সম্পাদকীয়
নিরাপত্তাহীন শিশুস্বাস্থ্য

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
শিশুর সুস্বাস্থ্য, পুষ্টি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু পারিবারিক দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্রেরও সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব। অথচ দেশ এখন এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে হামে আক্রান্ত হয়ে বিপুলসংখ্যক শিশুর মৃত্যু ঘটেছে। চলতি বছর এ পর্যন্ত হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে ১ হাজার ৪৪ শিশুর মৃত্যুর খবর জানা গেছে। হামের উপসর্গ নিয়ে যেসব শিশু বর্তমানে অসুস্থ, তারা আবার অপুষ্টির শিকার। গতকাল বৃহস্পতিবার আগামীর সময়ে প্রকাশিত ‘হামের ধকল থেকে অপুষ্টির কবলে’ শীর্ষক প্রতিবেদন দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা, টিকাদান কর্মসূচি এবং শিশু পুষ্টি ব্যবস্থাপনার এক উদ্বেগজনক চিত্র সামনে এনেছে।
আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার একটি বড় দুর্বলতা হলো প্রতিরোধের চেয়ে প্রতিক্রিয়ার ওপর বেশি নির্ভরতা। রোগ ছড়িয়ে পড়ার পর তৎপরতা দেখা যায়; কিন্তু আগে থেকে ঝুঁকি মোকাবিলার উদ্যোগ অনেক সময় পর্যাপ্ত থাকে না। হামের প্রাদুর্ভাব, অপুষ্টির বিস্তার এবং শিশুমৃত্যুর ঘটনাগুলো তাই বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; এগুলো দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, সচেতনতার ঘাটতি এবং স্বাস্থ্যসেবার বৈষম্যের বহিঃপ্রকাশ।
হামকে অনেকেই সাধারণ শিশুরোগ বলে মনে করেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো— এটি এমন এক রোগ, যা শিশুর শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাকে দুর্বল করে দেয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চলমান হাম পরিস্থিতি শিশুদের পুষ্টি অবস্থার দ্রুত অবনতির অন্যতম কারণ।
প্রশ্ন হলো, এ অবস্থার দায় কার? একটি শিশুর মৃত্যু কিংবা অপুষ্টির দায় কি শুধু তার দরিদ্র পরিবারের? যখন একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগে শিশুরা আক্রান্ত হয়, যখন টিকাদানের আওতার বাইরে থেকে যায় হাজারো শিশু, যখন হামের সংক্রমণ বাড়ার পরও প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা যথাসময়ে নেওয়া হয় না, তখন দায় রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনাকেও নিতে হয়। কারণ, আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের যুগে হাম এমন কোনো রোগ নয়, যার বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধের ব্যবস্থা নেই।
বাংলাদেশ একসময় টিকাদান কর্মসূচির সাফল্যের জন্য বিশ্ব জুড়ে প্রশংসিত হয়েছিল। সেই দেশের বিভিন্ন এলাকায় আজ আবার হামের সংক্রমণ ও মৃত্যু উদ্বেগজনকভাবে আলোচনায় আসছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, চলতি বছরের হাম পরিস্থিতি গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ। এটি শুধু স্বাস্থ্য খাতের ব্যর্থতার প্রশ্ন নয়; এটি শিশু অধিকার রক্ষার প্রশ্নও।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, হাম ও অপুষ্টি একে অপরকে শক্তিশালী করে। অপুষ্ট শিশু সহজে হামে আক্রান্ত হয়, আবার হামে আক্রান্ত শিশু দ্রুত অপুষ্টিতে ভোগে। ফলে একটি ভয়ংকর দুষ্টচক্র তৈরি হয়। দেশের বহু পরিবার এখনো পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করতে সংগ্রাম করছে। এ বাস্তবতায় শিশুদের পুষ্টি সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে দেশের প্রতিটি শিশুকে শতভাগ টিকাদানের আওতায় আনতে হবে। হামপ্রবণ এলাকায় বিশেষ পুষ্টি সহায়তা কর্মসূচি চালু করা জরুরি। ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে শিশুদের নিয়মিত পুষ্টি পর্যবেক্ষণ জোরদার করতে হবে।
শিশুর মৃত্যু কোনো পরিসংখ্যান নয়; এটি একটি পরিবারের স্বপ্ন ভেঙে যাওয়া ও কান্নার নাম। অপুষ্টি কোনো সাধারণ স্বাস্থ্য সমস্যা নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই হামে আক্রান্ত হয়ে শিশুদের অপুষ্টির কবলে পড়া কিংবা প্রতিরোধযোগ্য কারণে মৃত্যুবরণ করা একটি সভ্য রাষ্ট্রের জন্য লজ্জার বিষয়। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আগামী দিনে এই মূল্য আরও ভয়াবহ হবে।



