নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও সাগরে মাছ শিকার

ছবি: আগামীর সময়
নিষেধাজ্ঞা চলাকালেও বঙ্গোপসাগরে কিছু ট্রলার মাছ শিকার করছে বলে একের পর এক ঘটনায় ইঙ্গিত মিলেছে। ফলে ৫৮ দিনের সামুদ্রিক মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন, নজরদারি এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
সামুদ্রিক মাছের নিরাপদ প্রজনন ও মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণের লক্ষ্যে প্রতিবছরের মতো এবারও ১৫ এপ্রিল থেকে ১১ জুন পর্যন্ত বঙ্গোপসাগরে সব ধরনের মাছ আহরণ নিষিদ্ধ করেছে সরকার। তবে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া কয়েকটি ঘটনা দেখিয়েছে, নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও কিছু ট্রলার গভীর সমুদ্রে অবস্থান করছে এবং মাছ ধরছে।
গত ১৯ মে বঙ্গোপসাগরের কটকা এলাকায় মাছ ধরার সময় একটি ট্রলারসহ ১২ জেলে জলদস্যুদের হাতে অপহৃত হয়েছেন বলে অভিযোগ ওঠে। অপহৃতদের বাড়ি বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার বিভিন্ন এলাকায়। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দেয়, নিষেধাজ্ঞার সময় জেলেরা কীভাবে গভীর সমুদ্রে গেলেন। তারা যদি মাছ ধরতে গিয়ে থাকেন, তাহলে নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলোর নজরদারি কোথায় ছিল?
এর কয়েকদিন পর, ৩১ মে বঙ্গোপসাগরের মোহনায় মাছ ধরার সময় একটি ট্রলারের জালে ড্রোনসদৃশ একটি রহস্যময় যন্ত্র আটকা পড়ে। পরে সেটি উদ্ধার করে তীরে আনা হলে পুলিশ হেফাজতে নেয়। ঘটনাটি যেমন কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে, তেমনি এটিও স্পষ্ট করেছে যে নিষেধাজ্ঞার সময় কিছু ট্রলার সমুদ্রে অবস্থান করছিল।
এরই মধ্যে ২ জুন নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মাছ ধরার অভিযোগে এফবি নাজমা-২ নামে একটি ট্রলার আটক করে কোস্ট গার্ড। ট্রলারটি থেকে বিপুল পরিমাণ সামুদ্রিক মাছ জব্দ করা হয় এবং ১২ জেলেকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এ ঘটনাও প্রমাণ করে যে নিষেধাজ্ঞার সময় কিছু ট্রলার নিয়ম ভেঙে মাছ শিকার করছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পাথরঘাটা থেকে প্রতিদিন কতটি ট্রলার সমুদ্রে যাচ্ছে, কতজন জেলে নিয়ে যাচ্ছে এবং কখন ফিরে আসছে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে নির্ভরযোগ্য ও হালনাগাদ তথ্য নেই। ফলে অনেক ট্রলার গভীর রাতে গোপনে ঘাট ছেড়ে সমুদ্রে চলে যায়।
মৎস্য বন্দরের একাধিক সূত্রের দাবি, নিষেধাজ্ঞা শুরুর পর থেকেই কিছু জেলে তা অমান্য করে মাছ ধরছেন। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় প্রশাসন, গণমাধ্যমকর্মী ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তিকে প্রভাবিত করেই এই কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। সূত্রগুলো জানায়, সমুদ্র থেকে ধরা মাছ গভীর রাতে পাথরঘাটার পদ্মা এলাকার অস্থায়ী বাজার ও চরদুয়ানী বাজারে বিক্রি করা হয়।
নিষেধাজ্ঞার সময় অবতরণ কেন্দ্র এলাকার কয়েকটি বরফকলও সচল রয়েছে। উপজেলা প্রশাসন এসব বরফকল পরিচালনার অভিযোগে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়ে জরিমানা করেছে বলে জানা গেছে।
স্থানীয় জেলেদের মতে, নিষেধাজ্ঞা অমান্যের অন্যতম কারণ নজরদারির দুর্বলতা। অনেক ট্রলার রাতের আঁধারে ঘাট ছাড়ায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজর এড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়।
পাথরঘাটা মৎস্য বিভাগ জানিয়েছে, ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে ৮ জুন পর্যন্ত কোস্ট গার্ড, নৌবাহিনী ও মৎস্য বিভাগ যৌথভাবে ৯৮টি অভিযান এবং ১২টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেছে। এসব অভিযানে ৮ দশমিক ৫ মেট্রিক টন মাছ ও ৩০৭ দশমিক ৫৭ লাখ মিটার অবৈধ জাল জব্দ করা হয়েছে।
এ ছাড়া একটি ট্রলিং বোট জব্দ, ১২ জেলেকে কারাদণ্ড, ৯টি মামলা এবং ৩ লাখ ৯৮ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জব্দ করা মাছ নিলামে বিক্রি করে ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যার মূল কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে ট্রলার ও জেলেদের সমন্বিত তথ্যভান্ডারের অভাব, সীমিত নজরদারি এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনার ঘাটতি। তাদের মতে, প্রতিটি ট্রলারের ডিজিটাল নিবন্ধন, জেলেদের কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার এবং বাধ্যতামূলক জিপিএস ট্র্যাকিং চালু করা গেলে সমুদ্রে ট্রলারের গতিবিধি সহজে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি ঘাট, নদীমোহনা ও গভীর সমুদ্রে নজরদারি আরও জোরদার করতে হবে।
বরগুনা জেলা ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘ট্রলার এখন সাগরে মাছ ধরছে। বরফ ও তেল সবই আমরা দেই। শুধু প্রশাসন ঠিক রাখতে হয়, প্রশাসনকে টাকা দেওয়া লাগে। আমি ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি। আমার জেলেরা যদি মাছ ধরতে পারে, তাতে আমার সমস্যা কী? ট্রলার মালিকরা অনেক টাকা ব্যয় করে সমুদ্রে যায়। এ সময় বরফের দামও বেশি থাকে। জেলেরা সাগরে গিয়ে ভালো মাছ পায়। খালি অবরোধ দিয়ে কোনো লাভ হয় না।’
বরগুনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ জিয়া উদ্দিন বলেছেন, জনবল সংকটের কারণে সরাসরি গভীর সমুদ্রে গিয়ে নিয়মিত নজরদারি করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না। সমুদ্রে অভিযান ও তদারকির মূল দায়িত্ব নৌবাহিনী ও কোস্ট গার্ড পালন করে।
তিনি বলেছেন, অনেকেই ফাঁকি দিয়ে বা গোপনে সমুদ্রে চলে যায়। ফলে সব সময় তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তারপরও নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানো হচ্ছে।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স অনুষদের সহকারী অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলী বলেছেন, উপকূলীয় অঞ্চলে অনিয়ন্ত্রিত মৎস্য আহরণ দেশের মৎস্যসম্পদকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তার মতে, এর দায় শুধু জেলেদের ওপর চাপিয়ে দিলে হবে না। ব্যবস্থাপনা, নজরদারি ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোরও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি আরও বলেছেন, নিষেধাজ্ঞার সময় জেলেদের অপহরণ এবং ড্রোনসদৃশ যন্ত্র উদ্ধারের ঘটনা প্রমাণ করে যে কিছু ট্রলার তখনও সমুদ্রে ছিল। ফলে প্রশ্ন ওঠে, নিষেধাজ্ঞার সময় এসব ট্রলার কীভাবে ঘাট থেকে সাগরে গেল। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন।
মীর মোহাম্মদ আলীর মতে, নিষেধাজ্ঞা শুধু ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলবে না। কার্যকর মনিটরিং, নিয়মিত অভিযান, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, জেলেদের নিরাপত্তা এবং প্রকৃত জেলেদের জন্য সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। অন্যথায় নিষেধাজ্ঞা কাগজে-কলমে থাকলেও সমুদ্রের মাছ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার মূল লক্ষ্য অধরাই থেকে যাবে।






