আশ্রয়ণের ঘরে নির্ঘুম রাত

ছবি: আগামীর সময়
কেমন আছেন? জিজ্ঞাসা করতেই রাজ্যের ভয় আর শঙ্কার ছাপে মুখ মলিন হয়ে গেল শেফালী বেগমের। যে স্বপ্ন আর আশা নিয়ে পরিবার নিয়ে উঠেছিলেন প্রাপ্তির সঙ্গে তা না মেলায় পুরোপুরি হতাশ তিনি। যে ঘর পেয়ে দু’বেলা দু’মুঠো ভাত খেয়ে শান্তিতে ঘুমানোর আশা ছিল এখন সেই ঘর ঠিকই আছে তবে ঘুম নেই গোটা পরিবারের। চব্বিশের ৫ আগস্টের পর থেকে নিরাপত্তাহীনতায় এমন দিনাতিপাতের কথা জানান শেফালী।
বিগত সরকারের আশ্রয়ণ প্রকল্পের উদ্যোগের হাত ধরে নারায়ণগঞ্জের সদর উপজেলার ৮টি ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা থেকে গোগনগর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডে চর সৈয়দপুর এলাকায় তিনটি আশ্রয়ণ প্রকল্পে ১৫৬টি পরিবারকে ঘর দেওয়া হয়। গৃহহীন ও ছিন্নমূল পরিবারকে বিনামূল্যে ঘর ও জমি প্রদানের মাধ্যমে পুনর্বাসন করা মূল্য লক্ষ্য থাকলেও কর্মসংস্থানের অভাবে বেশিরভাগ পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তিই বেকার জীবনযাপন করছে।
মাদকসেবী, চোরের আনাগোনা বাড়ায় পরিবার নিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন এখানকার বাসিন্দারা। ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় ঘর থেকে পয়ঃনিষ্কাশনের কাজ করতে হয় নিজেদেরই বালতি দিয়ে। ফলে প্রতিটি পরিবারই স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে আছেন। রয়েছে গোসলখানারও সংকট।
চরসৈয়দপুর আহমদ আলীর ডক প্রজেক্ট-১ এ ৮০টি পরিবার, চকমাঠ প্রজেক্ট-২ এ ২৮টি এবং গোলচক্করের পশ্চিম পাশে প্রজেক্ট-৩ এ ৪৮টি পরিবার বসবাস করেন। প্রতিটি প্রজেক্টেই প্রধান সমস্যা চোরের। সময়-সুযোগ বুঝে প্রজেক্টের ভেতরের বাড়ির তার কেটে নিয়ে যায়, রাতে বাড়ে মাদকসেবীদের আনাগোনা। ভিন্ন এলাকা থেকে এসে এখানে বসতি গড়ায় উচ্চবাচ্য করলেই মারধর করতে তেড়ে আসেন তারা।
১ নম্বর প্রজেক্টের হ্যাপি আক্তার, লাভলী বেগম, মিজানের একটাই প্রশ্ন। আশ্রয় দিয়েছেন সরকার কিন্তু নিরাপত্তা দেবেন কে? চোরের উৎপাত এতো বেড়েছে কিছুই রাখা যায় না। চোর চিহ্নিত করতে পারলেও কিছু বললেই আক্রমণ করতে আসে। আমাদের তো ঘরের সঙ্গে সঙ্গে কর্মসংস্থান করার কথাও ছিল কিন্তু সেগুলোর কিছুই হয়নি।
আমির হোসেন জানান, ‘৫ আগস্টের পর অনেক ঘর বহিরাগতরা দখলে নিয়ে গিয়েছিল। পরে অবশ্য সেগুলো বরাদ্দ পাওয়া ব্যক্তিরা ফেরত পেয়েছেন। ড্রেনেজ সমস্যাটা ভয়াবহ। টয়লেট ঘরের ভেতরে থাকায় আর পয়ঃনিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় আমাদের মারাত্মক সমস্যা হচ্ছে।’
মনির হোসেন বলেন, ‘আমি ট্রাক চালাই। অভাবের সংসারে টিকতে না পেরে ছেলেটাকেও একটা হোসেয়ারীতে কাজে লাগিয়ে দিয়েছি। পড়াশোনা করানোর টাকার যোগান নেই।’
আক্কাস আলী জানান, আমি চলতে না পেরে ধারদেনা করে একটা চায়ের দোকান দিয়েছি প্রজেক্টের সঙ্গে। দোকানে কিছুই নাই তাও দুই তিনবার সাটার কেটেছে। আর ছোট একটা দোকান ৩০-৩৫ হাজার টাকা বাকি খেয়েছে বাইরের লোকজন। বাকি না দিলে মারতে আসে, আবার টাকাও দেয়না। খুব বেকায়দায় আছি।
চকমাঠের জায়েদা বেগম বলেন, ঘর থেকে কিছু সময়ের জন্য সবাই বাইরে গেলে চোরেরা দরজা, জানালা, তার খুলে নিয়ে যায়। ইউএনও স্যাররে গিয়ে বলে আসছি। পরে আমার ছেলে লোক ডেকে এনে জোড়াতালি দিয়ে এগুলো মেরামত করছে।
রুবিনা বেগম বলেন, ‘প্রজেক্টের চতুর্দিকে বাউন্ডারি দিয়ে দিলে নিরাপত্তা ঝুঁকি অনেক কমে যেত। কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করলে আমরা ভালোভাবে জীবনযাপন করতে পারতাম।’
নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম ফয়েজউদ্দিন বলেন, ‘সরেজমিনের এলাকায় কি কি সমস্যা রয়েছে তা চিহ্নিত করে রিপোর্ট দেওয়ার জন্য একটি টিমকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সেটি পেলেই আমরা ব্যবস্থা করব। বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনার কথা আমরা জানতে পেরেছি, তবে সেখানকার বাসিন্দারা আমাদের কাছে লিখিত অভিযোগ করেননি।’
নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানার ওসি সাজেদুর রহমান বলেন, ‘আশ্রয়ণকেন্দ্রে চুরি, নিরাপত্তাহীনতার বিষয়ে আমরা অবগত নই। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেব। উপজেলা থেকে আমাদের এখনো কিছু জানানো হয়নি।’
নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো.রায়হান কবির জানান, এখানে সরকার বিভিন্ন বিভাগ কাজ করছে, যেমন, সমাজসেবা, কৃষি অধিদপ্তর। সবজায়গাতেই কর্মসংস্থানের কথা বলা আছে। তাদের সকল অসুবিধা দেখভালের জন্য লোক রয়েছে।




