মাদারীপুর
প্রধান শিক্ষকহীন ৪০১ স্কুলে ভারপ্রাপ্তের কাঁধে দপ্তর ও ক্লাস

মাদারীপুর পৌর অফিস সংলগ্ন মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ছবি: আগামীর সময়
মাদারীপুরের অর্ধেকের বেশি বিদ্যালয় চলছে প্রধান শিক্ষক ছাড়াই। জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষকেরা ভারপ্রাপ্ত হিসেবে কাঁধে নিয়েছেন প্রশাসনিক দায়িত্ব। দাপ্তরিক কাজের চাপে শ্রেণিকক্ষে পাঠদানে পর্যাপ্ত সময় দিচ্ছেন না তারা।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয় জানিয়েছে, পাঁচ উপজেলার ৭২০টি স্কুলের মধ্যে প্রধান শিক্ষক নেই ৪০১টিতে। এতে স্কুলগুলোর একাডেমিক তদারকি ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে তৈরি হয়েছে নেতৃত্বের ঘাটতি। এর প্রভাব পড়ছে পাঠদানে, বলছেন শিক্ষক ও অভিভাবকরা।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য, সদর উপজেলায় ১১০টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৯২টিতে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। কালকিনিতে ৮০টির মধ্যে ৬৮টি, রাজৈরে ৭২টির মধ্যে ৬৬টি, শিবচরে ১০৪টির মধ্যে ৭৮টি এবং ডাসারে ৩৩টির মধ্যে ১৯টি বিদ্যালয়ে নেই প্রধান শিক্ষক।
সদর উপজেলার মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, কোনো শিক্ষক ক্লাস নিচ্ছেন, আবার কেউ ব্যস্ত দাপ্তরিক কাজে। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক জীবন নাহার আখিও ক্লাস নেওয়ার ফাঁকে প্রশাসনিক কাজ সামলাচ্ছিলেন।
তিনি জানিয়েছেন, ২০২৪ সাল থেকে জ্যেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন। কাজের চাপ বেড়ে যাওয়ায় আগের মতো নিয়মিত ক্লাসে সময় দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
একই উপজেলার রাস্তি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির এক ছাত্র জানিয়েছে, অনেক সময় একজন শিক্ষককে একই সময়ে দুটি ক্লাস সামলাতে হয়। দেখা যায়, একটি ক্লাস শেষ না হতেই তিনি অন্যটিতে চলে যান।
পঞ্চম শ্রেণির আরেক শিক্ষার্থীর ভাষ্য, প্রায় দেড় বছর ধরে তাদের বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই। তিনজন শিক্ষককে অনেকটা টানাটানি করে ক্লাস নিতে হয়।
শিক্ষক স্বল্পতার কারণে সন্তানদের পড়াশোনায় কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হচ্ছে না বলে অভিযোগ অভিভাবকদের।
তাদের একজন আলমগীর মোল্লা বলছেন, ‘একটি বিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকেন প্রধান শিক্ষক। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের তদারকি, নথিপত্র সংরক্ষণ, অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সরকারি দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয়, এসব নানা দায়িত্ব তাকে পালন করতে হয়। প্রধান শিক্ষক না থাকলে এসব দায়িত্ব সহকারী শিক্ষকের ওপর বর্তায়। এতে ক্লাসে শিক্ষকসংখ্যা কমে যায়, পড়াশোনায় ব্যাঘাত হয়।’
আরেক অভিভাবক মেরিনা বেগমের কথা, ক্লাস ঠিকমতো না হওয়ায় পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছে তার সন্তান। এখন তাকে বাড়িতে আলাদা করে পড়াতে হচ্ছে। পরিস্থিতির পরিবর্তন না হলে সন্তানকে অন্য বিদ্যালয়ে ভর্তি করার কথাও ভাবছেন তিনি।
বিদ্যালয়ের নেতৃত্ব ও শিক্ষার মান ধরে রাখতে প্রধান শিক্ষকের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন ডাসারের গোপালপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সোবহান খান। এই পদ শূন্য থাকলে প্রশাসনিক তদারকি, শিক্ষক ব্যবস্থাপনা ও একাডেমিক কার্যক্রমে সমন্বয়ের ঘাটতি দেখা দেয়। একসঙ্গে ক্লাস ও প্রশাসনিক কাজ সামলাতে গিয়ে অনেক সময় সিদ্ধান্ত নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। এসব বলছিলেন সোবহান।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে শিবচর ও রাজৈর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শিক্ষক নিয়োগের প্রশাসনিক জটিলতা, নিয়োগ পরীক্ষায় বিলম্ব এবং পদোন্নতির ধীরগতির কারণে প্রধান শিক্ষক সংকট দীর্ঘায়িত হচ্ছে।
জেলার বিদ্যালয়গুলোতে শুধু প্রধান শিক্ষক নয়, শূন্য আছে ২৩৫টি সহকারী শিক্ষকের পদও। এ তথ্য জানিয়ে মাদারীপুর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. ফজলে এলাহী বললেন, শূন্য পদ পূরণে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
জেলা প্রশাসক মর্জিনা আক্তার জানিয়েছেন, প্রধান শিক্ষক সংকটের বিষয়টি তিনি জেনেছেন। সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জনবলসংকট কীভাবে কমানো যায়, তা খতিয়ে দেখবেন- জানালেন তিনি।







