শিবচরে মালচিং প্রযুক্তিতে বাড়ছে সবজি চাষ

ছবি: আগামীর সময়
মাদারীপুরের শিবচর উপজেলায় দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব মালচিং প্রযুক্তিতে সবজি চাষ। উৎপাদন খরচ কম, সেচ ও কীটনাশকের ব্যবহার তুলনামূলক কম এবং ফলন বেশি হওয়ায় কৃষকরা প্রচলিত পদ্ধতির পরিবর্তে এ প্রযুক্তিনির্ভর চাষে ঝুঁকছেন।
নিরাপদ সবজি উৎপাদনের পাশাপাশি এ খাতে নতুন উদ্যোক্তা হিসেবে যুক্ত হচ্ছেন শিক্ষিত তরুণরাও।
সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, জমিতে সারিবদ্ধ বেড তৈরি করে বিশেষ ধরনের মালচিং পেপার বা প্লাস্টিক শিট বিছিয়ে নির্দিষ্ট দূরত্বে ছিদ্র করে বীজ বা চারা রোপণ করছেন কৃষকরা। বর্তমানে শসা, করলা, মরিচ, লাউ, টমেটো, ঢেঁড়স ও ধুন্দলসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ হচ্ছে এ পদ্ধতিতে।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে শিবচরে প্রায় ২০০ বিঘা জমিতে মালচিং প্রযুক্তির মাধ্যমে চাষ হচ্ছে সবজি। এর মধ্যে শসা, করলা ও মরিচের চাষে এ প্রযুক্তির ব্যবহার সবচেয়ে বেশি। কৃষি বিভাগ নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তার মাধ্যমে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে উৎসাহিত করছে কৃষকদের।
কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মালচিং প্রযুক্তি চীন, জাপানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত একটি আধুনিক কৃষি পদ্ধতি। এতে জমির আর্দ্রতা দীর্ঘ সময় বজায় থাকে, আগাছা কম জন্মায় এবং রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণও কমে যায় অনেকাংশে। ফলে সেচ, সার ও কীটনাশকের ব্যবহারে কমে উৎপাদন ব্যয়।
কৃষকরা জানান, মালচিং পদ্ধতিতে প্রথমবার বেড তৈরিতে কিছুটা বেশি খরচ হলেও একই বেডে তিন থেকে চার দফা ফসল উৎপাদন করা যায়। এ ছাড়া প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় ১০ থেকে ১৫ দিন আগেই ফসল বাজারজাত করা সম্ভব হয়। মৌসুমের শুরুতেই ভালো দাম পাওয়ায় লাভও বেশি হয়।
কাদিরপুর এলাকার কৃষক শাহিন মিয়া বলেছেন, ইউটিউবে মালচিং প্রযুক্তি দেখে প্রথমে এক বিঘা জমিতে শুরু করেন শসার চাষ। প্রথম মৌসুমেই প্রায় দেড়শ মণ শসা বিক্রি করে লাভবান হন। পরে তিনি ২০ বিঘা জমিতে শসা, করলা, মরিচ ও লাউসহ সম্প্রসারণ করেছেন বিভিন্ন সবজির চাষ।
কুতুবপুর ইউনিয়নের কৃষক শওকত গাছি বলেছেন, শখেরবশে শসা ও মরিচ চাষের মাধ্যমে ব্যবহার শুরু করেছিলেন মালচিং প্রযুক্তির। প্লাস্টিক মালচিং পেপার ব্যবহারের ফলে আগাছা জন্মায় না, মাটির আর্দ্রতা বজায় থাকে এবং সেচ ও অপচয় কমে সারের। পরিচর্যা সহজ হওয়ায় বেড়েছে উৎপাদন ও লাভ দুটোই। তার সাফল্য দেখে এলাকার অনেক শিক্ষিত তরুণ এখন আগ্রহী হচ্ছেন এ প্রযুক্তিতে সবজি চাষে।
কাঁঠালবাড়ি ইউনিয়নের কৃষক রাজা মিয়ার ভাষ্য, মালচিং প্রযুক্তিতে পোকামাকড়ের আক্রমণ কম হওয়ায় কমে গেছে কীটনাশকের ব্যবহারও। ফলে উৎপাদিত সবজি অনেকটা নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত হচ্ছে।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, মালচিং প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বিস্তৃত হলে উৎপাদন ব্যয় কমবে, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন বাড়বে এবং আয় বৃদ্ধি পাবে কৃষকের। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পানি সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব এ প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে দেশের টেকসই কৃষি ব্যবস্থায়।
শিবচর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আলিমুজ্জামান বলেছেন, মালচিং প্রযুক্তি কৃষিতে একটি যুগোপযোগী, লাভজনক ও পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি। এতে উৎপাদন ব্যয় কমে, ফলন বাড়ে এবং পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাবও কম পড়ে। বর্তমানে বায়োডিগ্রেডেবল মালচিং পেপারের ব্যবহার শুরু হয়েছে, যা মাটির সঙ্গে মিশে জৈব উপাদানে পরিণত হয়।
তিনি জানান, মালচিং ও অংশীদারিত্বভিত্তিক চাষ পদ্ধতির মাধ্যমে একই জমিতে সারা বছর নিরাপদ ও লাভজনক ফসল উৎপাদনে কাজ করছে কৃষি বিভাগ। পাশাপাশি সফল কৃষকদের অনুসরণ করে শিক্ষিত বেকার যুবকদের কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে নেওয়া হয়েছে বিভিন্ন উদ্যোগ।





