১১ কোটি টাকা ব্যয়েও মিলছে না এক ফোঁটা পানি

উলিপুর পৌর এলাকায় বসানো পানির পাম্প
কুড়িগ্রামের উলিপুর পৌর শহরে চারটি চকচকে আধুনিক পানির পাম্প দাঁড়িয়ে আছে বহু বছর ধরে। দেখলে মনে হবে, এগুলো আধুনিক নগরসেবার প্রতীক। প্রতিদিন হাজারো মানুষের বিশুদ্ধ পানির চাহিদা পূরণ করছে।
কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। পাম্প হাউজগুলো দীর্ঘদিন ধরে তালাবদ্ধ। ভেতরের যন্ত্রপাতিতে জমেছে ধুলোবালি, পাইপে ধরেছে মরিচা এবং আশপাশের এলাকা ভরে গেছে ঝোপ-জঙ্গলে। প্রায় চার বছর ধরে অব্যবহৃত পড়ে থাকা এসব স্থাপনা এখন একটি ব্যর্থ পানি সরবরাহ প্রকল্পের প্রতিচ্ছবি।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, পৌরবাসীর বিশুদ্ধ ও নিরাপদ পানির সংকট নিরসনে ‘বাংলাদেশের ২৩টি পৌরসভার পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন প্রকল্প’-এর আওতায় প্রায় ১১ কোটি টাকা ব্যয়ে উলিপুরে পানি সরবরাহ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। প্রকল্পে যৌথভাবে অর্থায়ন করে সৌদি আরব ও ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইডিবি)।
প্রকল্পের আওতায় চারটি পাম্প হাউজ নির্মাণ এবং ৩৩ কিলোমিটার পাইপলাইন স্থাপন করা হলেও আজও পানি সরবরাহ কার্যক্রম চালু হয়নি। ফলে যে প্রকল্পের মাধ্যমে পৌরবাসীর নিরাপদ পানির চাহিদা পূরণের কথা ছিল, সেটিই এখন উন্নয়ন পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে চারটি পানির পাম্প নির্মাণ এবং প্রায় ৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ৩৩ কিলোমিটার পাইপলাইন বসানো হয়। এ প্রকল্পের মাধ্যমে ২ হাজার ৬৫০টি পরিবারকে পানি সরবরাহের আওতায় আনার পরিকল্পনা ছিল।
কুড়িগ্রামের মেসার্স আদিল এন্টারপ্রাইজ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ২০২২ সালে প্রকল্পের কাজ শুরু করে এবং ২০২৩ সালে কাজ শেষ করে। তবে অভিযোগ রয়েছে, নিম্নমানের ও ত্রুটিপূর্ণ কাজের কারণে পাম্প চালু করলেই পাইপলাইনে লিকেজ দেখা দেয়। এ কারণে এখনো জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি প্রকল্পটি।
এদিকে, প্রায় ৭০০ বাড়িতে পানির সংযোগ দেওয়া হলেও তারা আজ পর্যন্ত এক ফোঁটা পানিও পাননি। ফলে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পরও প্রকল্পের সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন পৌরবাসী। প্রায় ১১ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই প্রকল্প কবে চালু হবে এবং পৌরবাসী কবে এর সুফল পাবেন—এ প্রশ্ন স্থানীয়দের।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্প বাস্তবায়নের শুরু থেকেই ছিল অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা। নিম্নমানের কাজ ও দায়িত্বশীলদের গাফিলতির কারণে বিপুল অর্থের বিনিয়োগ কার্যকর সেবায় পরিণত হয়নি।
পৌরসভার নারিকেলবাড়ী খামার এলাকার বাসিন্দা মো. কামরুজ্জামান বলেন, ‘এত কোটি টাকা ব্যয় হলেও মানুষ এক ফোঁটা পানিও পেল না। বিষয়টি তদন্ত করে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত।’
জোদ্দারপাড়া এলাকার বাসিন্দা তপন কুমার রায় বলেন, ‘ভালো পানির আশায় ১০০ টাকা দিয়ে আবেদন করেছিলাম। বাড়িতে সংযোগের পাইপও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু চার বছরে কোনো পানি পাইনি।’
উলিপুর পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাহবুবুল আলম বলেন, ‘প্রকল্পে ব্যবহৃত পাইপগুলোতে কিছু সমস্যা দেখা দিয়েছে। এ অবস্থায় প্রকল্পটি হস্তান্তর করা হলে তা পৌরসভার জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।’
উলিপুর জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আশরাফুল আলম বলেন, ‘পাইপলাইনে বেশ কিছু ত্রুটি রয়েছে। ত্রুটিমুক্ত না হওয়া পর্যন্ত প্রকল্পটি হস্তান্তর নেওয়া হবে না। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সমস্যা সমাধানে কাজ করছে।’
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স আদিল এন্টারপ্রাইজের প্রোপাইটর আমিনুর রহমান বলেন, ‘ত্রুটিগুলো প্রায় ঠিক করা হয়েছে। দ্রুত বাকি কাজ শেষ করে প্রকল্প হস্তান্তর করা হবে।’
নিম্নমানের কাজের অভিযোগ সঠিক নয় বলে দাবি করে তিনি বলেন, ‘অনেক সময় স্থানীয়রা বিভিন্ন কাজ করতে গিয়ে পাইপলাইন কেটে ফেলেন।’
এ বিষয়ে উলিপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক এ টি এম আরিফ বলেন, ‘জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’





