চাহিদার অর্ধেক বিদ্যুৎ পাচ্ছে বরিশাল
- জনমনে ক্ষোভ, ভোগান্তি চরমে
- তিন উপজেলায় ৩০ শতাংশ বিদ্যুৎ সরবরাহ
- সন্ধ্যা থেকে পুরো রাত ভোগাচ্ছে নগরবাসীকে
- বিকল্প বিদ্যুৎ ব্যবস্থায়ও মিলছে না সমাধান

প্রতীকী ছবি
ঘন ঘন লোডশেডিং এর কবলে পড়ে বরিশালের বাসিন্দাদের ভোগান্তি আরো তীব্র হচ্ছে। বরিশাল মহানগরে তুলনামূলক কম সময় বিদ্যুৎ বিভ্রাট হলেও জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও গ্রামীণ এলাকায় দিনে-রাতে বারবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় জনজীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।
কোথাও কোথাও একে এক দফায় এক থেকে দুই ঘণ্টা, আবার কোনো এলাকায় দিনে সাত থেকে দশবার পর্যন্ত লোডশেডিং হওয়ার অভিযোগ করছেন বাসিন্দারা। সব থেকে বেশি লোডশেডিং হচ্ছে মুলাদী, হিজলা ও মেহেন্দিগঞ্জে। আর তাছাড়া সন্ধ্যা থেকে পুরো রাত বরিশাল নগরীতে বিদ্যুৎ মেলে না ঠিকমতো।
বিদ্যুৎ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চাহিদার তুলনায় প্রায় অর্ধেক বিদ্যুৎ প্রাপ্তি হওয়ায় বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্ভব হচ্ছে না সব সময়। তাই লোডশেডিং করে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয় বিভিন্ন উপজেলায়।
পাওয়ার গ্রিড উপকেন্দ্র বরিশালের নির্বাহী প্রকৌশলী আক্তারুজ্জামান পলাশ বলছিলেন, বরিশাল নগর ও জেলায় ১৮৫ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে, কিন্তু পাচ্ছি ১২২ মেগাওয়াট। চাহিদার থেকে ৬৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম পাওয়ার কারণে সঠিকভাবে গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্ভব হচ্ছে না।
বিদ্যুৎ বিভ্রাট সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন শিশু, বৃদ্ধ, রোগী, শিক্ষার্থী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। বিদ্যুৎ বিভ্রাটে ফ্রিজে সংরক্ষিত খাদ্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি আইসক্রিম, ঠাণ্ডা পানীয় ও খাদ্যপণ্যের ব্যবসায়ীরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
বরিশালের বাবুগঞ্জ, বাকেরগঞ্জ, উজিরপুর, মেহেন্দিগঞ্জ, মুলাদী, গৌরনদীসহ বিভিন্ন উপজেলার বাসিন্দাদের অভিযোগ দিনের পাশাপাশি গভীর রাতেও একাধিকবার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। ফলে স্বাভাবিক ঘুম ব্যাহত হচ্ছে এবং গরমে শিশু ও বয়স্কদের কষ্ট বেড়েছে।
বরিশাল নগরের নথুল্লাবাদ এলাকার বাসিন্দা মোস্তাফিজুর রহমান অভিযোগ করেন, বিল নেওয়ার সময় কম নেয় না কেউ। কিন্তু বিদ্যুৎ সরবরাহ সঠিক ভাবে করা হচ্ছে না। রাতের বেলা ঘুমোতে পর্যন্ত পারছি না লোডশেডিং এর কারণে। তাছাড়া আমাদের সন্তানদের পড়ালেখায় হচ্ছে ব্যাপক সমস্যা।
কাজীপাড়া এলাকার বাসিন্দা ফজলুল করিম বলছিলেন, ঘরে আইপিএস কিনে বিকল্প বিদ্যুৎ ব্যবস্থা করা হলেও কোনো কাজ হচ্ছে না। ব্যাটারি চার্জ হওয়ারই সময় পায় না লোড শেডিংয়ের কারণে। এমন ভোগান্তিতে সহসা পড়তে হয়নি আমাদের। আমার ঘরের বাচ্চা খুব ছোট, বিদ্যুৎ না থাকায় গরমে যে কি কষ্ট পোহাতে হয় সেটা আমরা বুঝি।
হিজলা উপজেলার বাসিন্দা আইয়ব আলী জানিয়েছেন, আমাদের উপজেলায় টানা ঘণ্টাখানেক বিদ্যুৎ থাকে, আবার চলে যায়। আসা যাওয়ার ওপরেই থাকে।
শিক্ষার্থীরাও বিপাকে পড়েছে। কয়েকজন শিক্ষার্থী জানান, সন্ধ্যার পর পড়াশোনার সময় ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় পরীক্ষার প্রস্তুতি ব্যাহত হচ্ছে।
বরিশাল নগরীর সিএন্ডবি রোড, হাতেম আলী কলেজ, শের ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, রুপাতলী, সাগরদি, আলেকান্দা, কালিজিরা এলাকাসহ আরও বেশ কয়েকটি এলাকা ওজোপাডিকো ১ এর আওতাধীন। এই এলাকায় কল কারখানা রয়েছে অনেকগুলো।
ওজোপাডিকো ১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মনজুল কুমার স্বর্ণকার জানিয়েছেন, বর্তমানে ৬০ থেকে ৬২ মেগাওয়াট চাহিদা থাকলেও ৩০ মেগাওয়াট পাওয়া যায়। অর্ধেক বিদ্যুৎ দিয়ে তো আর সমান তালে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব নয়। যে কারণে লোডশেডিংয়ের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সমানভাবে সরবরাহের চেষ্টা করা হয়।
নগরীর নথুল্লাবাদ, বিএম কলেজ, জেনারেল হাসপাতাল, সদর রোড, চকবাজার, গির্জা মহল্লা, বাজার রোড, পলাশপুর, কাউনিয়া, আমানতগঞ্জ, বিসিক, নতুন বাজার ও কবি জীবনানন্দ দাশ সড়কসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করে থাকে ওজোপাডিকো ২। এই বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের আওতায় ব্যবসায়িক এলাকা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা সব থেকে বেশি।
ওজোপাডিকো ২ এর উপ বিভাগীয় প্রকৌশলী সোহেল রানার ভাষ্য, পিক আওয়ারে ৮০ মেগাওয়াট চাহিদা থাকলেও বর্তমানে মিলছে ৫০ মেগাওয়াট। এতে ৬২ শতাংশ বিদ্যুৎ পাওয়া যায়। আর লোডশেডিং হচ্ছে ৩৮ শতাংশ। আমরা যে পরিমাণ বিদ্যুৎ পাচ্ছি, সেই ভাবেই তো সরবরাহ করছি। কম বিদ্যুৎ পেলে লোডশেডিং হওয়াটা তো স্বাভাবিক। লোডশেডিং না হলে তো সকলকে বিদ্যুৎ সেবার মধ্যে আনতে পারছি না।
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি ১ এর জেনারেল ম্যানেজার এ বি এম মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, আমাদের আওতায় বরিশাল জেলার বরিশাল সদর উপজেলা, মুলাদী, হিজলা ও মেহেন্দিগঞ্জ রয়েছে। এর মধ্যে মুলাদী, হিজলা ও মেহেন্দিগঞ্জে লোডশেডিং বেশি হয়।
চাহিদার ৩০ শতাংশ বিদ্যুৎ পায় এই তিন উপজেলার মানুষ। আমাদের আওতায় চার উপজেলায় চাহিদা থাকে ৫৬ মেগাওয়াটের মতো, কিন্তু পাচ্ছি ৪৬ মেগাওয়াটেরও কম। এর মধ্যে আবার ওই তিন উপজেলায় যে তার দিয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে তা পর্যাপ্ত লোড নিতে পারছে না, যে কারণে বেশি লোডশেডিং হচ্ছে।
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি ২ এর জেনারেল ম্যানেজার বিপুল কৃষ্ণ মণ্ডলের মন্তব্য, আমাদের আওতায় বাবুগঞ্জ, বানারীপাড়া, উজিরপুর, গৌরনদী ও আগৈলঝাড়া উপজেলা রয়েছে। এসব এলাকায় অন্যান্য এলাকার তুলনায় লোডশেডিং অনেকটাই কম। এখানেও চাহিদা রয়েছে ৫৬ মেগাওয়াটের মতো, সরবরাহ রয়েছে ৪৯ মেগাওয়াট।





