাব-১৫-এর সহকারী পুলিশ সুপার সোহেল রানা বক্তব্য দেন।
উদ্বোধনী বক্তব্যে টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম টেকনাফকে মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালানের একটি ‘রেড জোন’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেছেন, এ অঞ্চলে সংঘবদ্ধ অপরাধচক্র মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগ আরও জোরদার করতে হবে।
আলোচনায় পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, এপিবিএন, আনসার ও ভিডিপিসহ বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তারা সমুদ্রপথে মানব পাচার প্রতিরোধে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান, আন্তঃসংস্থার সমন্বয়, ভুক্তভোগী শনাক্তকরণ এবং পাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর আইন প্রয়োগের বিভিন্ন দিক নিয়ে মতবিনিময় করেন।




