ভোরের আলো ফুটতেই জমে ওঠে রংপুরের পালিচড়া সবজির মোকাম

কেউ দরদাম করছেন, কেউ ব্যস্ত কেনাবেচায়। ছবি : আগামীর সময়
ভোরের আলো ফুটতেই জমে ওঠে হাট। কারও মাথায় সবজির ঝুড়ি, কারও ভ্যানে সাজানো টাটকা শাকসবজি। কেউ দরদাম করছেন, কেউ ব্যস্ত কেনাবেচায়। কৃষকের হাত থেকে সরাসরি সবজি কিনছেন পাইকার ও খুচরা ক্রেতারা। নেই ফড়িয়াদের দৌরাত্ম্য। কৃষক পাচ্ছেন উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম, আর ক্রেতারা কিনতে পারছেন তুলনামূলক কম দামে টাটকা সবজি। এমনই এক ব্যতিক্রমী বাজার রংপুরের পালিচড়া হাট, যা স্থানীয়ভাবে পরিচিত ‘ভোরের সবজি হাট’ নামে।
রংপুর সদর উপজেলার সদ্যপুষ্করিণী ইউনিয়নে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী পালিচড়া হাট। সকাল ৬টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত চলে এই হাটের মূল বেচাকেনা। রংপুর সদর ও মিঠাপুকুর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের কৃষকরা নিজেদের উৎপাদিত সবজি নিয়ে হাজির হন এখানে। রানীপুকুর, ভেলু, পালিচড়া, কাটাবাড়ী, গোপালপুর, মাধবপুর, ফতেপুর, অযোদ্ধাপুরসহ আশপাশের গ্রামগুলো থেকে প্রতিদিন আসে নানা জাতের শাকসবজি।
হাটের এক কোণে টমেটো ও বাঁধাকপি নিয়ে বসেছেন জসিম উদ্দিন। তার বাড়ি পাশের কাটাবাড়ী গ্রামে। তিন বিঘা জমিতে এসব সবজি চাষ করেছেন তিনি। জসিম উদ্দিন বললেন, ‘আগে পাইকাররা ক্ষেতে গিয়ে কম দামে সবজি কিনে নিয়ে যেতেন। পরে বাইরে বেশি দামে বিক্রি করতেন। এখন আমরা নিজেরাই হাটে সবজি নিয়ে আসি। বাজার দেখে দরদাম করে বিক্রি করতে পারি।’
একই অভিজ্ঞতার কথা জানালেন পালিচড়া গ্রামের কৃষক আবদুর রহিম। তিনি হাটে লালশাক ও মিষ্টিকুমড়া বিক্রি করছিলেন। তার ভাষ্য, গ্রামের প্রায় সবাই সবজি চাষ করেন। ভোররাতে ক্ষেত থেকে সবজি তুলে সরাসরি হাটে নিয়ে আসেন তারা। এখানে কৃষকরাই বিক্রেতা। ফলে উৎপাদিত পণ্যের দাম নিজেরাই নির্ধারণ করার সুযোগ পান।
কৃষকের এই সরাসরি বিক্রির সুবিধা শুধু উৎপাদনকারীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; স্বস্তি মিলেছে ক্রেতাদেরও। রংপুর শহরের ধাপ এলাকার চাকরিজীবী আসাদুজ্জামান ব্যাগ হাতে সবজি কিনছিলেন। তিনি বললেন, ‘স্বাভাবিক দামে ক্ষেত থেকে সদ্য কেটে আনা টাটকা শাকসবজি পাওয়া যায়। তাই সপ্তাহে অন্তত দুদিন এই হাটে আসি।’
পালিচড়া হাটের গুরুত্ব শুধু স্থানীয় কেনাবেচায় সীমাবদ্ধ নয়। এখান থেকে সংগ্রহ করা সবজি রংপুর শহর ছাড়াও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়। কৃষি বিভাগ বলছে, রংপুর জেলায় চলতি বছর শীতকালীন শাকসবজি চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৭ হাজার ৯০০ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে আগাম সবজি আবাদ হয়েছে প্রায় ৩ হাজার হেক্টরে। এসব সবজি এখন বাজারে উঠতে শুরু করেছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রংপুরের উপপরিচালক সাইফুল আলমের ভাষ্য, রংপুর অঞ্চলে শাকসবজি কেনাবেচার অন্যতম বড় মোকাম পালিচড়া হাট। এখান থেকে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সবজি সরবরাহ করা হয়। কৃষকরাই উৎপাদিত পণ্যের দাম যাচাই করে বিক্রি করতে পারছেন। অন্যদিকে ক্রেতারাও পাচ্ছেন টাটকা সবজি তুলনামূলক সাশ্রয়ী দামে। এ কারণে হাটটি কৃষক ও ক্রেতা— উভয়ের কাছেই আস্থার জায়গা তৈরি করেছে।



