নবাব ফয়জুন্নেছার ওয়াকফের বাকি জমিটুকুও কি দখল হয়ে যাবে?

অবশিষ্ট ৭১ শতাংশ জমি নবাব ফয়জুন্নেছা সরকারি কলেজের পাশে। এই জমি দখলে নেওয়ার জন্য কলেজ সীমানা প্রাচীর নির্মাণকাজে বাধা দেয় ভূমিদস্যুরা—ছবি: আগামীর সময়
নবাব ফয়জুন্নেছা চৌধুরানী। নারী শিক্ষার অগ্রদূত এক মহীয়সী নারী। মানবসেবায় নিজের সম্পদ বিলিয়ে দিতেও তিনি পিছপা হননি। জনকল্যাণমূলক কাজে ওয়াকফ করেছিলেন কুমিল্লার লাকসামে থাকা তার ২৯৭ একর জমি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই সম্পদের বড় অংশই চলে গেছে দখলদারদের কবলে। সর্বশেষ ৭১ শতকও বেহাত হওয়ার পথে। অথচ জমিটি প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সম্পদ হিসেবে গেজেটভুক্ত।
স্থানীয়রা বলছেন, তার সব জমি দখল করেছে সরকারি দলের প্রভাবশালী একটি চক্র। যারা স্থানীয়ভাবে ভূমিদস্যু হিসেবে পরিচিত। প্রকাশ্যে তাদের নাম নিতে সাহস করছেন না কেউ। একসময় যে সম্পদ মানুষের কল্যাণে উৎসর্গ করেছিলেন নবাব ফয়জুন্নেছা, আজ সেই শেষ চিহ্নটুকুও হারানোর পথে।
অবশিষ্ট জমিটি নবাব ফয়জুন্নেছা সরকারি কলেজের পাশেই। এ ছাড়া ক্যাম্পাসের ভেতর তারই স্থাপিত পোস্ট অফিসের কাছে ওয়াকফকৃত ২২১৬ দাগের ১৪ শতক জমিও এখন ভূমিদস্যুদের দখলের চূড়ান্ত পর্যায়ে।
দখলের নেপথ্যে কারা- বিষয়টি জানতে কথা হয় স্থানীয় একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে। তারা বললেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কিছু প্রভাবশালী নেতাকর্মী ক্ষমতার অপব্যবহার করে জমি দখলে নেন। এখন যেটুকু বাকি আছে, একই কায়দায় বিএনপি নেতাকর্মীরা নেওয়ার পাঁয়তারা করছেন। বিষয়টি এলাকায় ‘ওপেন সিক্রেট’। তাদের কারা আশ্রয় দিচ্ছে, এটিও জানেন সবাই। প্রশাসন চাইলে সহজেই তাদের শনাক্ত করতে পারবে।
লাকসামের ঐতিহাসিক নবাব ফয়জুন্নেছা কলেজের কাছের ওই জমি নিয়ে ২০১৭ সালের ১৩ জুলাই একটি প্রজ্ঞাপন হয়। একই বছরের ৩১ আগস্ট প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সম্পদ হিসেবে গেজেটভুক্ত হয়। সেই গেজেটের ৬৩০ নম্বর খতিয়ানভুক্ত ২২২২। পরিমাণ ৭১ শতক। এই জায়গায় ‘নবাব ফয়জুন্নেছা জমিদার বাড়ি জাদুঘর’ নামে সরকারি গেজেটভুক্ত হয়।
ওই জায়গা দখলের উদ্দেশ্যে গত মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) কলেজ ক্যাম্পাসের সীমানা প্রাচীর নির্মাণকাজে বাধা দেয় ভূমিদস্যুচক্রটি। সেখানে বালু ফেলে দখল করে প্লট আকারে বিক্রির অভিযোগ রয়েছে এই চক্রের বিরুদ্ধে।
কলেজের একাধিক শিক্ষক জানালেন, নবাব ফয়জুন্নেছা চৌধুরানীর নামে একটি স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালাচ্ছেন কুমিল্লা-৯ (লাকসাম-মনোহরগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য আবুল কালাম। তিনি শিল্প মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতিও। কিন্তু ভূমিদস্যুদের অপতৎপরতায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং কলেজের নতুন অবকাঠামোগত সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। হুমকির মুখে পড়েছে ঐতিহাসিক এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সীমানা প্রাচীর ও নবাব ফয়জুন্নেছার চৌধুরানীর ভাবমূর্তি।
জমি দখলের বিষয়টি সম্পর্কে অবগত লাকসাম উপজেলা নির্বাহী অফিসারের (ইউএনও) কার্যালয়। একাধিক কর্মকর্তা জানান, একটি চক্র জালিয়াতি করে ওয়াকফ এস্টেটের ওই সম্পত্তি নিজেদের নামে ত্রুটিপূর্ণ বিএস খতিয়ান তৈরি করেছে। এসব জমি দখল ও চড়া দামে বিক্রির ষড়যন্ত্র চলছে- এমন তথ্য উঠে এসেছে কার্যালয়ের সাম্প্রতিক সময়ের এক তদন্ত প্রতিবেদনে।
ওয়াকফ করা জমি বেহাত হচ্ছে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের গাফিলতিতে, অভিযোগ নবাব ফয়জুন্নেছা চৌধুরানী জমিদার বাড়ি জাদুঘরের তত্ত্বাবধায়ক মো. আনোয়ার হোসেনের। তার কথা, নবাব ফয়জুন্নেছা চৌধুরানীর ওয়াকফকৃত প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সম্পত্তি বেহাতের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার অবহিত করা হয়েছে। কিন্তু কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। দ্রুত আইনি পদক্ষেপ না নেওয়া হলে ভূমিদস্যুদের থেকে সর্বশেষ জমিটুকুও রক্ষা করা সম্ভব হবে না।
ক্যাম্পাসের নিরাপত্তার স্বার্থে প্রাচীরের নির্মাণকাজে একটি মহল বাধা দিচ্ছে জানিয়ে নবাব ফয়জুন্নেছা কলেজের অধ্যক্ষ মো. মুনির আহাম্মদ বললেন, ‘কোনোভাবে এটি মেনে নেওয়া যায় না।’
অসহায়ত্ব প্রকাশ করে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের প্রতি প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানালেন তিনি।
তবে ঘটনাটি জানলেও আনুষ্ঠানিক অভিযোগ না পাওয়ায় ‘ব্যবস্থা নিতে পারছেন না’ বলে জানালেন লাকসাম উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) নার্গিস সুলতানা। বললেন, ‘কলেজের বাউন্ডারির ভেতর ভরাট হচ্ছে। কিন্তু কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত থানায় বা এসিল্যান্ড অফিসে কোনো অভিযোগ করেনি। এ বিষয়ে অভিযোগ দিলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
নবাব ফয়জুন্নেছা চৌধুরানীর ওয়াকফকৃত প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ বা জাদুঘরের সম্পত্তি কোনোভাবেই বেহাত হতে দেওয়া যাবে না বলে সতর্ক করলেন এই আসনের সংসদ সদস্য আবুল কালাম। ‘ভূমিদস্যুদের কোনো দল নেই। অপরাধীরা যেই দলেরই হোক, তাদের পরিচয় অপরাধী। ভূমিদস্যুদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে’ – বললেন তিনি।







