মাছ কুটেই ঘুরছে সংসারের চাকা

প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে বিকাল পর্যন্ত নিচাবাজারে কাজ করেন অন্তত ৫০ নারী
সকালের সূর্য তখনো পুরোপুরি ওঠেনি। নাটোর শহরের নিচাবাজারে একে একে জড়ো হচ্ছেন সোহাগী, রিনা, রহিমা, রুবিদের মতো মধ্যবয়সী নারীরা। পায়ের নিচে বঁটি, পাশেই মাছভর্তি ঝুড়ি। সারিবদ্ধভাবে বসে তারা অপেক্ষা করছেন ক্রেতাদের জন্য। কেউ বাজার থেকে মাছ কিনে তাদের সামনে দাঁড়ান, শুরু হয় দরদাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই দক্ষ হাতে মাছ পরিষ্কার করে টুকরো করে পলিথিনে ভরে দেন। স্থানীয় ভাষায় তারা পরিচিত মাছ কুটুনি নামে। এই পরিচয়ের আড়ালেই লুকিয়ে আছে অর্ধশত নারীর টিকে থাকার সংগ্রামের গল্প।
এই বাজারে মাছ কাটা শুধু একটি পেশা নয়, অনেক পরিবারের বেঁচে থাকার অবলম্বন। প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে বিকাল পর্যন্ত নিচাবাজারে কাজ করেন অন্তত ৫০ নারী। তাদের অধিকাংশের পরিবার অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল। কারও স্বামী মারা গেছেন, কেউ অসুস্থ হয়ে কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন, আবার কেউ দীর্ঘদিন ধরে বেকার। বিকল্প আয়ের পথ না থাকায় জীবিকার তাগিদেই তারা এ পেশা বেছে নিয়েছেন। মাস শেষে আয় দাঁড়ায় ১২-১৪ হাজার টাকা।
তাদের আয়ের হিসাবও নির্ভর করে হাতের গতির ওপর। চুক্তিভিত্তিক কিংবা কেজিপ্রতি পারিশ্রমিক পান তারা। আধা কেজি থেকে এক কেজি ওজনের মাছ কাটতে ২০-৩০ টাকা, মাঝারি আকারের মাছ ৩০-৪০ টাকা এবং ছোট পুঁটি, ট্যাংরা, চান্দা কিংবা খলিসা মাছ পরিষ্কার করতে ৫০-৬০ টাকা পর্যন্ত পান। দিনে যে যত বেশি মাছ কাটতে পারেন, আয়ও তত বেশি। দিন শেষে একজনের হাতে থাকে গড়ে ৩০০-৪০০ টাকা।
৫০ বছর বয়সী সোহাগী শহরের রথবাড়ি এলাকায় ভাড়া বাসায় মেয়েকে নিয়ে থাকেন। ছয় বছর আগে স্বামী মারা যান। এরপরই সংসারে নেমে আসে অনিশ্চয়তা। অনেক জায়গায় কাজ খুঁজেও পাননি। শেষ পর্যন্ত মাছ কাটার কাজই হয়ে উঠেছে তার জীবিকার ভরসা। ‘কাজে না এলে মা-মেয়ের মুখে ভাত জোটে না। দিন শেষে ৩০০-৪০০ টাকা নিয়ে বাড়ি ফিরি। সংসার চালিয়ে সামান্য কিছু সঞ্চয়ও করতে পারি’— বলছিলেন সোহাগী।
সোহাগীর গল্প শেষ হতে না হতেই সামনে আসে আরেকটি পরিবারের লড়াইয়ের কথা। রিনা বেগমের স্বামী দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। সংসারের পুরো দায়িত্ব এখন তার কাঁধে। দুই মেয়ের লেখাপড়ার খরচও আসে এই মাছ কাটার আয় থেকেই।
ভোরে হাতে আঁশবঁটি আর ছাই নিয়ে বাজারে আসেন রিনা। ক্রেতাদের মাছ কেটে পরিষ্কার করতে করতেই কেটে যায় পুরো দিন। তিনি বললেন, ‘কখনো আয় হয় ৩০০, কখনো ৪০০ টাকা। এই টাকাতেই চলে সংসার ও মেয়েদের পড়াশোনা।’
কর্মজীবীরাও নির্ভর করছেন এই সেবার ওপর। চাকরিজীবী নাজমুল হক স্বপনের ভাষায়, ‘বাড়িতে আমি আর আমার স্ত্রী থাকি। কাজের লোক নেই। ৩০-৪০ টাকা দিলেই মাছ পরিষ্কার করে দেয়। এতে সময়ও বাঁচে।’
একই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন স্কুলশিক্ষক রুবিনা বেগম। সকালে স্কুলে যাওয়ার তাড়াহুড়োর কারণে বাজার থেকেই মাছ কেটে ফ্রিজে রেখে যান। বিকালে ফিরে শুধু রান্না করেন।
এই পেশার নারীদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টাও রয়েছে স্থানীয়ভাবে। নিচাবাজার ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক শামীম আহমেদ জানিয়েছেন, বাজারে অন্তত অর্ধশত জীবিকা নির্বাহ করছেন নারী মাছ কেটে। তাদের অধিকাংশই দরিদ্র। রোদ ও বৃষ্টি থেকে সুরক্ষার জন্য তাদের বসার জায়গায় দেওয়া হয়েছে শামিয়ানা। ব্যবসায়ীরাও বিভিন্নভাবে করছেন সহযোগিতা।




