শ্রীমঙ্গল
৮১ স্কুলে নেই প্রধান শিক্ষক, ব্যাহত পাঠদান

ছবি: আগামীর সময়
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে মোট ১৩৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৮১টি প্রাইমারি স্কুলে নিয়মিত প্রধান শিক্ষক নেই। ফলে এসব বিদ্যালয়ে পাঠদান কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে উপজেলার সার্বিক প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায়।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, শ্রীমঙ্গল উপজেলার ৯টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় মোট ১৩৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এসব বিদ্যালয়ের মধ্যে প্রধান শিক্ষকের ৮১টি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। এর মধ্যে ৩৫টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক পদমর্যাদা-সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে উচ্চ আদালতে মামলা চলমান ছিল। বাকি ৪৬টি বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক থেকে পদোন্নতি কার্যক্রমের জটিলতা এবং নতুন নিয়োগ বা পদায়ন না হওয়ায় প্রধান শিক্ষক পদ শূন্য।
প্রধান শিক্ষক না থাকায় এসব বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকদের মধ্য থেকে জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে তারা প্রশাসনিক ও শিক্ষাসংক্রান্ত দায়িত্ব পালন করছেন। তবে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের কারণে অনেক ক্ষেত্রে শ্রেণিকক্ষে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারছেন না, ফলে পাঠদান কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয় সূত্র আরও জানায়, উপজেলার ১৩৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৬৬টি ১৯৭২ সালে জাতীয়করণ হয়। বাকি বিদ্যালয়গুলো ২০১৩ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে জাতীয়করণের আওতায় আসে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শিক্ষক জানান, উপজেলার ৮১টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক না থাকায় সহকারী শিক্ষকদের মধ্য থেকে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এসব বিদ্যালয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষককে নিয়মিত প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে। ফলে অনেক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকদের পালাক্রমে পাঠদান করাতে হচ্ছে, যা শিক্ষকদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, প্রধান শিক্ষকবিহীন অনেক বিদ্যালয়ে মাত্র তিন থেকে চারজন শিক্ষক দিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। তাদের মধ্য থেকেই একজনকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। ফলে দাপ্তরিক কাজের চাপ সামলাতে গিয়ে তিনি নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারছেন না। একই সঙ্গে কিছু বিদ্যালয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষককে কেন্দ্র করে সহকারী শিক্ষকদের মধ্যে মতবিরোধের ঘটনাও দেখা যাচ্ছে।
চাতালী চা বাগান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক বিজয় নুনিয়া বললেন, সরকারি বিধিমালা ও সব নিয়ম-কানুন অনুসরণ করে নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আমাদের প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সরকারি গেজেট প্রকাশের সময় অনিচ্ছাকৃত ভুলের কারণে আমাদের নামের পাশে প্রধান শিক্ষকের পরিবর্তে সহকারী শিক্ষক হিসেবে উল্লেখ করা হয়। বিষয়টি বর্তমানে উচ্চ আদালতে বিচারাধীন। হাইকোর্ট একাধিকবার আমাদের পক্ষে প্রধান শিক্ষক হিসেবে রায় দিয়েছেন।
বিভিন্ন বিদ্যালয়ের অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক ও প্রধান শিক্ষক সংকট নিয়ে প্রশ্ন।
অভিভাবক নারায়ণ, ইকবাল ও জয়কুমার বললেন, প্রতিটি অভিভাবকের প্রত্যাশা থাকে তাদের সন্তানরা মানসম্মত শিক্ষা লাভ করবে। কিন্তু অনেক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যার তুলনায় শিক্ষকসংখ্যা কম হওয়ায় পাঠদান কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। আবার প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকায় ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষককে প্রশাসনিক দায়িত্বের পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষে পাঠদানও করতে হচ্ছে। ফলে শিক্ষার্থীরা নিয়মিত ও কার্যকর পাঠদান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং তাদের লেখাপড়ায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
তারা আরও উল্লেখ করেন, স্বল্পসংখ্যক শিক্ষক দিয়ে বর্তমান সময়ের চাহিদা অনুযায়ী মানসম্মত, যুগোপযোগী ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন। শিক্ষার মান উন্নয়ন এবং বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে দ্রুত শূন্য পদগুলোতে প্রধান শিক্ষক নিয়োগ ও প্রয়োজনীয় শিক্ষক পদায়নের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম আগামীর সময়কে বললেন, উপজেলায় ১৩৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। বর্তমানে ৫৭ জন নিয়মিত প্রধান শিক্ষক কর্মরত আছেন এবং ৪৬টি প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। এ ছাড়া জ্যেষ্ঠতাসংক্রান্ত মামলার কারণে ৩৫টি বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি বা পদায়ন কার্যক্রম স্থগিত ছিল।
তবে সম্প্রতি মামলার রায় হয়েছে। রায় কার্যকর হলে বর্তমানে স্থগিত থাকা ৩৫টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি বা নতুন পদায়নের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এর ফলে দীর্ঘদিনের প্রধান শিক্ষক সংকট অনেকাংশে দূর হবে এবং বিদ্যালয়গুলোর প্রশাসনিক ও শিক্ষা কার্যক্রম আরও গতিশীল ও কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে।




