সিলেট ভাসছে চট্টগ্রাম জাগছে
- পানিবন্দি ১০ লাখের বেশি

টানা ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে প্লাবিত হয়েছে চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলা। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে আশপাশের কয়েক উপজেলার চার লাখের বেশি মানুষ। ছবি: সংগৃহীত
সপ্তাহখানেক ধরে ঝরছে বিরামহীন বৃষ্টি। রাজধানীসহ সারা দেশের একই অবস্থা। বেশি খারাপ চট্টগ্রাম তথা দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল, পূর্বাঞ্চল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের দৃশ্য। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে ১০ লক্ষাধিক মানুষ। নতুন করে প্রাণ হারিয়েছে আরও দুজন। বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে বান্দরবান, আকাশপথ ছাড়া উপায় নেই যোগাযোগের। দুর্গতদের সহায়তায় সমানতালে কাজ করছে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী ও সেনাবাহিনী। সঙ্গে ফেনীসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে যোগ দিয়েছেন হাজারো স্বেচ্ছাসেবী। এরই মধ্যে কিছুটা উন্নতি হওয়ায় জাগছে চট্টগ্রাম; তবে অন্য অঞ্চলে পরিস্থিতি আরও অবনতি হতে পারে বলে গতকাল শনিবার জানিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।
পূর্বাভাসের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জে এখনো বন্যা পরিস্থিতি বিরাজ করছে এবং ভারী বর্ষণের কারণে ভাসতে পারে ফেনী অঞ্চলও। বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে সাঙ্গু নদী বান্দরবান ও চট্টগ্রামের দোহাজারীতে, হবিগঞ্জে খোয়াই, মৌলভীবাজারে মনু এবং সুনামগঞ্জ ও সিলেটে কুশিয়ারা নদী। শুধু তাই নয়, দ্রুত বাড়ছে বন্যার পরিধি। এর মধ্যেই ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টি হতে পারে সিলেট, রংপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগে এবং এসব অঞ্চলসংলগ্ন উজানে ভারতের মেঘালয়, আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে, যা আরও প্রকট করবে সংকট।
২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় ফেনী, চট্টগ্রাম ও খাগড়াছড়ি জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে কোথাও কোথাও স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে। এ ছাড়া সাময়িকভাবে প্লাবিত হতে পারে লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালী জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চল কোথাও কোথাও।
তবে এ সময়ে বান্দরবান, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলার কিছু এলাকায় আবার বন্যা পরিস্থিতির ধীরগতিতে উন্নতিও হতে পারে।
অন্যদিকে, নতুন করে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, শেরপুর ও ময়মনসিংহ জেলার নিম্নাঞ্চলে— সতর্ক করা হয় পূর্বাভাসে।
চট্টগ্রামে জলাশয় তলিয়েই ক্ষতি ৯১ কোটি: চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে কিছুটা কমে এসেছে বৃষ্টির প্রবণতা। উন্নতির দিকে বন্যা পরিস্থিতি। তবে এর গতি কচ্ছপের চেয়েও ধীর। এরই মধ্যে তলিয়ে গেছে চট্টগ্রামের ১০ হাজার জলাশয়। এতে ক্ষয়ক্ষতি ৯১ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এখনো বিভিন্ন উপজেলায় রয়েছে বানের পানি। পুরোপুরি নেমে গেলে আরও স্পষ্ট হবে ক্ষয়ক্ষতির চিত্র। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে বাঁশখালী, লোহাগাড়া, আনোয়ারা ও সাতকানিয়া উপজেলায়। এদিকে চট্টগ্রামে আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বন্যাকবলিত সাতকানিয়ায় ঘটেছে এ দুর্ঘটনা। এ ছাড়া আনোয়ারায় পানিতে ভেসে আসা এক ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ।
তবে দুর্ভোগ সীমাহীন। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা, খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট এবং ভেঙে পড়া যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন লাখো মানুষ। কেউ উঁচু ভবনে, কেউ আশ্রয়কেন্দ্রে দিন-রাত পার করছেন। শুক্রবার রাতের বৃষ্টির পর শনিবার সাতকানিয়ার বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। তবে তিন দিন পানিবন্দি থাকার পর গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ত্রাণ সংকটের বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে। এর পর থেকেই সরকার, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক সংগঠন জোরদার করে ত্রাণ কার্যক্রম।
বাঁশখালীতে পানির নিচে ঘরবাড়ি: বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি শুরু হলেও বাড়ছে দুর্ভোগ। উপজেলার গুনাগরী, কোকদণ্ডী, ইলশা, চাঁপাছড়ি, বাহারছড়া ও দিঘীরপাড়া- বাঁশখালীর এই ছয় এলাকা ঘুরে চোখে পড়ল একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি। গাছপালার ফাঁক দিয়ে যতদূর চোখ যায়, শুধু ঘোলাটে পানি। তার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে আধডোবা ঘরবাড়ি, স্কুল-মাদ্রাসা, আর সেই পানি ঠেলে জীবন বাঁচাতে ছুটে চলা মানুষ। যে পথে শিক্ষার্থীরা যেত, সেখানে এখন থইথই পানি। কোকদণ্ডী এলাকার একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিশাল আঙিনা এখন পুরোপুরি জলাশয়। তিনতলা ভবনের নিচতলা পানিতে ডুবে আছে।
ইলশা ও দিঘীরপাড়া এলাকায় সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ল নারীদের সংগ্রাম। বোরকা ও শাল জড়িয়ে কোমরপানি ভেঙে হেঁটে চলা কয়েকজন নারীকে দেখা গেল। প্রত্যেকের হাতে বা মাথায় পলিথিনে মোড়ানো কাপড়চোপড় ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। পেছনে থাকা পুরুষদের ব্যাগেও একই রকম নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী। কারও মুখেই স্বস্তির ছাপ নেই। তবু থেমে না গিয়ে সবাই এগিয়ে চলেছেন সামনের দিকে। হয়তো কোনো আত্মীয়ের বাড়ি। নয়তো আশ্রয়কেন্দ্র।
এই গ্রামের বাসিন্দা শাহাবুদ্দিন জানালেন, এখানে কেউ ত্রাণ দিতে আসেনি। সবাই সড়কের পাশে উঁচু এলাকায় দিয়ে চলে যাচ্ছে। তবে এলাকার বিত্তবান লোকজন এগিয়ে এসেছেন। নিজের ঘর ভেঙে গেলেও দাঁড়িয়েছেন একে অন্যের পাশে।
পশ্চিম চাঁপাছড়ির ভেল্লাপাড়ায় গিয়ে জানা গেল, মোক্তার ও তার ভাইয়ের ঘরটি আর নেই। পানির তোড়ে ভেঙে পড়েছে পুরোপুরি। একই দুর্ভাগ্য নেমে এসেছে উত্তর বাহারছড়ার দিঘীরপাড়ায়ও। এই এলাকার আবছার, জাফর, জামাল ও ফোরকানের মাটির ঘরও ভেঙে গেছে বানের পানিতে। একসময় যেখানে ছিল তাদের সংসার, এখন সেখানে শুধু কাদামাটি আর ভাঙা দেয়ালের চিহ্ন।
এ ছাড়া মুরগির ফার্মগুলো শূন্য। মুরগি ভেসে গেছে। অনেক গৃহপালিত পশু মারা গেছে। অনেকের ভেসে গেছে হাঁস-মুরগি। এই ছয় এলাকার প্রতিটি দৃশ্যই যেন একে অন্যের প্রতিচ্ছবি— থইথই পানি, ডুবে থাকা ঘরবাড়ি ও স্কুল। আর তার মধ্যদিয়ে বেঁচে থাকার জন্য মানুষের কঠিন সংগ্রাম।
বান্দরবান বিচ্ছিন্ন: বান্দরবানে বন্যার চরম অবনতি হয়েছে, লাগাতার বৃষ্টি ও ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে প্রধান সড়কসহ বিভিন্ন সংযোগ সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় বান্দরবান জেলা শহর কার্যত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। অন্য উপজেলাগুলোরও অনুরূপ অবস্থা; তাই সড়কপথে যোগাযোগের সুযোগ নেই কক্সবাজারের সঙ্গেও। রাঙ্গুনিয়ার পদুয়া ইউনিয়নের দুধপুকুরিয়া এলাকায় ব্রিজঘাট সেতুটি ধসে পড়ে জেলার সঙ্গে বন্ধ রয়েছে যোগাযোগ। এ ছাড়া আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস ও এমডিএস পয়েন্টসংলগ্ন সড়কে প্রায় চার ফুট পানি ওঠায় বান্দরবানের সঙ্গে রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির সড়ক যোগাযোগ বন্ধ। বান্দরবান-রোয়াংছড়ি সড়কের প্রবেশমুখে বেইলি সেতু পুরোপুরি তলিয়ে যাওয়ায় উপজেলা সদরের সঙ্গে জেলা শহরের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। বান্দরবান শহরসংলগ্ন প্যাপদা সেতু প্রায় তিন ফুট পানির নিচে থাকায় রুমা ও থানচি উপজেলার সঙ্গে জেলা সদরের সড়ক যোগাযোগ বন্ধ।
২০২৪ সালের বন্যায় ডুবেছিল ফেনী, আর সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ। এবার চট্টগ্রামের বন্যার্তদের পাশে দাঁড়িয়েছেন ফেনী জেলা স্বেচ্ছাসেবক পরিবারের অন্তর্ভুক্ত সংগঠন ছাড়াও জেলার অন্তত ২৫ সংগঠনের স্বেচ্ছাসেবীরা।
রাঙামাটির বিলাইছড়ি উপজেলার সীমান্তবর্তী দুর্গম ফারুয়া বাজার তিন-চার দিনের ব্যবধানে আবার পুরোটা পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে বাজারের দেড়শ দোকান পুরোপুরি পানিতে নিমজ্জিত। উপজেলার পূর্বে ভারতের মিজোরাম থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল রাইংক্ষ্যং নদীর পানি বেড়ে ডুবে গেছে ঐতিহ্যবাহী ফারুয়া বাজার। শুধু ফারুয়া বাজার নয়; চাইন্দ্যা, উলুছড়ি, তত্তানালা, একগুজ্জাছড়ি, গোইয়ানছড়ি, শুক্কুরছড়ি, যমুনাছড়িসহ সবকটি এলাকা এখন সম্পূর্ণ পানির নিচে।
কক্সবাজারের টেকনাফের যেন দ্বিমুখী সংকট। একদিকে টানা ভারী বর্ষণ, অন্যদিকে সমুদ্রের গর্জন। দুইয়ে মিলে সেন্টমার্টিন দ্বীপে বন্যার আশঙ্কার পাশাপাশি টেকনাফে অন্য এলাকায় বিপদে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। বন্ধ রয়েছে সব ধরনের নৌযান চলাচলও। কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে দ্বীপের ১০ হাজারের বেশি বাসিন্দা।
তবে কক্সবাজারের চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলায় বৃষ্টি থামায় নামতে শুরু করেছে বন্যার পানি। তবে গতি খুবই ধীর। দুই উপজেলার শতাধিক গ্রাম থেকে পানি নামছে বলে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে। এখনো ঊর্ধ্বমুখী দুর্গত মানুষের দুর্ভোগ।
হবিগঞ্জে শিশুর মৃত্যু, ভেসে গেল ১১০০ খামারের মাছ: হবিগঞ্জের লাখাইয়ের রুহিতনশি গ্রামে নানাবাড়িতে বেড়াতে এসে বানের পানিতে প্রাণ গেছে ইতালি প্রবাসী বাপ্পি আহমেদের মেয়ে আরিশা আমেনার। এ ছাড়া তিন উপজেলায় বসতবাড়ির পাশাপাশি অন্তত ১ হাজার ১০০টি মাছের খামার ও ব্যক্তিগত পুকুর প্লাবিত হয়ে ভেসে গেছে মাছ। এতে খামারিদের ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৯৫ কোটি টাকার। সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন বাহুবল, হবিগঞ্জ সদর ও মাধবপুর উপজেলার চাষিরা। তবে মৌলভীবাজারের কিছু কিছু এলাকায় নামছে পানি, ভেসে উঠছে ক্ষত।
এ ছাড়া সিলেটের বিয়ানীবাজারে কুশিয়ারা নদীতে বিলীন বসতভিটা ও রাস্তাঘাট। নতুন করে ভাঙনের মুখে মসজিদ ও বিদ্যালয়! মাদারীপুরেও বাড়ছে বন্যার ঝুঁকি। সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় আড়িয়াল খাঁ নদীর তীব্র ভাঙন প্রতিরোধে শুরু হয়েছে জিওব্যাগ ডাম্পিং কার্যক্রম।
বান্দরবানে পানিবন্দি ১২২ পরিবারকে উদ্ধার বিজিবির: টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও আকস্মিক বন্যায় বান্দরবান শহরের পার্শ্ববর্তী এলাকায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে বাস্তুহারা হয়ে পড়েছে অনেক পরিবার। তাদের মধ্যে ১২২টি পরিবারকে নিরাপদে উদ্ধার ও মানবিক সহায়তা করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।
গতকাল শনিবার বিকালে বিজিবি সদর দপ্তর থেকে পাঠানো এক বার্তায় নিশ্চিত করা হয়েছে এ তথ্য।
সংস্থাটি জানিয়েছে, শুক্রবার রাত থেকেই বিজিবি বান্দরবান পানিবন্দি মানুষকে উদ্ধার অভিযানে নামে বিজিবি। এ সময় বান্দরবান জেলা সদরের পার্শ্ববর্তী ক্রাইক্ষ্যংপাড়া এলাকা থেকে ১২২টি পরিবারকে নিরাপদে উদ্ধার করে তারা।
তাদের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে শহীদ মোশাররফ বিজিবি স্কুল এবং ক্রাইক্ষংপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এ ছাড়া দুর্গতদের জন্য ব্যবস্থা করেছে খাবার, বিশুদ্ধ পানি, জরুরি ওষুধ এবং অস্থায়ী আবাসনের। তাদের মধ্যে নারী, শিশু, প্রবীণ ও অসুস্থ ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার অফিস ও প্রতিনিধিরা




