শুরু হতে না হতেই নয়ছয়!

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
একটি আধুনিক মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় উত্তরবঙ্গের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও চিকিৎসাব্যবস্থায় নতুন দিগন্ত উন্মোচনের কথা ছিল। কিন্তু রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (আরএমইউ) স্থাপন প্রকল্পের শুরুতেই দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসায় সেই স্বপ্ন এখন প্রশ্নের মুখে। সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের কাজেই যখন গুরুতর কারিগরি ত্রুটি ও মান নিয়ন্ত্রণের ঘাটতি ধরা পড়েছে, তখন প্রকল্পের বড় অবকাঠামোগত কাজগুলো নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনের খসড়ায় উঠে এসেছে, প্রকল্পটির শুরুতেই নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির ঘটনা। আগামী ৩০ জুনের মধ্যে প্রতিবেদনটি চূড়ান্ত হওয়ার কথা রয়েছে। তবে খসড়া প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চার বছরের মূল মেয়াদ শেষ হলেও প্রকল্পের ৬১টি ক্রয় প্যাকেজের মধ্যে ৫১টির কেনাকাটা কার্যক্রম এখনো শুরুই হয়নি। এ অবস্থায় প্রকল্পের মেয়াদ দুই দফায় তিন বছর বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যয়ও ৩৯১ কোটি টাকা বেড়েছে।
রাজশাহী মহানগরীর রাজপাড়া থানার বড়বনগ্রাম, বাজে সিলিন্দা ও বারইপাড়া মৌজার ৬৭ দশমিক ৬৭ একর জমির ওপর রামেবি ক্যাম্পাস গড়ে তোলা হচ্ছে। উপাচার্য অধ্যাপক জাওয়াদুল হক এ প্রকল্পের পরিচালক (পিডি)।
আইএমইডির সাবেক সচিব আবুল মনসুর মো. ফয়েজ উল্লাহ বলেছেন, এত বড় একটি প্রকল্পের শুরুতেই যদি দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ ওঠে, তাহলে পরবর্তী কার্যক্রম নিয়েও স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি হয়। তাই আইএমইডির সুপারিশ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
প্রতিবেদনের খসড়ায় বলা হয়েছে, প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। সরেজমিন পরিদর্শনে সীমানাপ্রাচীরের গাঁথুনি, কলাম ঢালাই, বালু ভরাট, শিয়ার ওয়াল আরসিসি এবং প্রধান ফটক নির্মাণকাজে একাধিক কারিগরি অসংগতি ও স্পেসিফিকেশন লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া নিম্নমানের বালুর ব্যবহার, কিছু আরসিসি অংশে নির্ধারিত শক্তিমাত্রা না থাকা এবং মান নিয়ন্ত্রণ ও পরীক্ষণ ব্যবস্থার দুর্বলতাও শনাক্ত করা হয়েছে।
আইএমইডির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, মিশ্রণ প্রস্তুত ও ব্যবহারের ক্ষেত্রেও নির্ধারিত সময়সীমা মানা হয়নি। ফলে নির্মাণকাজের স্থায়িত্ব ও গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে নির্মাণশ্রমিকদের দক্ষতা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তদারকির বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, প্রকল্পের সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো এখনো শুরুই হয়নি। এর মধ্যে রয়েছে নয়তলা নন-ক্লিনিক্যাল ভবন, উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, ট্রেজারার, রেজিস্ট্রার ও কন্ট্রোলারের অফিস, সিনেট ভবন, মূল প্রশাসনিক ভবন এবং ১ হাজার ২০০ শয্যার ১১ তলা হাসপাতাল ও ক্লিনিক্যাল অনুষদসহ আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। চিকিৎসা সরঞ্জাম ক্রয়সহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমও কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিবেদন তৈরির দায়িত্বে থাকা আইএমইডির এক কর্মকর্তা বলেছেন, সীমানাপ্রাচীর নির্মাণেই যদি এমন অনিয়ম ঘটে, তাহলে পরবর্তী বড় কাজগুলোয় আরও বড় ধরনের দুর্নীতির আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা আইএমইডিকে আশ্বাস দিয়েছেন যে, সংঘটিত অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং ভবিষ্যতে যাতে এমন ঘটনা না ঘটে, সেজন্য কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা হবে। আইএমইডিও তাদের প্রতিবেদনে এ বিষয়ে একাধিক সুপারিশ যুক্ত করছে।
এদিকে চার বছর শেষ হলেও প্রকল্পটির ভৌত অগ্রগতি মাত্র ৩৮ দশমিক ২৭ শতাংশ। আর্থিক অগ্রগতি আরও কম, ৩৪ দশমিক ৪২ শতাংশ। এখন পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ৭৭৩ কোটি ৯৪ লাখ টাকা।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে উত্তরবঙ্গে আধুনিক চিকিৎসা শিক্ষা, গবেষণা ও উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ‘রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (আরএমইউ) স্থাপন’ প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হয়েছিল। অনুমোদনের পর ২০২২ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত এর মেয়াদ ধরা হয়েছিল তখন। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না হওয়ায় প্রথম সংশোধনীর মাধ্যমে মেয়াদ এক বছর বাড়িয়ে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়। শুরুতে প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ হাজার ৮৬৭ কোটি টাকা। পরে প্রথম সংশোধনীর মাধ্যমে তা বাড়িয়ে ২ হাজার ২৫৮ কোটি টাকা করা হয়।
এরপরও কাজের গতি সন্তোষজনক না হওয়ায় ব্যয় না বাড়িয়ে আরও আড়াই বছর সময় বাড়িয়ে ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে। তবে আইএমইডির আশঙ্কা, বাড়তি সময় পেয়েও প্রকল্পটি নির্ধারিত সময়ে শেষ করা যাবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
সব মিলিয়ে, যে প্রকল্পটি উত্তরবঙ্গের চিকিৎসা শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় যুগান্তকারী ভূমিকা রাখার কথা ছিল, সেটি এখন শুরুতেই দুর্নীতি, অনিয়ম, ধীরগতি ও ব্যয় বৃদ্ধির অভিযোগে জর্জরিত। আর তাই বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই কঠোর নজরদারি, জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং ত্রুটিপূর্ণ কাজ পুনর্নির্মাণের মাধ্যমে প্রকল্পটিকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনা জরুরি।




