হবিগঞ্জে ভিটেমাটি ছেড়ে আশ্রয়ের খোঁজে হাজারো পরিবার

ছবি: আগামীর সময়
গবাদি পশুর গলার দড়ি হাতে হাঁটুজল ভেঙে এগিয়ে চলেছেন গৃহকর্তারা। পেছনে শিশু কোলে নিয়ে হাঁটছেন নারীরা। বানের জলে তলিয়ে যাওয়া ভিটেমাটি ছেড়ে কেউ ছুটছেন আত্মীয়ের বাড়িতে, কেউ আশ্রয় নিচ্ছেন বিদ্যালয় কিংবা ইউনিয়ন পরিষদ ভবনে। হবিগঞ্জ সদর উপজেলার লস্করপুর ইউনিয়নের বন্যার চিত্র এটি।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে ইউনিয়নের কালীগঞ্জ এলাকায় খোয়াই নদীর বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে ঢুকে পড়ে ঢলের পানি। মুহূর্তেই প্লাবিত হয় অন্তত ১০টি গ্রামের কয়েক হাজার বসতবাড়ি। বাস্তুচ্যুত হন প্রায় দুই হাজার পরিবার।
দিনভর বাঁধ উপচে পানি প্রবেশ করার পর রাতে কালীগঞ্জ এলাকায় ভাঙন দেখা দেয়। মাত্র আধা ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ৫০ ফুটজুড়ে বাঁধ ধসে যায়। এরপর লোকালয়ে পানি ঢুকে পড়ে।
বৃহস্পতিবার রাত পর্যন্ত নোয়াবাদ, চরহামুয়া, আদ্যপাশা, বনগাঁও, কালীগঞ্জ, সুঘর ও কটিয়াদিসহ আশপাশের গ্রাম প্লাবিত হয়। গবাদি পশু নিয়ে বাঁধের ওপর ও উঁচু স্থানে আশ্রয় নেন অনেকেই।
লস্করপুর ইউনিয়ন পরিষদের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মো. সাহেব আলী জানান, অন্তত দুই হাজার পরিবারের বসতবাড়ি তলিয়ে গেছে। অধিকাংশ বাড়িতে কোমরসমান পানি উঠেছে।
হবিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী সায়েদুর রহমান জানান, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় চুনারুঘাট উপজেলার বাল্লা পয়েন্টে খোয়াই নদীর পানি ২৩ দশমিক ২০ মিটার রেকর্ড করা হয়, যা বিপদসীমার ২২০ সেন্টিমিটার ওপরে। হবিগঞ্জ সদর পয়েন্টে পানি বিপদসীমার ১২৫ সেন্টিমিটার এবং আজমিরীগঞ্জ পয়েন্টে কালনী-কুশিয়ারা নদীর পানি বিপদসীমার ৬৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। সুতাং নদীর পানিও বিপদসীমার ৩২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছিল।
হবিগঞ্জ সাংবাদিক ফোরামের সাবেক সভাপতি মর্তুজা ইমতিয়াজের শ্বশুরবাড়ি কালীগঞ্জে। তিনি জানান, তার শ্বশুরবাড়ির সদস্যরা গবাদি পশুসহ বাঁধের ওপর আশ্রয় নিয়েছেন। ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়া পানিতে আসবাবপত্র, ফ্রিজ, টেলিভিশনসহ প্রয়োজনীয় মালামাল নষ্ট হয়েছে।
হবিগঞ্জ শহরের শায়েস্তানগর এলাকার বাসিন্দা নূরুল হক কবির এক স্বজনকে ফোনে বলছিলেন, ‘মালামালের চিন্তা বাদ দাও। যেভাবেই পারো স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে আমার বাসায় চলে আসো।’
বৃহস্পতিবার দুপুরে জেলা শহরের কামড়াপুর এলাকায় খোয়াই নদীর দুই তীরের দুই শতাধিক বসতবাড়ি ও স্থাপনায় হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি ওঠে। ঘরের মালামাল নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেন স্থানীয়রা।
কামড়াপুর এলাকার একটি টিনশেড ঘরে থাকতেন তৃতীয় লিঙ্গের মধু আক্তার ও মায়ীশা বেগম। ঘরটি তলিয়ে যাওয়ায় তাদের লক্ষাধিক টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে জানান তারা। এখন কোথায় থাকবেন, কী খাবেন—সেই দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তাদের।
একইভাবে নারী-শিশুদের নিয়ে বিপাকে পড়েছেন রহিম মিয়া, রহমত আলী, নূরুল হক, আইবুর মিয়াসহ দুই শতাধিক পরিবার।
জেলার নয়টি উপজেলায় ১৪ হাজার হেক্টর জমিতে বর্ষাকালীন বিভিন্ন ধরনের সবজির চাষ হয়েছে। গত দুই দিনের বৃষ্টিতে প্রায় ৭০০ হেক্টর, অর্থাৎ ৫ শতাংশ জমির সবজি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্যান) দ্বীপক কুমার পাল।
তিনি বলেছেন, ‘বৃষ্টিপাত থেমে পানি নেমে গেলে ক্ষতির পরিমাণ আর বাড়বে না। তবে বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে এবং পানি দীর্ঘস্থায়ী হলে ক্ষয়ক্ষতি অনেক বেড়ে যেতে পারে।’
হবিগঞ্জ সদর উপজেলার নিজামপুর ইউনিয়নের কৃষক বিলাল মিয়া দুই লাখ টাকা ব্যয়ে সাত হাজার বস্তা আদার চাষ করেছেন। খোয়াই নদীর পানি বাড়তে থাকায় তিনি শঙ্কা প্রকাশ করলেন, বাড়ির নিচু জমিতে আদার চাষ করেছি। পানি ঢুকে কয়েক দিন থাকলে সব আদা পচে যাবে।
জেলার খোয়াই, কালনী-কুশিয়ারা ও সুতাং নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পাশাপাশি আরও কয়েকটি নদীর পানিও বাড়ছে। উজানে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে বলে জানিয়েছে পাউবো।





