মাথায় ঝুলছে পরোয়ানা
পুলিশের খাতায় লাপাত্তা ছাত্রশক্তি নেতা আদালতে গিয়ে করলেন মামলা!
- আলোচিত সেই মামলায় মৃতরা ছাড়াও জমির বিবাদে পাঁচজনকে আসামির নতুন তথ্য
- মারজুক আব্দুল্লাহকে ডাকাত উল্লেখ করে আদালতে চার্জশিট জমা
- ডাকাতির হোতা হিসেবে গ্রেপ্তারদের জবানবন্দিতে নাম এসেছে ছাত্রশক্তির এই নেতার
- মারজুকের কর্মকাণ্ডে বিব্রত ও বিরক্তির কথা জানিয়ে পুলিশ বলছে দ্রুতই পড়বে ধরা

সুলতান খান ও মারজুক আব্দুল্লাহ (বাঁ থেকে)— সংগৃহীত
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ছাত্রসংগঠন ছাত্রশক্তির বরিশাল মহানগরের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মারজুক আব্দুল্লাহ। ডাকাতি মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানার হুলিয়া মাথায় নিয়ে দিব্যি তিনি ঘুরে বেড়াচ্ছেন বরিশাল নগরজুড়ে। যদিও পুলিশের ভাষ্য, খুঁজে না পাওয়ায় তার বিরুদ্ধে জারি হওয়া গ্রেপ্তারি পরোয়ানা যাচ্ছে না তামিল করা। অথচ এই মারজুক আব্দুল্লাহই গত বৃহস্পতিবার বরিশালের অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে গিয়ে আওয়ামী লীগের মৃত চার এবং বিএনপির জীবিত ছয় নেতাসহ কয়েকশ মানুষের বিরুদ্ধে ঠুকে দিয়েছেন নাশকতার মামলা।
আলোচিত এই মামলাকে মামলাবাজ চক্রের ‘মামলা বাণিজ্যের’ অংশ উল্লেখ করে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীরা। যার পেছনে মারজুক আব্দুল্লাহ ও তার মামা পরিচয়ধারী সুলতান খান নামে এক ব্যক্তির নেতৃত্বাধীন চক্রের তথ্য ওঠে এসেছে আগামীর সময়ের অনুসন্ধানে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বরিশাল মহানগরের সাবেক সমন্বয়ক এই মারজুক আব্দুল্লাহর বিষয়ে ওঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। তিনি নিজেই ডাকাতি মামলার পরোয়ানাভুক্ত আসামি। এমনই তথ্য জানালেন পটুয়াখালীর দুমকি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সেলিম আহম্মেদ। এই পুলিশ কর্মকর্তা বলছিলেন, মারজুক আব্দুল্লাহর বিরুদ্ধে দুমকি থানায় গত বছরের ৬ জুন হয় ডাকাতির একটি মামলা। সেই মামলার বাদী ওই থানারই এসআই নুরুজ্জামান।
মামলাটির এজাহারে উল্লেখ করা হয়, দুটি মোটরসাইকেলে করে বরিশাল থেকে পটুয়াখালীতে ডাকাতি করতে আসছিল একদল ডাকাত। এ সংবাদ পেয়ে পটুয়াখালীর পায়রা সেতুর টোল প্লাজায় পুলিশ তাদের ধাওয়া করে। অন্যরা পালিয়ে গেলেও ধরা পড়ে দুজন। তাদের কাছ থকে জব্দ করা হয় খেলনা পিস্তল, ইলেক্ট্রিক শক মেশিন ও একটি মোটরসাইকেল। ওই ডাকাত দলে ছিলেন মারজুক আব্দুল্লাহও। যদিও ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন তিনি।
ওসি আরও জানালেন, মামলার দুই মাস পরই ঘটনাস্থল থেকে গ্রেপ্তার শিপন হাওলাদার ও আব্দুল্লাহ আল মামুনসহ পালিয়ে যাওয়া মারজুক আব্দুল্লাহকে ডাকাত উল্লেখ করে আদালেতে জমা দেওয়া হয় অভিযোগপত্র (চার্জশিট)। গ্রেপ্তার দুজন দায় স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দিতে ওই ডাকাতি চেষ্টার মূল হোতা হিসেবে নাম বলেছেন মারজুক আব্দুল্লাহর। ওই মামলায় তিনি পলাতক। তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও রয়েছে। ২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর পটুয়াখালী সদর পুলিশ কোর্ট থেকে বরিশাল মেট্রোপলিটন কমিশনার কার্যালয়ে মারজুক আব্দুল্লাহর বিরুদ্ধে এ সংক্রান্ত ওয়ারেন্ট কপি পাঠানো হয়।
মারজুক আব্দুল্লাহর বাড়ি বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের কোতয়ালি মডেল থানা এলাকায়। তার বিরুদ্ধে আদালত থেকে জারি হওয়া গ্রেপ্তারি পরোয়ানা তামিলের জন্য কাগজপত্র পাঠানো হয়েছিল কোতয়ালি মডেল থানায়। সেই পরোয়ানা তামিল না হওয়ার কারণ জানতে চাইলে থানাটির ওসি মামুন উল ইসলাম বললেন, ‘মারজুকের কর্মকাণ্ডে পুলিশ বিব্রত। তার বিরুদ্ধে ডাকাতি মামলায় ওয়ারেন্ট আছে। তাকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় নিয়ে আসার চেষ্টা অব্যাহত। তবে তিনি গ্রেপ্তার আতঙ্কে গা ঢাকা দিয়েছেন।’
গা ঢাকা দেওয়া আসামি কীভাবে নিজেই বাদী হয়ে আদালতে গিয়ে মামলা করলেন এবং তাকে গ্রেপ্তার না করতে কোনো চাপ আছে কিনা জানতে চাইলে ওসি মামুন বললেন, ‘না, এ বিষয়ে কোনো প্রেশার নেই। এই ব্যক্তিকে নিয়ে আমরা খুবই বিরক্ত ও বিব্রত। পালিয়ে বেশিদিন থাকতে পারবে না। দ্রুত গ্রেপ্তার করা হবে। তাছাড়া তার প্রকাশ্যে থাকার ইনফরমেশন আমাদের কাছে ছিল না।’
ককটেল-হাতবোমা বিস্ফোরণ, আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে মহাসড়ক অবরোধ ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাসহ ২৪৮ জন। এতে বিনষ্ট হয়েছে দেশের শান্তি— এমনই অভিযোগ তুলে মামলা করেছেন মারজুক আব্দুল্লাহ। যে মামলার আসামির তালিকায় চারজন মৃত আওয়ামী লীগ নেতা ছাড়াও রয়েছে বিএনপির ছয় নেতার নাম। আলোচিত সেই মামলায় এবার মৃত ব্যক্তি ও বিএনপি নেতারা ছাড়াও জমি দখলে ব্যর্থ হয়ে পাঁচজনকে আসামি করার নতুন তথ্য মিলেছে। গত বৃহস্পতিবার করা এই মামলা আমলে নিয়ে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনারকে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন বিচারক এস এম শরীয়ত উল্লাহ।
মামলাটিতে ৯০ নম্বর আসামি করা হয়েছে গৌরনদীর ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মিশেল আল সাদিককে। তিনি আগামীর সময়কে বললেন, ‘বাকেরগঞ্জের কলসকাঠিতে আমার নানা বাড়ি। সেখানে ৬৬ শতাংশ জমি রয়েছে। জমিটি আমার নানা মৃত আব্দুস সালাম তালুকদারের বাবা মৃত সোবাহান তালুকদারের নামে রেজিস্ট্রি করা।’
এই ভূমি কর্মকর্তার ভাষ্য, ২০২৫ সালে একটি পক্ষ ওই জমির ৩৩ শতাংশ ওয়ারিশ সূত্রে নিজেদের দাবি করে আদালতে মামলা করে। এরপর বরিশাল নগরীর সিএন্ডবি রোড এলাকার বাসিন্দা সুলতান খান সেই ৩৩ শতাংশের জমির মালিকানার পাওয়ার অব অ্যাটর্নি তার কাছে রয়েছে বলে দাবি করেন। তবে কোনো কাগজপত্র দেখাতে পারেননি।
মিশেল আল সাদিক বলতে থাকেন, ‘আমার নানা বাড়িতে কেউ থাকে না। সেই সুযোগে গত বছরের শেষ দিকে সুলতান খান ৩৩ শতাংশ জমির ধান কেটে নিয়ে যায়। এ ঘটনায় থানায় অভিযোগ দেওয়া হয়। এ ঘটনায় এ বছরের জানুয়ারিতে বাকেরগঞ্জ থানায় একটি সালিশ বৈঠক হয়। সেখানে সুলতান, মারজুক ও ববিতাসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন। তারা সুবিধা করতে না পেরে আমাদের মামলায় ফাঁসানোর হুমকি দেয়।’
‘২৯ জুন রাত পৌনে ৮টার দিকে আমার ফোনে একটি কল আসে। ট্রুকলার অ্যাপে দেখি মারজুক আব্দুল্লাহ নাম। কিন্তু ফোন ধরার পর ওই ব্যক্তি নিজেকে সাংবাদিক সুমন সরদার হিসেবে পরিচয় দেন। বলেন, আমি নাকি বরিশালের সাবেক মেয়র সাদিক আব্দুল্লাহর ঘনিষ্ঠ অনুসারী। একটি মামলায় আমার নাম রয়েছে, নাম কাটতে হলে টাকা দিতে হবে। আমি গালাগাল করলে আমাকে মামলা দিয়ে দেখে নেওয়ার হুমকি দেন’— যোগ করেন মিশেল আল সাদিক।
মারজুক আব্দুল্লাহর করা আলোচিত মামলায় আসামি করা হয়েছে মিশেল আল সাদিকের মামা মাহামুদুল হাসানকেও। যদিও মিশেল আল সাদিকের দাবি, নাশকতার ওই মামলায় ঘটনার সময় হিসেবে যে দিনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সেদিন তার মামা মাহামুদুল হাসান দেশেই ছিলেন না। এক রাশ ক্ষোভ ঝেড়ে মিশেল আল সাদিক বললেন, ‘আমার মামা গার্মেন্ট ব্যবসায়ী। তাকে ৮৯ নম্বর আসামি করা হয়েছে। আমাদের জমির বর্গাচাষি হাবিব মোল্লাকে ৪৫ নম্বর, নাসির হাওলাদারকে ১২১ নম্বর ও তার ভাই আমাদের কেয়ারটেকার রাসেল হাওলাদারকে ২২৩ নম্বর আসামি করা হয়েছে।’
এই ভূমি কর্মকর্তার অভিযোগ, সুলতান খান ও মারজুক আব্দুল্লাহ একটি মামলাবাজ চক্রের সদস্য। সাংবাদিক পরিচয়ধারী এক ব্যক্তিসহ আরও কয়েকজন এই চক্রে জড়িত। এর আগেও তারা একাধিক মামলায় নিরীহ মানুষ, ব্যবসায়ী ও সচ্ছল ব্যক্তিদের আসামি করেছিল। সেখানে তারা কোটি টাকার বাণিজ্য করেছে। সুলতান খান ২০২৫ সালের ২৮ জানুয়ারি ৩০১ জনকে এবং মারজুক একই বছরের ১৪ মে ২৪৭ জনকে আসামি করে মামলা করেন। পরে তাদের সহযোগী মো. জহির চলতি বছরের ১৯ মে প্রায় দুই বছর আগের একটি ঘটনার অভিযোগে ১৪২ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন।
‘আমি ২০০৫ সালে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে বাম পা হারিয়েছি। এখন কৃত্রিম পায়ে চলাফেরা করি। আমার শারীরিক অবস্থার কথা তারা জানে। তারপরও জমি দখলের উদ্দেশ্যে আমাকে হয়রানির মধ্যে ফেলেছে’— বলেন মিশেল।
মারজুক আব্দুল্লাহর করা মামলায় ৫১ নম্বর আসামি রয়েল সিটি হাসপাতালের মালিক কাজী আফরোজা। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বললেন, ‘মামলার কাগজপত্র নিয়ে আমার কাছে লোক পাঠিয়েছিল। বলা হয়, মোটা অঙ্কের টাকা দিলে নাম থাকবে না। আমি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নই, তাই টাকা দিইনি। পরে দেখি আমাকে আসামি করা হয়েছে।’
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বরিশাল মহানগরের সাবেক আহ্বায়ক শহিদুল ইসলাম শাহেদ জানালেন, চাঁদাবাজি ও ডাকাতির অভিযোগে মারজুক আব্দুল্লাহকে সংগঠন থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তারপরও তাকে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। বললেন, ‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উচিত তাকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা।’
বরিশাল মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব জিয়াউদ্দিন সিকদারের ভাষ্য, ‘মারজুক ও তার চক্র বরিশালে মামলা বাণিজ্য করছে। আমাদের দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধেও মামলা দিয়েছে। যারা জুলাই আন্দোলনে সক্রিয় ছিল, তাদেরও আসামি করা হয়েছে। এই চক্রে কারা রয়েছে এবং তাদের পেছনে কারা আছে, তা নিয়ে দলীয়ভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
মামলা বাণিজ্যের অভিযোগের বিষয়ে মারজুক আব্দুল্লাহর কথিত মামা সুলতান খানের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।
গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত মারজুক আব্দুল্লাহকে পুলিশ গ্রেপ্তার না করার বিষয়ে বরিশাল আদালতের সিনিয়র আইনজীবী আজাদ রহমান বললেন, ‘ওয়ারেন্টভুক্ত ব্যক্তি প্রকাশ্যে ঘুরতে পারে না। হয়তো তিনি পলাতক থাকলে তাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী খুঁজে পাবে না। আবার ওই ব্যক্তি কোনো রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় থাকতে পারে, যে কারণে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করছে না। তাছাড়া কেউ যদি আদালতে মিথ্যা মামলা করে তাহলে বর্তমান বিধান অনুযায়ী আদালত তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। জরিমানাসহ ২ থেকে ৭ বছরের কারাদণ্ড দিতে পারে।’






