ওয়ার্ড সভা কী জানেন না অধিকাংশ মানুষ
- অকার্যকর ওয়ার্ডসভা
- জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ নেই জনগণের

হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত সবুজ শ্যামলে ঘেরা উত্তরের জেলা ঠাকুরগাঁও। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি কৃষিনির্ভর এই জনপদে বসবাস করেন হাজারো মানুষ। তবে ইউনিয়ন পরিষদের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ‘ওয়ার্ড সভা’ থাকার পরও অধিকাংশ মানুষ এ বিষয়ে জানেন না। ফলে স্থানীয় উন্নয়ন কার্যক্রমে তাদের অংশগ্রহণ ক্রমেই সীমিত হয়ে পড়েছে।
ঠাকুরগাঁও জেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ মানুষই জানেন না ওয়ার্ড সভা কী, কবে হয় কিংবা সেখানে তাদের ভূমিকা কী। স্থানীয়দের অভিযোগ, বিগত সরকারের আমলে এই সভার সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছে সাধারণ মানুষ। দীর্ঘ বছর ধরে চলে আসা এই অবহেলার কারণে তৃণমূলের মানুষ তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে পারেনি।
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার একাধিক ইউনিয়নে গিয়ে কথা হয় স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে।
ঘনিমহেশপুর গ্রামের মমেনা বেগম বলছেন, দীর্ঘ বছর ধরে এই এলাকায় আছি, কিন্তু এখন পর্যন্ত জানি না ওয়ার্ড সভা সম্পর্কে।
আকচা ইউনিয়নের বাসিন্দা দিলীপ কুমার সিংহ জানান, ওয়ার্ড সভা কথার সাথে তিনি পরিচিত নন। ওয়ার্ড সভা হলে অবশ্যই যেতেন, করতেন অংশগ্রহণ।
ঢোলোর হাট ইউনিয়নের বাসিন্দা চল্লিশ বছর বয়সী বিপ্লব দাস বলছেন, "আমার বয়স ৪০ হলো, কিন্তু আমি ওয়ার্ড সভা সম্পর্কে আজকেই প্রথম শুনলাম।"
ধর্মপুর গ্রামের পবিত্র রায়ের অভিযোগ, "আমাদের কখনোই ডাকা হয় না। ডাকলে আমরা আমাদের দাবি-দাওয়া তুলে ধরতে পারতাম।"
"ওয়ার্ড সভা কি, ওয়ার্ড সভা কেমন, এসব কিছুই জানিনা। আমরা সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ।" বলছিলেন রুহিয়া ইউনিয়নের ৭ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা জরিনা বেগম।
ঢোলারহাট ইউনিয়নের গ্রাম্য পুলিশ নিখিলেরও একই ভাষ্য, "ওয়ার্ড সভায় সবাইকে বলে না। গ্রামে গিয়ে আট দশ জনকে ডেকে নিয়ে ওয়ার্ড সভা করে নেয়।"
স্থানীয়দের এমন অভিযোগের বিপরীতে ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন জনপ্রতিনিধিরা। সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের কয়েকজন ওয়ার্ড সদস্য (মেম্বার) দাবি করেন, তারা নিয়ম অনুযায়ী প্রতিবছর অন্তত দুইবার করে ওয়ার্ড সভা আয়োজন করেন। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের ভাষ্যমতে, "ওয়ার্ড সভা নিয়মিতভাবে অনুষ্ঠিত হলেও সেখানে সাধারণ মানুষের উপস্থিতি আশানুরূপ নয়।"
আকচা ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য নারায়ণ চন্দ্র বর্মন বলছেন, "প্রতি বছরই আমার ওয়ার্ডে দুইবার ওয়ার্ড সভা অনুষ্ঠিত হয়, যা সবাই জানে। কেউ যদি বলে আমরা জানি না, তাহলে সে কিছুই জানেনা । আমরা ওয়ার্ড সভায় অংশগ্রহণকারীদের জন্য রাখি খাবারের ব্যবস্থাও।"
রুহিয়া ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য ইউসুফ আলী বলছেন, "আমরা বছরে দুইবার নির্ধারিত তারিখ ও ব্যানারসহ ওয়ার্ড সভা আয়োজন করি। সভায় প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ জন মানুষের জন্য রাখা হয় খাবারের ব্যবস্থাও।"
অন্যদিকে আকচা ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সিমলা রানী জানালেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর তার সময়ে ওয়ার্ড সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে মাঝখানে কিছুটা ব্যত্যয় ঘটেছিল বলে তিনি স্বীকার করেন। এ সময় তিনি ওয়ার্ড সভার কোনো ছবি বা ডকুমেন্ট দেখাতে পারেননি।
রাজাগাঁও ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জানান, ওয়ার্ড কমিটির কাগজপত্র ইউনিয়ন পরিষদের সচিবের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে এবং রেজুলেশন অনুযায়ী প্রতিবছরই ওয়ার্ড সভা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। তবে এ বিষয়ে ছবি বা নথিপত্র দেখতে চাইলে সচিব অনুপস্থিত থাকার কথা তিনি জানান।
রুহিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মনিরুল হক বাবু বলছেন, "ওয়ার্ড সভা করা বাধ্যতামূলক এবং তা করা হয়। তবে অনেক মানুষ বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত থাকায় অনেকে হয়তো বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন।"
তিনি জানান, ইউনিয়ন পরিষদের বরাদ্দ তুলনামূলক কম হওয়ায় সব কার্যক্রম যথাযথভাবে বাস্তবায়নে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রেই অতীতে কাগজে-কলমে সভা দেখানো হলেও বাস্তবে সেই সভার কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যেত না। এতে করে সাধারণ মানুষ তাদের এলাকার রাস্তা, ড্রেনেজ, ভাতা বণ্টনসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মতামত দেওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
এ বিষয়ে ঠাকুরগাঁও প্রেসক্লাবের সভাপতি ব্যখ্যা করেন, "স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রেই স্থবির হয়ে পড়েছিল। তার মতে, বিভিন্ন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কারণে ওয়ার্ড সভাগুলো নিয়মিত ও কার্যকরভাবে অনুষ্ঠিত হয়নি।"
"ওয়ার্ড সভা ঠিকভাবে হলে জনগণের প্রকৃত মতামত উঠে আসবে এবং স্থানীয় উন্নয়ন কার্যক্রম আরও স্বচ্ছ হবে।" যোগ করেন তিনি।
অন্যদিকে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ওয়ার্ড সভা আয়োজন একটি বাধ্যতামূলক প্রক্রিয়া। এ বিষয়ে খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার খাইরুল ইসলাম।
দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা কাটিয়ে বর্তমান সরকারের আমলে ওয়ার্ড সভার পূর্ণ সুবিধা পাবে সাধারণ মানুষ। এমনটাই প্রত্যাশা সবার। কার্যকর উদ্যোগ ও সচেতনতা বাড়ানো গেলে মানুষ ওয়ার্ড সভা সম্পর্কে জানতে পারবে এবং এতে অংশ নিয়ে নিজেদের চাহিদা ও মতামত সরাসরি তুলে ধরতে পারবে। নিয়মিতভাবে এই সভা অনুষ্ঠিত হলে তৃণমূল পর্যায়ের উন্নয়ন পরিকল্পনায় জনগণের প্রকৃত চাহিদা প্রতিফলিত হবে এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আরও জোরদার হবে।

