রাঙামাটিতে ৭০৭ স্কুলের ৪৩৮টিতেই নেই প্রধান শিক্ষক
- ছয় বছর ধরে বন্ধ সহকারী শিক্ষক নিয়োগ
- খালি সহকারী শিক্ষকের ৭৫৯ পদ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
কোনো স্কুলে শিক্ষক মাত্র দুজন, কোথাও আবার একাধিক শ্রেণির শিক্ষার্থীদের সামলাতে হচ্ছে হাতেগোনা কয়েকজন শিক্ষককে। অবসর, মৃত্যু ও বদলির পর শূন্য হওয়া পদগুলো পূরণ না হওয়ায় বছরের পর বছর এভাবেই চলছে রাঙামাটির অনেক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠদান। সবশেষ ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে ১২৪ জন সহকারী শিক্ষক নিয়োগের পর গত সাড়ে ছয় বছরে হয়নি আর কোনো নিয়োগ পরীক্ষা। এর মধ্যে জেলায় শূন্য হয়েছে সহকারী শিক্ষকের ৭৫৯টি পদ। অন্তত তিনবার নিয়োগপ্রক্রিয়া শুরু করা হলেও শেষ পরীক্ষা হয়নি একবারও।
রাঙামাটি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস থেকে জানা গেছে, জেলায় প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে ৭০৭টি। এর মধ্যে আগের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ৩৯৩টি, জাতীয়করণকৃত বিদ্যালয় ২০৬টি, ১৫০০ প্রকল্পের আওতায় ২৭টি, ইউএনডিপি পরিচালিত জাতীয়করণকৃত বিদ্যালয় ৮১টি এবং জেলা পরিষদ কর্তৃক অনুদানপ্রাপ্ত বেসরকারি বিদ্যালয় ৬৩টি। এসব বিদ্যালয়ে প্রাক-প্রাথমিকসহ অনুমোদিত সহকারী শিক্ষকের পদ রয়েছে ৩ হাজার ৩৩২টি। এর বিপরীতে কর্মরত ২ হাজার ৫৭৩ জন। ফলে শূন্য রয়েছে ৭৫৯টি পদ। তবে চলতি দায়িত্বের মাধ্যমে কিছু পদ পূরণ থাকায় নতুন করে নিয়োগযোগ্য পদের সংখ্যা ৬১৫টি বলে জানিয়েছে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস।
উপজেলাভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি সহকারী শিক্ষক পদ শূন্য রয়েছে বাঘাইছড়িতে— ১৬৩টি। লংগদুতে শূন্য রয়েছে ১১২টি পদ, বরকলে ৭৫, রাজস্থলীতে ৭৪, জুরাছড়িতে ৭৩, বিলাইছড়িতে ৬৫, নানিয়ারচরে ৬৩, কাউখালীতে ৪৯, সদরে ৪৯ এবং কাপ্তাইয়ে ৩৪টি পদ।
শুধু সহকারী শিক্ষক নয়, একই চিত্র প্রধান শিক্ষক পদেও। জেলার ৭০৭টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৪৩৮টিতেই নেই প্রধান শিক্ষক। বাঘাইছড়ির ১১৬টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৭৮টি এবং লংগদুর ৭৪টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৬০টিতে নেই প্রধান শিক্ষক।
বাংলাদেশ প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক সমিতির রাঙামাটি জেলা আহ্বায়ক দীপু শ্রীং লেপচা জানালেন, জেলায় প্রচুর পদ শূন্য থাকলেও নিয়োগ হচ্ছে না। দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন। কোনো কোনো বিদ্যালয়ে মাত্র দুজন শিক্ষক দিয়ে পাঠদান চলছে। এভাবে শিক্ষার মান উন্নয়ন সম্ভব নয়। সহকারী শিক্ষক নিয়োগের পাশাপাশি প্রধান শিক্ষক পদও পূরণ করতে হবে।
বাংলাদেশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রধান শিক্ষক সমিতির রাঙামাটি জেলা কমিটির সভাপতি আলোময় চাকমা বলছিলেন, ‘শিক্ষক নিয়োগ এখন সবচেয়ে জরুরি। সহকারী শিক্ষক নিয়োগের পাশাপাশি প্রধান শিক্ষক পদে গ্রেডেশন চূড়ান্ত করে অপেক্ষমাণ শিক্ষকদের পদোন্নতি দেওয়া হলে প্রাথমিক শিক্ষার সংকট অনেকটাই কাটবে। শিক্ষক স্বল্পতার কারণে শিক্ষা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।’
দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি (দুপ্রক) রাঙামাটির সভাপতি ওমর ফারুকের ভাষ্য, শিক্ষক নিয়োগ বন্ধ থাকায় গুরুতরভাবে ব্যাহত হচ্ছে প্রাথমিকের পাঠদান। বাড়ছে শিক্ষার্থীদের অমনোযোগিতা, বিদ্যমান শিক্ষকদের ওপর পড়ছে অতিরিক্ত চাপ।
গ্রাম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষক সংকট বেশি থাকায় শিক্ষার মানেও বৈষম্য তৈরি হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি জানালেন, শিক্ষক সংকটে শিক্ষার্থীদের শিক্ষার ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ছে। এর প্রভাব পড়ছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষাতেও।
তবে সংকট কেটে যাওয়ার আশ্বাস দিলেন রাঙামাটি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. কফিলউদ্দিন। বলছিলেন, ‘আমরা নিয়োগ দিতে প্রস্তুত। কিন্তু বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পক্ষের বিরোধিতা ও নানা বিতর্কের কারণে নিয়োগ বন্ধ হয়ে আছে। শিক্ষক স্বল্পতা ও পদ শূন্য থাকায় শিক্ষা কার্যক্রম চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে— এটা সত্য। তবে আমরা আশাবাদী, শিগগির এই নিয়োগ সংকট কেটে যাবে।’
দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার সঙ্গে এসব বিষয়ে কথা বলেছেন রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান দীপন তালুকদার। জানালেন, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে পরিষদ মন্ত্রণালয় থেকে নিয়োগের যে ছাড়পত্র এনেছিল, নির্ধারিত সময়ে নিয়োগ দিতে না পারায় মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে সেটির। তাই নতুন করে মন্ত্রণালয়ের কাছে চাওয়া হয়েছে ছাড়পত্র। অনুমোদন পেলেই দ্রুত নিয়োগ পরীক্ষা নিয়ে শিক্ষক সংকটের সমাধান করা হবে।



