ঘুষের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে ‘ঘুষ ডট সাইট’

শাহেদ শরীফ আহমেদে। ছবি: আগামীর সময়
মায়ের মৃত্যুর পর পাওনা ৭ লাখ টাকা প্রভিডেন্ট ফান্ডের অর্থ তুলতে গিয়ে তিনটি সরকারি দপ্তরে ৩৮ হাজার টাকা ঘুষ দেওয়ার অভিজ্ঞতা হয়েছিল ময়মনসিংহ জিলা স্কুলের ১৮ বছরের শাহেদ শরীফ আহমেদের। ক্ষোভ থেকেই কিছু একটা করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। বসে পড়েন কম্পিউটারের সামনে। মাত্র দুই ঘণ্টার কোডিংয়ে তৈরি করেন ‘ঘুষ ডট সাইট’ নামে একটি ওয়েবসাইট।
গত ২১ আগস্ট চালুর মাত্র ১০ দিনে সাইটটিতে প্রায় ১০ হাজার অভিযোগ জমা পড়েছে বলে দাবি শাহেদের। এসব অভিযোগে ৩২২ কোটিরও বেশি টাকা ঘুষ চাওয়ার তথ্য উঠে এসেছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
শাহেদ ময়মনসিংহ নগরের ক্যান্টনমেন্ট এলাকার বাসিন্দা। ব্রিটিশ কাউন্সিলের অধীন কেমব্রিজ ইন্টারন্যাশনালের এ-লেভেলে পড়াশোনা তার। এর পাশাপাশি অনলাইনে শিখেছেন ওয়েবসাইট তৈরির কাজও।
শাহেদের মা আমিনা খাতুন ময়মনসিংহ সদরের আজমতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। ২০২২ সালের ১৬ ডিসেম্বর অসুস্থতায় মারা যান তিনি। শাহেদ জানান, মায়ের মৃত্যুর পর পেনশন ও প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা তুলতে পরিবারের সদস্যদের বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে যেতে হয়। সেখানে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ‘খুশি’ করতে হয়েছে। পেনশনের বাকি টাকা তুলতেও তাদের বিড়ম্বনায় পড়তে হয়।
শাহেদের ভাষ্য, প্রায় দেড় বছর আগে নিজে পাসপোর্ট করতে গিয়ে আরেক দফা ঘুষের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন তিনি। তখন থেকেই ঘুষের বিরুদ্ধে কিছু করার কথা ভাবছিলেন। পরে ভারতের একটি ওয়েবসাইট দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে ‘ঘুষ ডট সাইট’ তৈরির উদ্যোগ নেন।
শাহেদ জানান, মাত্র দুই ঘণ্টায় ওয়েবসাইটটির প্রাথমিক কাঠামো তৈরি করেন তিনি। পরে বন্ধু ও সহপ্রতিষ্ঠাতা সাইফ কবিরের সহযোগিতায় ডোমেইন কিনে ২১ আগস্ট সাইটটি চালু করেন। এতে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে ঘুষ দাবির অভিযোগ জানানোর সুযোগ রয়েছে। অভিযোগ যাচাই-বাছাইয়ের জন্য তাদের একটি দলও রয়েছে বলে দাবি শাহেদের।
তার দাবি, চালুর পর ১০ দিনে প্রায় ১০ হাজার মানুষ সাইটটিতে সাড়া দিয়েছেন। এর মধ্যে পাসপোর্ট, ভূমি ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) কার্যালয় নিয়ে বেশি অভিযোগ এসেছে। তথ্যদাতাদের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে বলেও জানান তিনি। এখন পর্যন্ত কোনো হুমকি পাননি বলে জানান শাহেদ।
ময়মনসিংহ সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মনিকা পারভীন জানান, তার দপ্তরের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে ঘুষ দাবির অভিযোগ আগে কেউ তাকে জানাননি। এখন বিষয়টি জেনেছেন তিনি। দপ্তরের কেউ অনিয়মে জড়িত থাকলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান এই কর্মকর্তা।
তবে ‘ঘুষ ডট সাইট’-এ জমা পড়া অভিযোগের সবগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। ফলে সাইটে আসা অভিযোগগুলোকে সরাসরি প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে বিবেচনার সুযোগ নেই।
মাত্র ১৮ বছর বয়সে এক শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে তৈরি এই উদ্যোগ সরকারি সেবায় ঘুষের অভিযোগ নিয়ে মানুষের ক্ষোভ প্রকাশের একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে। এখন এসব অভিযোগ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কতটা গুরুত্ব দিয়ে যাচাই করে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়, সেটিই দেখার বিষয়।








