রায়পুরায় বিরোধের আগুনে জ্বলছে নিলক্ষা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
মেঘনা নদীবিধৌত নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার দুর্গম চরাঞ্চল নিলক্ষা। একসময় মাছ ধরার টেঁটা ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে শুরু হওয়া গোষ্ঠীগত বিরোধ এখন রূপ নিয়েছে আগ্নেয়াস্ত্রের সংঘাতে। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের এ দ্বন্দ্বে প্রাণহানি, বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ ও বাস্তুচ্যুতির ঘটনা ঘটছে। সংঘাতের কারণে ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষা কার্যক্রম, আর নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
স্থানীয় সূত্র বলছে, সম্প্রতি নিলক্ষায় স্থানীয় ইউপি মেম্বার নাজিম উদ্দিন ও আলাল মুন্সীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ ভয়াবহ রূপ নেয়। দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ, বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ ও হতাহতের ঘটনা ঘটে।
নিলক্ষা ইউনিয়নের বিট পুলিশের দায়িত্ব থাকা এসআই জয় পালের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ১৬ জুন আলাল মুন্সী ও নাজিম উদ্দিনের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষে আলাল মুন্সীর তিন সমর্থক ও নাজিম উদ্দিনের দুই সমর্থক নিহত হয়েছিলেন। এ ছাড়া গুলিবিদ্ধসহ আহত হয়েছিলেন অর্ধশতাধিক মানুষ। এ ঘটনায় থানায় দুটি হত্যা মামলা এবং আদালতে আরও দুটি মামলা করা হয়েছিল।
এসআই জয় পালের ভাষ্য, মূলত ওই ঘটনার পর থেকেই এলাকায় দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছিল। এরই ধারাবাহিকতায় গত ১১ অক্টোবর ভোরে নাজিম উদ্দিনের সমর্থকরা আলাল মুন্সীর সমর্থকদের ওপর হামলা চালায়। তবে পাল্টা হামলা না হওয়ায় সে ঘটনায় কেউ হতাহত হয়নি। সর্বশেষ ১২ অক্টোবর সকালে আলাল মুন্সীর সমর্থকরা নাজিম উদ্দিনের সমর্থকদের তিন-চারটি বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। এরপর থেকেই এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত পুলিশের টহল জোরদার করা হয়েছে। বর্তমানে ১০ জন পুলিশ সদস্য ওই এলাকায় নিয়মিত টহল দিচ্ছেন।
নিলক্ষায় সংঘাতের প্রভাব শুধু হতাহত ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতিতে সীমাবদ্ধ নয়। কোনো পক্ষ সংঘর্ষে পরাজিত হলে সেই পক্ষের সমর্থকদের দীর্ঘদিনের জন্য এলাকা ছাড়তে হয় বলে স্থানীয়ভাবে জানা গেছে। ফলে নিরাপত্তাহীনতার পাশাপাশি স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও সামাজিক সম্পর্কেও সৃষ্টি হচ্ছে দীর্ঘস্থায়ী সংকট।
নিলক্ষা ইউনিয়নে রয়েছে ১৪টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও দুটি উচ্চবিদ্যালয়। কিন্তু গোষ্ঠীগত বিরোধের কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রম বারবার বিঘ্নিত হচ্ছে। নিলক্ষা সব্দর আলী উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. নজরুল ইসলামের ভাষায়, শুধু পুলিশের টহল বাড়িয়ে এই দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতা বন্ধ করা। নিলক্ষার মানুষ চান, অস্ত্রের পরিবর্তে তাদের সন্তানদের হাতে বই-খাতা উঠুক। তার মতে, এজন্য সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি সমন্বিত প্রশাসনিক উদ্যোগ প্রয়োজন।
স্থানীয় ইউপি সদস্য নাজিম উদ্দিন বললেন, ‘গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব নিরসনে স্থানীয় অনেক নেতা চেষ্টা করলেও কিছু স্বার্থান্বেষী মহলের কারণে সেই উদ্যোগ সফল হচ্ছে না।’ তিনিও এলাকায় স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।
এদিকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশি তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে রায়পুরা থানা-পুলিশ। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মুজিবুর রহমানের ভাষ্য, চরাঞ্চলে শান্তি বজায় রাখতে নজরদারি ও টহল জোরদার করা হয়েছে। অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে অভিযানও চলছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাসুদ রানা জানিয়েছেন, চরাঞ্চলে দীর্ঘদিনের গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব নিরসনে তিনি দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই প্রশাসন কাজ করছে। টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠায় স্থানীয় বাসিন্দাদের সম্পৃক্ত করে দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
চরাঞ্চলের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে নরসিংদী-৫ আসনের সংসদ সদস্য প্রকৌশলী আশরাফ উদ্দিন বকুলের ভাষ্য, নিলক্ষাসহ রায়পুরার চরাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক রাখতে সরকারের উচ্চপর্যায়ে যোগাযোগ করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে অতিরিক্ত পুলিশ এবং প্রয়োজনীয় অস্ত্র বরাদ্দের অনুরোধও জানানো হয়েছে।



