বগুড়ার আবর্জনায় কালো করতোয়া

বগুড়া সিটি করপোরেশনের আবর্জনায় করতোয়ার পানি কালো হয়ে গেছে। ছবি: আগামীর সময়
একসময় রান্না থেকে শুরু করে গৃহস্থালির নানা কাজে করতোয়ার পানি ব্যবহার করতেন বগুড়া সদরের বাঘোপাড়া মহিষবাথান গ্রামের মানুষ। এখন সেই নদীর পাড়ে দাঁড়ানোই দায়। নদীর পানিতে মিশছে আবর্জনা। ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ। কালো হয়ে গেছে পানির রঙ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বগুড়া সিটি করপোরেশনের প্রতিদিনের বিপুল পরিমাণ বর্জ্য নদীর পাড়ের খোলা জায়গায় ফেলার পাশাপাশি ঠেলে দেওয়া হচ্ছে নদীতেও।
সম্প্রতি বাঘোপাড়া মহিষবাথান এলাকায় করতোয়া নদীর পাড়ে গিয়ে দেখা যায়, সিটি করপোরেশনের বর্জ্যবাহী ট্রাকে করে আবর্জনা এনে সেখানে ফেলা হচ্ছে। পরে এসকেভেটর ও ডোজারের সাহায্যে সেসব আবর্জনা নদীর পাড়ের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। এতে কিছু বর্জ্য সরাসরি নদীতে গিয়ে পড়ছে। নদীর পানি ও আবর্জনা মিশে ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ। পানির রঙও কালচে হয়ে গেছে।
বগুড়া সিটি করপোরেশনের প্রতিদিন প্রায় ২০০ টন বর্জ্য ওই ভাগাড়ে ফেলা হয় বলে জানালেন স্থানীয়রা।
ট্রাকচালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২৪টি ট্রাকে করে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত এসব বর্জ্য সেখানে নেওয়া হয়।
মহিষাবাথান গ্রামের প্রায় ৬০ বছরের বাসিন্দা আব্দুল বারী জানালেন, একসময় এই নদীর পানি পানসহ গৃহস্থালির বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করতেন। তখন এলাকায় এত টিউবওয়েলও ছিল না। এখন নদীর পানি ব্যবহার তো দূরের কথা, দুর্গন্ধের কারণে নদীর কাছেও যাওয়া যায় না।
স্থানীয় বাসিন্দা জহুরা বললেন, কয়েক বছর আগে পাশের আরেকটি জায়গায় একইভাবে পৌরসভার বর্জ্য ফেলা শুরু হয়েছিল। ওই জায়গা ভরাট হওয়ার পর এখন নদীর এই পাশে বর্জ্য ফেলা হচ্ছে।
একসময় নদীর পানিতে জমি থেকে তোলা শাকসবজি ধুয়ে রান্না করতেন এবং নিজেরাও এ পানি পান করেছেন। এখন দুর্গন্ধে ঘরেও থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে— যোগ করলেন তিনি।
স্থানীয় যুবক শ্যামল জানিয়েছেন, নদীতে বর্জ্য ফেলার কারণে এলাকার মানুষের ভোগান্তি বেড়েছে। আগে অনেকে এই নদীতে মাছ ধরে জীবিকা চালাতেন। কয়েক বছর ধরে নদীতে মাছও পাওয়া যাচ্ছে না। নদীর তলদেশে বর্জ্য জমে থাকায় জলজ প্রাণীও তেমন দেখা যায় না।
সরেজমিন সিটি করপোরেশনের কর্মচারী খোরশেদ আলমকে এসকেভেটর দিয়ে বর্জ্য নদীর পাড়ের দিকে ঠেলে দিতে দেখা যায়। তিনি জানালেন, তারা সরাসরি নদীতে বর্জ্য ফেলেন না। তবে এসকেভেটর দিয়ে বর্জ্য ঠেলার সময় কিছু অংশ নদীতে পড়ে যেতে পারে।
নদী বা জলাশয়ে বর্জ্য ফেলা আইনত নিষিদ্ধ। ২০২১ সালের কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালায় বর্জ্য সৃষ্টিকারী ও ব্যবহারকারীর জন্য নির্ধারিত পদ্ধতিতে বর্জ্য ফেলার নির্দেশনা রয়েছে। বর্জ্যের কোনো অংশ খোলা রাখার সুযোগ নেই। একই বিধিমালায় কঠিন বর্জ্য দিয়ে ভূমি ভরাটের স্থান নির্বাচনের ক্ষেত্রে পরিবেশগত প্রভাব নিরূপণের কথাও বলা হয়েছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের রাজশাহী বিভাগীয় কার্যালয় ২০২১ সালের ৫ ডিসেম্বর নদী রক্ষা কমিশনের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে নদীদূষণের একটি তালিকা তৈরি করেছিল। ওই তালিকায় তৎকালীন বগুড়া পৌরসভাকে করতোয়া নদী দূষণকারী হিসেবে উল্লেখ করে নোটিস দেওয়া হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, একাধিকবার নোটিস দেওয়ার পরও নদীর পাড়ে বর্জ্য ফেলা বন্ধ হয়নি।
পরিবেশ অধিদপ্তর বগুড়া কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মাহাথির বিন মোহাম্মদ জানিয়েছেন, বাঘোপাড়া এলাকার ভাগাড়টি তারা আগেও পরিদর্শন করেছেন। আবর্জনা পানির সঙ্গে মিশলে দুর্গন্ধ ছড়ায়। এখানেও একই ঘটনা ঘটছে। সম্প্রতি বগুড়া সিটি করপোরেশনের সভায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। খোলা জায়গায় বর্জ্য না রেখে নির্দিষ্ট ডাম্পিং ব্যবস্থা করার জন্য সিটি করপোরেশনকে বলা হয়েছে।
বগুড়া সিটি করপোরেশনের প্রশাসক এম আর ইসলাম স্বাধীন জানিয়েছেন, সিটি করপোরেশনের নিজস্ব কোনো ডাম্পিং স্টেশন বা ভাগাড় নেই। তারা জায়গা খুঁজছেন। বর্তমানে বেসরকারি সংস্থা টিএমএসএসের জায়গায় বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। সংস্থাটি যেখানে ফেলতে বলে, সেখানেই বর্জ্য ফেলা হয়। তবে বিষয়টি জানার পর তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মীদের সতর্ক করেছেন।




