৮৮ বছরের ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে শিশু ওয়ার্ড

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
খসে পড়ছে পলেস্তারা, দেয়ালে ফাটল, বর্ষায় স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ। এমন ঝুঁকিপূর্ণ ভবনেই চলছে দিনাজপুরের ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট সদর হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের কার্যক্রম। ২০ শয্যার এই ওয়ার্ডে ভর্তি রয়েছে প্রায় ৩০ শিশু। শয্যা সংকটে অনেক শিশুকে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে হাসপাতালের বারান্দায়। এর সঙ্গে রয়েছে চিকিৎসক সংকট, অকেজো অ্যাম্বুলেন্স ও দালালচক্রের উৎপাত। সব মিলিয়ে জেলার প্রধান এই হাসপাতালে কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন রোগীরা। সম্প্রতি সরেজমিনে হাসপাতাল ঘুরে এসব চিত্র দেখা গেছে।
বিরল উপজেলার আবুল খায়ের চার বছরের সন্তানকে নিয়ে তিন দিন ধরে শিশু ওয়ার্ডে অবস্থান করছেন। তিনি বলেছেন, সামান্য বৃষ্টিতেই ভবনের ভেতর স্যাঁতসেঁতে হয়ে যায়। মাঝেমধ্যে পলেস্তারা খসে পড়ে। শিশুদের নিয়ে সবসময় আতঙ্কে থাকতে হয়। ঝুঁকি বিবেচনায় শিশু ওয়ার্ড দ্রুত অন্য ভবনে স্থানান্তর করা প্রয়োজন।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, হাসপাতালের দুটি ভবন ১৯৩৭ সালে নির্মিত। প্রায় ৮৮ বছরের পুরনো ভবন দুটির একটিতে শিশু ওয়ার্ড এবং অন্যটিতে চলছে জরুরি বিভাগের কার্যক্রম। ঝুঁকির কারণে একটি ভবনের নিচতলা থেকে এর মধ্যে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে দন্ত বিভাগ।
ভবন দুটি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় বিষয়টি লিখিতভাবে গণপূর্ত বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। নতুন ভবনে শিশু ওয়ার্ড স্থানান্তরের প্রস্তুতিও চলছে। এমন কথা জানালেন হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. মো. নূর আলম।
এদিকে অবকাঠামোগত সংকটের পাশাপাশি জনবল সংকটও প্রকট। হাসপাতালের ৮৭টি চিকিৎসক পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ৪১ জন। শূন্য রয়েছে ৪৬টি পদ। সংকট রয়েছে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরও। দীর্ঘদিন ধরে সিনিয়র কনসালট্যান্ট (কার্ডিওলজি) ও অর্থোপেডিক সার্জনের পদ শূন্য থাকায় হৃদরোগ ও জটিল অর্থোপেডিক রোগীদের পাঠাতে হচ্ছে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।
বহির্বিভাগে গিয়ে দেখা যায়, সকাল থেকেই টিকিট কাউন্টারে দীর্ঘ লাইন। বহির্বিভাগে রোগী দেখছেন তিন-চারজন চিকিৎসক। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে রোগীদের। অনেকেই দাঁড়িয়ে থাকতে না পেরে বসে পড়ছেন মেঝেতে।
রোগী রহমত আলী তুলে ধরলেন ভোগান্তির কথা, জ্বর, কাশি ও মাথাব্যথা নিয়ে হাসপাতালে এসেছেন। দুই ঘণ্টার বেশি অপেক্ষা করেও চিকিৎসকের সিরিয়াল পাননি।
অন্যদিকে হাসপাতালের তিনটি অ্যাম্বুলেন্সের মধ্যে একটি দীর্ঘদিন ধরে বিকল। বাকি দুটি চললেও সেগুলোর শীতাতপ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা (এসি) নষ্ট। সেগুলোও অচল হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে যেকোনো সময়।
রোগীদের অভিযোগ, সংকটের সুযোগে হাসপাতালের জরুরি বিভাগ, বহির্বিভাগ ও ওয়ার্ডে সক্রিয় রয়েছে দালালচক্র। ভর্তি, ছাড়পত্র কিংবা রোগী বহনের নামে দাবি করা হয় ‘বকশিশ’। অনেক ক্ষেত্রে স্বেচ্ছায় দেওয়া অর্থ নিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে দাবি করা হয় ৩০০-৫০০ টাকা পর্যন্ত।
ভুক্তভোগী রোগীর স্বজন আহসান হাবীব জানালেন, তার মা হাসপাতালে ভর্তি থাকার সময় কিছু ব্যক্তি জোর করে সহযোগিতার নামে টাকা দাবি করেন। এ ধরনের দৌরাত্ম্য বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের কথা স্বীকার করেন দিনাজপুর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামান সরকার, ‘ভবন দুটি ঝুঁকিপূর্ণ। এগুলো ভেঙে নতুন ভবন নির্মাণের প্রক্রিয়া চলছে।’
সার্বিক বিষয়ে আরএমও ডা. মো. নূর আলম বলেছেন, নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। চিকিৎসক নিয়োগ, অ্যাম্বুলেন্স, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রয়োজনীয় জনবল চেয়ে নিয়মিত ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হচ্ছে। দালালচক্র নিয়ন্ত্রণেও নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোয় আনসার সদস্য নিয়োগ দেওয়া হলেও দিনাজপুর সদর হাসপাতালে এখনো দেওয়া হয়নি। এতে হাসপাতালের নিরাপত্তাব্যবস্থাও দুর্বল হয়ে পড়েছে। তাই দ্রুত আনসার সদস্য নিয়োগের দাবি জানিয়েছেন তিনি।




