আলুর বস্তায় ১৩৩ কোটি টাকার লোকসানের শঙ্কা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
হিমাগারে আলু সংরক্ষণ করেছিলেন কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। মৌসুম শেষে দাম বাড়বে, ঘরে ফিরবে বাড়তি টাকা, এমন প্রত্যাশাই ছিল তাদের। কিন্তু এখন সেই আলুর বস্তাই হয়ে উঠেছে লোকসানের বোঝা। ৬০ কেজির এক বস্তা আলু উৎপাদন ও হিমাগারে সংরক্ষণে গড়ে খরচ হয়েছে ১ হাজার ২৫০ টাকা। অথচ বাজারে মিলছে মাত্র ৮৫০ টাকা। ফলে প্রতি বস্তায় লোকসান হচ্ছে প্রায় ৪০০ টাকা। জয়পুরহাট জেলার ২২টি হিমাগারে সংরক্ষিত প্রায় ২ লাখ টন আলু বর্তমান দরে বিক্রি হলেও কৃষক ও ব্যবসায়ীদের মোট লোকসান হবে ১৩৩ কোটি টাকার বেশি।
লোকসানের সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে সময়ের চাপও। আগামী ১০ নভেম্বরের মধ্যে হিমাগারগুলো খালি করতে হবে। হাতে সময় আছে প্রায় ৬৪ দিন। এর আগেই বাজারে উঠতে শুরু করবে আগাম জাতের নতুন আলু। তখন পুরোনো আলুর চাহিদা ও দাম আরও কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন কৃষকেরা।
কৃষি বিভাগ বলছে, জয়পুরহাটের ২২টি হিমাগারের মধ্যে কালাই উপজেলায় রয়েছে ১৪টি। ক্ষেতলালে চারটি এবং পাঁচবিবি ও আক্কেলপুরে রয়েছে দুটি করে হিমাগার। এসব হিমাগারে সংরক্ষণ করা হয়েছে প্রায় ২ লাখ টন আলু। প্রতি বস্তায় ৬০ কেজি ধরলে এর পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৩৩ লাখ ৩৩ হাজার বস্তা। প্রতিটি বস্তায় গড়ে ৪০০ টাকা লোকসান হলে মোট ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ১৩৩ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। তবে হিমাগারভেদে আলু কেনার দাম ও আনুষঙ্গিক খরচে পার্থক্য থাকায় প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ কিছুটা কমবেশি হতে পারে।
এই চিত্রের একটি উদাহরণ কালাই উপজেলার এম ইসরাত হিমাগার। চলতি বছর সেখানে ২ লাখ ৩০ হাজার বস্তা আলু সংরক্ষণ করা হয়েছে। প্রতি বস্তার জন্য ৩৮০ টাকা হিমাগার ভাড়াসহ আনুষঙ্গিক খরচ মিলিয়ে মোট ব্যয় পড়েছে প্রায় ১ হাজার ২৫০ টাকা। কিন্তু বর্তমানে সেই আলু বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৮৫০ টাকায়। ফলে সংরক্ষণ করা আলু বিক্রি করলেই বস্তাপ্রতি প্রায় ৪০০ টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে।
হিমাগারটির ব্যবস্থাপক রায়হান আলম জানান, গত জুন থেকে এ পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে মোট মজুদের মাত্র ২৬ শতাংশ, অর্থাৎ ৬০ হাজার ৬০০ বস্তা আলু। বাকি আলু আগামী ১০ নভেম্বরের মধ্যে হিমাগার থেকে বের করতে হবে। তার দাবি, বর্তমান বাজারদরে আলু বিক্রি করে সংরক্ষণ খরচই উঠছে না। এর ওপর বাজারে দাম বাড়ার কোনো লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না। ফলে বড় ধরনের লোকসান এড়ানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
একই হিমাগারে আলু রেখেছেন কালাই উপজেলার পুনট এলাকার ব্যবসায়ী মিঠু ফকির, মেহেদুল চৌধুরী ও পাঁচশিরার বাবু। মিঠু ফকির ৫ হাজার, মেহেদুল চৌধুরী ৩ হাজার এবং বাবু ৫ হাজার বস্তা আলু সংরক্ষণ করেছেন। মিঠু ফকির বলেন, ‘বাজারে আলু বিক্রি করে মূল খরচই ওঠানো যাচ্ছে না।’ সামনের দিনগুলোয় দাম বাড়ার সম্ভাবনাও দেখছেন না তিনি। ফলে ব্যবসায়ীদের জন্য পরিস্থিতি ক্রমেই হয়ে উঠছে কঠিন।
শুধু বড় ব্যবসায়ীরাই নন, একই পরিস্থিতির মুখে পড়েছেন সাধারণ কৃষকেরাও। গোপীনাথপুর গ্রামের কৃষক ইয়াসিন আলী পরে দাম বাড়বে, এই আশায় আলু সংরক্ষণ করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ২০ বস্তা আলু বিক্রি করে তাকে ৮ হাজার টাকা লোকসান গুনতে হয়েছে। তার মতো অনেক কৃষক এখন কম দামে সংরক্ষিত আলু বিক্রি করা ছাড়া কার্যত কোনো পথ দেখছেন না।
এ অবস্থায় আগামী মৌসুমে কৃষকেরা আলু চাষে আগ্রহ হারাবেন কি না, সেই প্রশ্নও উঠেছে। তবে মাঠপর্যায়ের চিত্রে আপাতত তেমন কোনো ইঙ্গিত নেই। কালাই উপজেলার মাত্রাই গ্রামের কৃষক জামাল হোসেন বলেন, এবারের লোকসান তাকে হতাশ করলেও আগামী মৌসুমে তিনি ১০ বিঘা জমিতে আলু চাষের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। স্থানীয় একটি প্রবাদ টেনে তিনি বলেন, ‘লাজ নাই হ্যালার আর লাজ নাই জালার।’ তার কথায়, লোকসান হলেও আলু চাষ ও সংরক্ষণ থেকে কৃষকেরা সহজে সরে দাঁড়াবেন না।
কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারাও আপাতত আলু চাষে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাবের আশঙ্কা করছেন না। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মনজু আলম সরকারের দাবি, গত মৌসুমে জয়পুরহাটে আলুর উচ্চফলন হয়েছিল। এরপর কৃষক ও ব্যবসায়ীরা বিপুল পরিমাণ আলু সংরক্ষণ করেন। বর্তমানে উৎপাদন ও সংরক্ষণ ব্যয়ের চেয়ে কম দামে আলু বিক্রি করতে গিয়ে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তবে এই লোকসানের কারণে আগামী মৌসুমে আলু আবাদে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না বলে মনে করেন তিনি।






