রেলওয়ে ময়মনসিংহ অঞ্চল
রেলগাড়িটা মাইপা চলে না ঘড়ির কাঁটা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
রেলপথকে নিরাপদ, স্বস্তিদায়ক ও সাশ্রয়ী যাতায়াতের মাধ্যম হিসেবে বেছে নেন ময়মনসিংহ অঞ্চলের মানুষ। বিশেষ করে ঢাকা, জামালপুর, নেত্রকোনা ও চট্টগ্রামগামী যাত্রীদের বড় একটি অংশের নির্ভরতা রেলের ওপর। কিন্তু সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সেই নির্ভরতায় জায়গা করে নিয়েছে অনিশ্চয়তা। কোথাও ভেঙে যাচ্ছে রেললাইন, কোথাও লাইনচ্যুত হচ্ছে ট্রেনের বগি, কোথাও মাঝপথে বিকল হয়ে পড়ছে ইঞ্জিন। এক ট্রেনের ইঞ্জিন খুলে আরেক ট্রেনে জুড়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে নিয়মিত। ফলে সময়সূচি ভেঙে পড়ছে, বাড়ছে যাত্রীদের দুর্ভোগ।
এই দুর্ভোগ যে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, তা সাম্প্রতিক কয়েকটি বড় দুর্ঘটনার দিকে তাকালেই স্পষ্ট হয়। রেলওয়ে সূত্র বলছে, গত ১৬ জুলাই রাত সাড়ে ৯টার দিকে নগরীর নতুন বাজার রেল ক্রসিংয়ে আন্তঃনগর বিজয় এক্সপ্রেসের বগি লাইনচ্যুত হয়। এ সময় ময়মনসিংহ-জামালপুর রেলপথে প্রায় ৩ ঘণ্টা ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিল। এর আগে গত ১০ জুলাই সকালে গফরগাঁও উপজেলার মশাখালী গ্রামের ফকিরবাড়ী এলাকায় ঢাকা-ময়মনসিংহ রেলপথের একটি অংশ ভেঙে যায়। স্থানীয় বাসিন্দারা বিষয়টি দেখতে পেয়ে সংকেত দিয়ে ময়মনসিংহগামী দেওয়ানগঞ্জ কমিউটার ট্রেন থামান। পরে রেল বিভাগের কর্মীরা এসে পাট ও খড় ব্যবহার করে অস্থায়ীভাবে ভাঙা অংশ জোড়াতালি দেন। প্রায় ৪০ মিনিট বন্ধ থাকার পর স্বাভাবিক হয় ট্রেন চলাচল।
শুধু ভাঙা রেললাইন নয়, লাইনচ্যুতির ঘটনাও বেড়েছে। গত ২৪ জুলাই গৌরীপুর রেল জংশনের ইনার সিগন্যাল এলাকায় আন্তঃনগর বিজয় এক্সপ্রেসের তিনটি কোচ লাইনচ্যুত হয়। এতে গৌরীপুর-ভৈরব রেলপথে প্রায় ১৭ ঘণ্টা বন্ধ ছিল ট্রেন চলাচল। উদ্ধারকাজ শেষ করে পরদিন বিকালে ক্ষতিগ্রস্ত লাইন মেরামতের পর স্বাভাবিক হয় চলাচল। দীর্ঘ সময় ট্রেন বন্ধ থাকায় দুর্ভোগ পোহাতে হয় শত শত যাত্রীকে।
তবে সংকটের সবচেয়ে বড় চিত্রটি ধরা পড়ে ইঞ্জিন বিকল ও যান্ত্রিক ত্রুটির ধারাবাহিক ঘটনায়। গত ১৫ জুন দুপুরে গফরগাঁও এলাকায় আন্তঃনগর জামালপুর এক্সপ্রেসের ইঞ্জিন ও বগির সংযোগস্থলের হুক ভেঙে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় ইঞ্জিন। এতে প্রায় দুই ঘণ্টা ঢাকা-ময়মনসিংহ রেলপথে বন্ধ ছিল ট্রেন চলাচল। একই দিন সন্ধ্যার আগে চট্টগ্রাম থেকে জামালপুরগামী বিজয় এক্সপ্রেসের ইঞ্জিনে ঈশ্বরগঞ্জের আঠারবাড়ি এলাকায় আগুন লাগে। বিকল্প ইঞ্জিন এনে ট্রেন চালু করা হলেও সেটিও কিশোরগঞ্জের সরারচর এলাকায় বিকল হয়ে পড়ে। ইঞ্জিন সংকটের কারণে সেদিন চট্টগ্রামগামী ময়মনসিংহ এক্সপ্রেস মেইল ট্রেনের যাত্রাই বাতিল করতে হয়।
এর আগে-পরে আরও কয়েকটি ঘটনা রেলব্যবস্থার দুর্বলতাকে নিয়ে আসে সামনে। গত ১৩ জুন ময়মনসিংহ স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকা তিস্তা এক্সপ্রেসের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত চেয়ার কোচে আগুন লাগে। ১০ জুন আনন্দ মোহন কলেজ রেলক্রসিং এলাকায় ব্রহ্মপুত্র এক্সপ্রেসের একটি পাওয়ার কার লাইনচ্যুত হয়। সেটি উদ্ধারে যাওয়া উদ্ধারকারী ট্রেনও লাইনচ্যুত হয় কৃষ্টপুর এলাকায়।
পরপর এমন ঘটনায় যাত্রীদের মধ্যে বেড়েছে নিরাপত্তাহীনতা। যার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে প্রতিদিনের যাত্রীদের ওপর। তারা বলছেন, ময়মনসিংহ থেকে ঢাকা, জামালপুর, নেত্রকোনা ও চট্টগ্রাম রুটে চলাচল করে ১৮ জোড়া ট্রেন। এর মধ্যে রয়েছে আটটি আন্তঃনগর, চারটি কমিউটার, একটি মেইল ও পাঁচটি লোকাল ট্রেন। প্রতিদিন হাজারো মানুষ কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা চিকিৎসার প্রয়োজনে এসব ট্রেনে যাতায়াত করেন। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে না পারা এখন অনেকের কাছে প্রায় নিয়মিত অভিজ্ঞতা। মাঝপথে ট্রেন দীর্ঘ সময় আটকে থাকলে খাবার, বিশুদ্ধ পানি, চিকিৎসাসহ মৌলিক সমস্যায় পড়েন যাত্রীরা। অনেক সময় অসুস্থ হয়ে পড়েন বয়স্ক ও শিশুরা।
ময়মনসিংহ জেলা নাগরিক আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক নুরুল আমীন কালামের ভাষায়, ব্রিটিশ আমল থেকেই এই অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে জড়িয়ে আছে রেল যোগাযোগ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে প্রয়োজনীয় উন্নয়ন না হওয়ায় রেলপথের অবস্থা খারাপ হয়েছে দিন দিন।
রেলওয়ে কর্মকর্তাদের মতে, এর পেছনে রয়েছে বহুদিনের অবকাঠামোগত সংকট। পুরনো ও মেয়াদোত্তীর্ণ ইঞ্জিন, দুর্বল রেললাইন, প্রয়োজনীয় পাথরের ঘাটতি, নষ্ট স্লিপার এবং নাট-বোল্টের সংকট মিলিয়ে পুরো ব্যবস্থাই রয়েছে চাপের মধ্যে। এসব সীমাবদ্ধতার কথা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকেও জানানো হয়েছে।
ময়মনসিংহ রেলস্টেশনের সুপারিনটেনডেন্ট মো. আব্দুল্লাহ আল হারুনের ভাষ্য, চলমান সমস্যার কারণে যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়ছে, বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষও জানে।
তবে আশার কথা শোনালেন ময়মনসিংহ রেলওয়ের সিনিয়র সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী নাজমুল হাসান। তিনি জানিয়েছেন, এই অঞ্চলের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে একটি বড় প্রকল্প প্রক্রিয়াধীন। সেটি বাস্তবায়ন হলে সমস্যাগুলোর বড় অংশ দূর হবে— আশা করেন এই কর্মকর্তা।




