কক্সবাজার
জমা টাকা ফেরত চেয়ে কাফনের কাপড় পরে সড়ক অবরোধ

ছবি: আগামীর সময়
ব্যাংকে জমা রাখা কষ্টার্জিত টাকা ফেরত পাওয়ার দাবিতে কাফনের কাপড় পরে কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়ক অবরোধ করেছেন আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের এজেন্ট শাখার গ্রাহকেরা।
আজ শনিবার দুপুরে উখিয়ার পালংখালী স্টেশনে ‘আমাদের টাকা ফেরত চাই’, ‘প্রতারকের বিচার চাই’- এমন নানা স্লোগানে বিক্ষোভে নামেন কয়েক শ গ্রাহক ও তাদের স্বজনেরা।
পালংখালী বাজারের আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট মেসার্স ফরহাদ টেলিকমে গ্রাহকদের জমা রাখা কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগের প্রতিবাদে এ কর্মসূচি পালন করা হয়।
দুপুর ২টার দিকে মানববন্ধন শেষে তারা মহাসড়কে অবস্থান নেন। এতে পালংখালী স্টেশনের দুই পাশে শত শত যানবাহন আটকা পড়ে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। উখিয়া ও টেকনাফমুখী যান চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা দুর্ভোগে পড়েন সাধারণ যাত্রীরা।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া অনেক গ্রাহক কান্নায় ভেঙে পড়েন। কেউ কেউ জীবনের সঞ্চয় হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়ার কথা জানিয়ে দ্রুত টাকা ফেরতের দাবি জানান। মানববন্ধনের একপর্যায়ে মাংস ব্যবসায়ী মো. শাহজাহান অসুস্থ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। তার দাবি, ওই এজেন্ট শাখায় তার ৯ লাখ টাকা জমা রয়েছে।
ভুক্তভোগীরা জানান, পালংখালী বাজারের এজেন্ট শাখায় দীর্ঘদিন ধরে তারা টাকা জমা করে আসছিলেন। প্রয়োজনের সময় টাকা তুলতে গেলে শাখার সংশ্লিষ্টরা নানা অজুহাতে টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানান। পরে হিসাব ও জমার রসিদ যাচাই করে অনেক গ্রাহক দেখতে পান, তাদের জমা করা টাকার সঙ্গে ব্যাংক হিসাবে থাকা অর্থের বড় ধরনের গরমিল রয়েছে।
গ্রাহক মোহাম্মদ সোলাইমান বলেছেন, ‘আমি বিশ্বাস করে ওই আউটলেটে ৬ লাখ টাকা জমা রেখেছিলাম। কিন্তু হিসাব যাচাই করে দেখি, আমার অ্যাকাউন্টে রয়েছে মাত্র ৪ হাজার ৪৮০ টাকা। আমাদের কষ্টার্জিত টাকা দ্রুত ফেরত চাই।’
আবুল মঞ্জুর বলেন, ‘আমার অ্যাকাউন্টে ৪ লাখ টাকা জমা ছিল। এখন হিসাবে দেখানো হচ্ছে মাত্র ৪০০ টাকা। এটি আমাদের সঙ্গে চরম প্রতারণা। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে জমা করা সব টাকা ফেরত চাই।’
আব্দুল কাদের বলেন, ‘আমার অ্যাকাউন্টে সাড়ে ৫ লাখ টাকা জমা ছিল। অথচ এখন হিসাবে রয়েছে মাত্র ১ হাজার টাকা। জীবনের সঞ্চয় হারিয়ে আমরা অসহায় হয়ে পড়েছি। দ্রুত আমাদের টাকা ফেরত দিতে হবে।’
গ্রাহক নুরুল বশর বলেন, ‘আমি সাড়ে ৭ লাখ টাকা জমা রেখেছিলাম। কিন্তু টাকা তুলতে গিয়ে জানতে পারি, হিসাবে রয়েছে মাত্র ৩ হাজার টাকা। আমাদের মতো আরও অনেকের টাকাও আটকে আছে। টাকা ফেরতের পাশাপাশি জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’
পালংখালী বাজারের ব্যবসায়ী আনোয়ার ফয়সাল আরিফ বলেছেন, ‘আমার নিজের হিসাবেই ৫ লাখ ৫৫ হাজার টাকা জমা ছিল। দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকে লেনদেন করেছি। কিন্তু প্রয়োজনের সময় টাকা তুলতে গিয়ে জানতে পারি, হিসাবে জমা করা টাকার সঙ্গে মিল নেই। আমরা আমাদের টাকা ফেরত চাই এবং জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’
গ্রাহক আমিরুল ফয়েজ বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে এজেন্ট শাখায় টাকা জমা করে আসছি। প্রয়োজনের সময় টাকা তুলতে গেলে নানা অজুহাতে আমাকে টাকা দেওয়া হয়নি। পরে হিসাব ও জমার রসিদ যাচাই করে দেখি, আমার জমা করা টাকার সঙ্গে হিসাবে থাকা টাকার মিল নেই।’
রুনা আক্তার বলেন, ‘বিশ্বাস করে ব্যাংকের ওই এজেন্ট শাখায় টাকা জমা রেখেছিলাম। প্রয়োজনের সময় টাকা তুলতে গিয়ে জানতে পারি, হিসাবে জমা করা পুরো টাকা নেই। বারবার যোগাযোগ করেও সমাধান পাইনি। প্রত্যেক গ্রাহকের জমা করা টাকা ফেরত দিতে হবে।’
খতিজাতুল কোবরা বলেন, ‘আমি এজেন্ট শাখায় ১০ লাখ টাকা জমা রেখেছিলাম। প্রয়োজনের সময় টাকা তুলতে গিয়ে সমস্যায় পড়ি। পরে জানতে পারি, আমাদের মতো আরও অনেক গ্রাহকের টাকাও আটকে আছে। আমরা আমাদের টাকা ফেরত চাই।’
রাশেদা বেগম বলেন, ‘আমার কষ্টার্জিত প্রায় দেড় লাখ টাকা ব্যাংকে জমা ছিল। এখন সেই টাকা নেই। আমি খুব অসহায় হয়ে পড়েছি। আমার মতো সাধারণ মানুষের টাকা যেন ফেরত দেওয়া হয়।’
জাফর আলম বলেন, ‘মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার জন্য সাড়ে চার লাখ টাকা ব্যাংকে জমিয়েছিলাম। এখন সেই টাকা না পেলে মেয়ের বিয়ে কীভাবে দেব, তা জানি না। আমরা দ্রুত আমাদের টাকা ফেরত চাই।’
গ্রাহকদের অভিযোগ, শুধু মামলায় উল্লেখ করা ২১ জনের ১ কোটি ৪২ লাখ ৫৭ হাজার ৯৪৪ টাকা নয়, এজেন্ট শাখায় আরও বহু গ্রাহকের কয়েক কোটি টাকা আটকে রয়েছে। হিসাবের বই, জমার রসিদ ও সংশ্লিষ্ট নথিতে জালিয়াতির মাধ্যমে গ্রাহকদের জমা করা অর্থ ব্যাংকে জমা না দিয়ে অন্য হিসাবে স্থানান্তর করা হয়েছে বলেও অভিযোগ তাদের।
পুলিশ জানিয়েছে, ২০১৮ সাল থেকে পালংখালী বাজারে এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটটি পরিচালিত হয়ে আসছিল। স্থানীয় গ্রাহকেরা সরল বিশ্বাসে সেখানে হিসাব খুলে নিয়মিত টাকা জমা রাখতেন। সম্প্রতি প্রয়োজনের সময় টাকা তুলতে গেলে অর্থ পরিশোধ না করায় বিষয়টি নিয়ে সন্দেহের সৃষ্টি হয়।
এরপর মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) সকালে গ্রাহকেরা টাকা ফেরত চাইতে আউটলেটে গেলে উত্তেজনা দেখা দেয়। স্থানীয়রা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ এ ফোন করলে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে এজেন্ট মালিক হাকিম উদ্দিন (৬৮) ও ক্যাশিয়ার তাহসিন ইসলামকে হেফাজতে নেয়। পরে তাদের গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। এ সময় অন্য কয়েকজন অভিযুক্ত পালিয়ে যান বলে অভিযোগ রয়েছে।
এর আগে মঙ্গলবার রাতে পালংখালী বাজারের ব্যবসায়ী আনোয়ার ফয়সাল আরিফ বাদী হয়ে উখিয়া থানায় মামলা করেন। মামলায় এজেন্ট মালিক হাকিম উদ্দিন, ক্যাশিয়ার তাহসিন ইসলাম, ম্যানেজার হাবিব উল্লাহ ফরহাদ, অংশীদারসহ মোট নয়জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অজ্ঞাত আরও পাঁচ-ছয়জনকে আসামি করা হয়েছে।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, ২১ গ্রাহকের হিসাবে মোট ১ কোটি ৪২ লাখ ৫৭ হাজার ৯৪৪ টাকা জমা ছিল। এসব টাকা আত্মসাৎ, হিসাবের নথি ও জমার রসিদে জালিয়াতির অভিযোগ আনা হয়েছে।
উখিয়া থানার ওসি আতিকুর রহমান মজুমদার বলেছেন, ‘গ্রাহকদের অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা নেওয়া হয়েছে। দুইজনকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে। অভিযোগের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
সড়ক অবরোধের বিষয়ে ওসি বলেন, ‘মানববন্ধন ও সড়ক অবরোধের খবর পেয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেন। গ্রাহকদের সঙ্গে কথা বলে বিকেল ৫টার দিকে অবরোধ তুলে দেওয়া হয়। পরে যান চলাচল স্বাভাবিক করা হয়েছে।’
উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার বললেন, ‘পালংখালী বাজার এলাকার আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের একটি এজেন্ট শাখা থেকে কয়েক কোটি টাকা আত্মসাতের বিষয়টি জানতে পেরেছি। বিষয়টি নিয়ে উচ্চপর্যায়ে অবগত করা হয়েছে, যাতে গ্রাহকেরা তাঁদের আমানত ফেরত পান।’
তবে এজেন্ট শাখাটিতে প্রকৃতপক্ষে কত টাকা আত্মসাৎ বা আটকে রয়েছে এবং এর সঙ্গে কারা জড়িত, তা তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছে পুলিশ। ফলে ২১ গ্রাহকের ১ কোটি ৪২ লাখ ৫৭ হাজার ৯৪৪ টাকার অভিযোগের বাইরে আরও কয়েক কোটি টাকা আত্মসাতের যে দাবি উঠেছে, সেটিও এখন পুলিশের তদন্তের অপেক্ষায়।







