ধসে পড়ার শঙ্কায় নগর ভবন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বরিশাল নগর ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয় ১৫ বছর আগে ২০১১ সালে। কিন্তু এখনো অফিস চলছে ভবনটিতে। কর্মকর্তা-কর্মচারী-সেবাগ্রহীতারা আতঙ্কে থাকেন। এর মূল কলামগুলোয় বড় বড় ফাটল। ছাদ থেকে খসে পড়ছে চুন-সুরকি। করপোরেশনের প্রকৌশলীরা বলছেন, অবস্থা যা, যেকোনো সময় এটি ধসে পড়তে পারে।
ভবনটি সংস্কার বা নতুন নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ২০১১ সাল থেকে দায়িত্বে থাকা সব মেয়র। একজন তো ভয়ে এখানে অফিসই করেননি। তাদের সবারই দায়িত্বকাল শেষ হলেও নিছক আশ্বাসেই রয়ে গেছে ভবন নির্মাণ।
বর্তমানে নতুন করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে ভবন নির্মাণ প্রকল্পের প্রস্তাব। কিন্তু কবে তা পাস হবে, তার ঠিক নেই। করপোরেশন কর্তৃপক্ষ বলছে, যে দশা, তাতে প্রকল্প পাস না হওয়া পর্যন্ত ভাড়া বাড়িতে ওঠা ছাড়া উপায় নেই। প্রতিদিন কয়েক হাজার মানুষের যাতায়াত এখানে। যে কোনো সময় ঘটতে পারে বড় দুর্ঘটনা। সিটি করপোরেশন খুবই উদ্বিগ্ন। একই সঙ্গে পাওয়া যাচ্ছে না ভবনের মূল নকশা।
বরিশাল সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, ১৯৮৫ সালে ওই সময়ের নকশা অনুযায়ী বরিশাল পৌরসভা ভবনের কাজ শুরু হয়। ১৯৯২ সালে কাজ শেষ হলে পৌরসভার কার্যক্রম শুরু হয়। ৪৬ শতাংশ জমির ওপর প্রথমে নির্মাণ করা হয় ৩৫ কক্ষবিশিষ্ট দোতলা ভবন। পরে ২০০২ সালে পৌরসভা সিটি করপোরেশনে উন্নীত হওয়ার পর নকশাবহির্ভূতভাবে একে তিনতলায় রূপান্তর করা হয়। বর্তমানে ভবনে কক্ষ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭০টিতে।
মূলত সাড়ে ৪০০ জন জনবলের জন্য নির্মিত এই ভবনে এখন প্রায় ১ হাজার ৬০০ কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত। প্রতিদিন গড়ে অন্তত সাড়ে ৫ হাজার মানুষের যাতায়াত রয়েছে এখানে। ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর সিটি করপোরেশনের অ্যানেক্স ভবনটি আগুনে পুড়ে যাওয়ার পর সেখানকার চারটি বিভাগের কার্যক্রমও স্থানান্তর করা হয় এই মূল ভবনে। এতে তৈরি হয়েছে বাড়তি চাপ।
সরেজমিন দেখা যায়, নগর ভবনের প্রথম ও তৃতীয়তলার ছাদে ফাটল ধরে খসে পড়ছে পলেস্তারা। আরও ভয়াবহ হচ্ছে, ভবনের কলামগুলোতেও দেখা দিয়েছে বড় বড় ফাটল। বেশিরভাগ কক্ষই বসার উপযোগী নয়। স্বল্প মেরামত করে চলছে কার্যক্রম।
ভবনের বর্তমান অবস্থা নিয়ে সিটি করপোরেশনের নির্বাহী প্রকৌশলী (সিভিল) আবুল বাশার বলছিলেন, ‘আমরা এই ভবনের কোনো প্ল্যান খুঁজে পাইনি। এখন যে অবস্থা, তাতে বলা যায়, যেকোনো সময় ধসে পড়তে পারে।’
জানা গেছে, শওকত হোসেন হিরণ ২০০৮ সালে মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর ভবনটির মূল কাঠামোর সঙ্গে জোড়া লাগিয়ে নতুন ইমারত তৈরি করেন। তবে বর্তমানে দুটির অবস্থাই নাজুক। ২০১১ সালে নগর ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। পরে মেয়র আহসান হাবিব কামাল মন্ত্রণালয়ে নতুন নগর ভবন নির্মাণের প্রকল্প পাঠালেও তা দেখেনি আলোর মুখ। আর মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ নগর ভবনের ভয়াবহ অবস্থার কারণে সেখানে অফিস না করে তার কার্যক্রম পরিচালনা করতেন করপোরেশনের অ্যানেক্স ভবনে।
পরে মেয়র আবুল খায়ের আব্দুল্লাহ খোকন সেরনিয়াবাত তৎকালীন স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে নথুল্লাবাদে নগর ভবন নির্মাণ প্রকল্প প্রস্তাব করেন। কিন্তু সরকার পরিবর্তনে সেই উদ্যোগও থমকে যায়।
নগর ভবনে সেবা নিতে ‘হাট-বাজার শাখায়’ আসা যতীন চন্দ্র মণ্ডল আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘সিটি করপোরেশনের প্রাণ বলা এই ভবন বাইরে থেকে বেশ চাকচিক্য দেখালেও, ভেতরের অবস্থা খুবই খারাপ। যে কক্ষে যাই সে কক্ষেই দেখি ছাদ থেকে চুন-সুরকি খসে পড়া। ভয়ে থাকি কখন আবার আমার মাথায় ভেঙে পড়ে।’
কর আদায় শাখায় কর্মরত বেলায়েত হোসেনের কথা, ‘প্রতিদিনই কোনো না কোনো কক্ষ থেকে পলেস্তারা খসে পড়ে। আর বিভিন্ন কলামে ফাটল তো রয়েছেই। সম্প্রতি কয়েকবারের ভূমিকম্পে খুব আতঙ্কে ছিলাম। ভয়ে ভয়ে অফিস করতে হয়। বিপদ ঘটলে আর বেঁচে ফিরতে পারব বলে মনে হয় না।’
‘আমরা জীবন হাতে নিয়ে কাজ করি এখানে’— এ কথা বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসনিক কর্মকর্তা স্বপন কুমার দাসের। তিনি বলছিলেন, ‘এই ভবন থেকে বরিশাল সিটি করপোরেশনের সব নাগরিককে সেবা দেওয়া হয়, আর এ ভবনই সব থেকে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। যেখানে ইঞ্জিনিয়াররাই উদ্বিগ্ন, সেখানে আমাদের অবস্থা কী হয়, ভাবুন। প্রতিটি কক্ষের অবস্থা শোচনীয়। প্রশাসক, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, সচিবসহ সবাই ভয়াবহ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন।’
তাদের কক্ষগুলো বাইরে থেকে চাকচিক্য দেখালেও ভেতরের অবস্থা খুবই খারাপ। এই ভবনে প্রতিদিন কম করে হলেও পাঁচ হাজার মানুষের যাতায়াত। যদি কোনো দুর্ঘটনা ঘটে, তাহলে কত প্রাণহানি হতে পারে, তা একবার চিন্তা করুন।’
করপোরেশনের জনসংযোগ কর্মকর্তা আহসান উদ্দিন রোমেলের মন্তব্য, নতুন নগর ভবনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে কম করে হলেও ১৫ বছর ধরে। সাবেক মেয়ররা সেই উদ্যোগ নিলেও আলোর মুখ দেখেনি।
প্রধান প্রকৌশলী হুমায়ুন কবির বলছিলেন, ‘মরহুম শওকত হোসেন হিরণ স্যার মেয়র থাকাকালে মূল ভবনের সঙ্গে কিছু অংশ বাড়িয়ে নগর ভবনের পরিধি বাড়িয়েছিলেন। এতে করে তেমন সুরাহা হয়নি। ৩৫ কক্ষের ভবনটিকে ৭০ কক্ষবিশিষ্ট করা হয়। এতে যে চাপ নিতে পারে, তার থেকে রয়েছে কয়েকগুণ বেশি।’
প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাউল বারী উদ্বেগ প্রকাশ করে আশু করণীয় সম্পর্কে বললেন, ‘অনেক ঝুঁকির মধ্যে অফিস করছি। বিভিন্ন স্থানে আমাদের কিছু ভবন রয়েছে। আপাতত সেই ভবনগুলোয় করপোরেশনের কিছু শাখা স্থানান্তর করা হবে। যার মধ্যে সদর রোডের নির্মাণাধীন সুপার মার্কেট, অমৃত লাল দে সড়কের করপোরেশনের ভবন ও শহীদ মিনারের পাশে অডিটরিয়ামে কিছু শাখার কার্যক্রম স্থানান্তরের কথা ভাবা হচ্ছে। তা ছাড়া ভাড়া বাসা খুঁজছি; সে ভবনেই আপাতত নগর ভবনের কার্যক্রম অস্থায়ীভাবে চলবে।’
বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরিনের কণ্ঠেও উদ্বেগ— ‘নগরবাসীকে সেবা গ্রহণের জন্য বেশ ঝুঁকি নিতে হচ্ছে। আমাদের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তো সবসময় আতঙ্কের মধ্যে থাকেন। আমরা মন্ত্রণালয়ে একটি প্রকল্প প্রেরণ করেছি।’
প্রশাসক আশা করেন, প্রকল্পটি পাস হলে নগরীর নথুল্লাবাদে ১৫ তলাবিশিষ্ট নগর ভবন হবে। এতে করে নগর ভবনকেন্দ্রিক কোনো সংকট আর থাকবে না। বর্তমানে নগর ভবন থেকে সেবা গ্রহণ করে নগরীর ৩০টি ওয়ার্ডের প্রায় ১০ লাখ মানুষ।




